প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত যে গতিতে এগিয়ে চলেছে, তাতে মানবসভ্যতাকে এখন এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে: কম্পিউটার কি এক সময় শুধু মানবীয়ই নয়, অতিমানবীয় ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হয়ে উঠবে, যার ফলে তারা সকল কাজেই মানুষের চেয়েও ভালো করতে সক্ষম হবে?

হয়তো আগামী কয়েক বছর বা দশকের মধ্যেই এমনটি সম্ভব হবে না, কিন্তু ভবিষ্যতে কোনো এক সময় এমনটি হওয়ার জোর সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। একটা সময় হয়তো সত্যি সত্যিই কম্পিউটার মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে। তবে সেক্ষেত্রে কম্পিউটারের কেবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স থাকলেই চলবে না (যা ইতিমধ্যে অনেক কম্পিউটারের আছে), পাশাপাশি প্রয়োজন পড়বে আরো দুই ধরনের ইন্টেলিজেন্সের: সুপার ইন্টেলিজেন্স এবং ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স।

সুপার ইন্টেলিজেন্স কী?

মানুষকে ছাড়াতে যন্ত্রের চাই সুপার ইন্টেলিজেন্স; Image Source: PromptCloud

সুপার ইন্টেলিজেন্স — একে কেউ বলেন উপকথা, কেউ বলেন কিংবদন্তী, আর কারো কাছে এটি নিছকই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। তবে সকল ক্ষেত্রেই এর একটি সাধারণ সংজ্ঞা রয়েছে। এর মানে হলো কম্পিউটার বা যন্ত্রের এক সময় এতটাই উন্নতি হওয়া যে, তা সকল মানুষ যা করতে পারে, এবং সকল কম্পিউটার যা করতে পারে, সেগুলো সবই করতে সক্ষম হবে।

মনে করুন এমন একটি কম্পিউটারের কথা, যার ভিতর একাধারে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকের দক্ষতা বিদ্যমান থাকবে, সম্ভাব্য সেরা প্রকৌশলীর যাবতীয় বিদ্যা তার নখদর্পণে থাকবে, এবং সে সময়ের সেরা রোবটের সমতুল্য কার্যকরও হবে। এই সব কাজ সঠিকভাবে করতে পারার জন্য একটি কম্পিউটারের ভিতর যে মাত্রার বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতি প্রয়োজন, তাকেই বলা যেতে পারে সুপার ইন্টেলিজেন্স।

কেন সুপার ইন্টেলিজেন্স নেই কম্পিউটারের? 

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর লেখক বা পরিচালকরা যুগ যুগ ধরে সুপার ইন্টেলিজেন্সের গল্প শুনিয়ে মানুষকে মোহিত করে আসছেন। তবে বাস্তবতা হলো, বিগত কয়েক দশকে প্রযুক্তির যত নাটকীয় উন্নতিই হয়ে থাকুক না কেন, আমরা স্বপ্নে দেখা সুপার ইন্টেলিজেন্সের ধারে-কাছেও এখন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি। অনেকের মতে, প্রযুক্তির অন্যান্য খাতে যা-ই হয়ে থাকুক না কেন, অন্তত সুপার ইন্টেলিজেন্সের বেলায় পঞ্চাশ বছর আগেও আমরা যে তিমিরে ছিলাম, এখনো সেই তিমিরেই রয়ে গেছি।

অবশ্য সুপার ইন্টেলিজেন্স অর্জন না হলেও, আমরা দেখা পেয়েছি ডিপ লার্নিংয়ের। এটি এমন বিশেষায়িত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জন্ম দিতে পারে, যা কিনা যেকোনো একটি নির্দিষ্ট কাজ মানুষের তুলনায় অনেক ভালো ও যথাযথভাবে করতে পারে। যেমন ধরা যাক ব্যাংকিং খাতের কথা। আজকাল লোনের জন্য অনেক ব্যাংকই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করছে। প্রথম বছরে অনেক হাই-ডিফল্ট রেটের প্রয়োজন পড়লেও, মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে এখন ওই একই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রামই এমন একটি ডিফল্ট রেটে লোন ইস্যু করতে পারছে, যা যেকোনো বিচারে মানব লোন অফিসারদের চেয়ে শ্রেয়।

ব্যাংকিংয়ে ব্যবহৃত হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: Financial Times

যদি সুপার ইন্টেলিজেন্স বলতে কেবলই যেকোনো একটি কাজে মানুষের চেয়ে কম্পিউটারের শ্রেয় হওয়া বোঝাত, তাহলে ইতিমধ্যেই কম্পিউটার ইতিমধ্যেই সেই সুপার ইন্টেলিজেন্স অর্জন করে ফেলতে পারত। কিন্তু না, কম্পিউটার নির্দিষ্ট কোনো একটি কাজে মানুষের চেয়ে বহুগুণে ভালো হলেও, সামগ্রিকভাবে মানুষই এখনো যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে আছে। আর যে কারণে এমনটি হচ্ছে, তা হলো কম্পিউটারের বিশেষ একটি জিনিসের অভাব। জিনিসটির নাম ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স।

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স কী?

সাইকোলজি টুডে’র মতে, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স হলো সেই সক্ষমতা যার মাধ্যমে নিজের এবং অন্যদের আবেগ অনুধাবন ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্বব। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতেই পারে যে এটি খুব বেশি প্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু আদতে কর্মক্ষেত্রে একটি যন্ত্রের হিসাবরক্ষণ কিংবা অটোমেশন দক্ষতার চেয়েও আবেগিক সক্ষমতার মূল্য অনেক বেশি।

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের মধ্যে পড়ে কারো সাথে ভাগ করে নেয়া অভিজ্ঞতা, কারো ব্যক্তিত্বের সাথে মানিয়ে নিতে পারা, এমনকি অন্যের সাথে সহানুভূতিশীল বন্ধন বা সংযোগ গড়ে তুলতে পারাও।

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ব্যতীত সহানুভূতি বিনিময় সম্ভব নয়; Image Source: Shutterstock

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জন্য সহানুভূতিশীল হওয়া অনেক জরুরি। সহানুভূতি গড়ে তুলতে না পারলে, কোনো সমস্যার সমাধান করা অসম্ভব হয়তো নয়, কিন্তু অনেক কষ্টকর তো বটেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিজের বা অন্যের অনুভূতিতে উপলব্ধি করতে শেখেনি, যে কারণে তার পক্ষে সহানুভূতি গড়ে তোলাও সম্ভব হচ্ছে না।

বিষয়টিকে আরো সহজ করে বলতে গেলে, আজকের দিনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যাবতীয় জ্ঞানই হলো ডাটা মাইনিংয়ের ফসল। তাকে যত বেশি ডাটা দেয়া হবে, তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনো বিষয়ে বুঝতে পারার সম্ভাবনা তার জন্য বৃদ্ধি পাবে। অসংখ্য ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে, সে সেগুলোর অন্তর্নিহিত কিছু সাদৃশ্য ও প্যাটার্ন খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে সেই সাদৃশ্য ও প্যাটার্ন মোতাবেকই সে প্রায় সকল সমস্যারই সমাধান করতে পারে। কিন্তু কখনো যদি এমন হয় যে নতুন সমস্যাটির সাথে পূর্বের কোনো সমস্যারই বিন্দুমাত্র সামঞ্জস্য নেই? এমন হওয়াটা বিরল বটে, তবে পুরোপুরি অসম্ভব নয়। তাই কালেভদ্রে এমন পরিস্থিতির আবির্ভাব ঘটে, আর তখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকেও পুরোপুরি বেকুব বনে যেতে হয়।

ডাটা মাইনিং; Image Source: PromptCloud

কেন সুপার ইন্টেলিজেন্স ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিকল্প নেই?

কম্পিউটারের পক্ষে এখন এমন সব কাজ করা সম্ভব হচ্ছে, যে যোগ্যতা মানুষ কোনোদিনই লাভ করতে পারবে না। কম্পিউটার ফেশিয়াল রিকগনিশনের মাধ্যমে এক সেকেন্ডেরও ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের মুখ থেকে সে নির্দিষ্ট একজনকে শনাক্ত করতে পারছে, কন্ঠস্বর শুনেই কোনো ব্যক্তি আসল না নকল তা বলে দিতে পারছে, এক মুহূর্তের ভিতরই বিশাল বিশাল সব গাণিতিক হিসাবের নির্ভুল সমাধান করতে পারছে।

কম্পিউটারের তুলনায় একজন মানুষের সক্ষমতা নিতান্তই সীমিত। সে বলতে গেলে প্রায় কোনো কাজেই এত বেশি চৌকস নয়। তারপরও তার বিশেষত্ব হলো, একজন সাধারণ মানুষ প্রায় সব কাজই মোটামুটি করতে পারে। যে মানুষটি দৌড়াতে পারে, সে আবার গাণিতিক হিসাবও করতে পারে, আবার কোনোকিছু শুনে বা পড়ে স্মরণেও রাখতে পারে। এই সকল যোগ্যতা একটি কম্পিউটারের ক্ষেত্রে থাকে না। সে যত বেশি ক্ষমতা সম্পন্নই হোক না কেন, একজন গড়পড়তা মানুষের সক্ষমতা তার থেকে বেশি। অর্থাৎ মানুষের সুপার ইন্টেলিজেন্স আছে, কম্পিউটার বা যন্ত্রের নেই।

মানুষের প্রধান শক্তির জায়গা তার আবেগ; Image Source: Forbes India

এদিকে যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে রোবট সোফিয়ার অনেক উন্নততর একটি সংস্করণকে সৃষ্টি করা সম্ভব হলো যে মানুষের সমতুল্য সকল কাজই করতে পারে, তবু কি তাকে আমরা মানুষের সমান বলতে পারব? না। কারণ তার ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স নেই, সে নিজের অনুভূতিকে বুঝতে পারে না, অন্যের অনুভূতির সাথে সহানুভূতিশীলও হতে পারে না।

ধরুন আপনার সামনে কেউ মুখ গোমড়া করে বসে আছে। মানুষটি যদি আপনাকে নিজ মুখে কিছু না-ও বলে, আপনি ঠিকই বুঝতে পারবেন তার কিছু একটা হয়েছে। আবার সে যদি তার দুঃখের কথা আপনাকে খুলে বলে, তখন আপনারও খারাপ লাগবে। কারণ আপনার মধ্যে কিছুটা হলেও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স অবশ্যই আছে, সেজন্য আপনি অন্যের সাথে সহানুভূতিশীলও হতে পারেন। কিন্তু একজন কম্পিউটার এখন পর্যন্ত সেই যোগ্যতা অর্জন করেনি।

সুতরাং এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কম্পিউটার বা যন্ত্রের জন্য সুপার ইন্টেলিজেন্স ও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ঠিক কতটা জরুরি। মানুষ পারে এমন সকল কাজেই যদি কম্পিউটার অপেক্ষাকৃত বেশি পারদর্শী না হয়, এবং মানুষের মতো সে যদি অন্যের অভ্যাসকেই শুধু নয়, পাশাপাশি তার আবেগকেও অনুভব করতে ও সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখাতে না পারে, তবে তার পক্ষে কোনোদিনই মানুষের চেয়ে বেশি সামর্থ্যবান হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here