cockpit of autonomous car. a vehicle running self driving mode and a woman driver reading book.

সেলফ ড্রাইভিং কার বা আত্মচালিত গাড়ি নিয়ে এখন পর্যন্ত কম জলঘোলা হয়নি। এই তো বছরখানেক আগেও যুক্তরাজ্যের স্বনামধন্য দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয় যে আত্মচালিত গাড়ি নাকি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ধাপে প্রবেশ করতে চলেছে, কেননা এর মাধ্যমে কোনো নিরাপত্তাই থাকবে না।

তাছাড়া আগুনে ঘি ঢেলেছে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপর রচিত একটি প্রবন্ধও। সেখানে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ আত্মচালিত গাড়িকে এখন অবধি পরীক্ষা করা হয়েছে রাস্তার ধারে, কেননা “সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা এখন তাদের প্রোগ্রামের উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেনি যে সেগুলো সব ধরনের ট্রাফিক পরিস্থিতিতেই ঠিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে।”

কিন্তু সংশয়বাদীদের একটি ব্যাপার কান খুলে শুনে রাখা উচিৎ, এমনকি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আত্মচালিত গাড়িও কিন্তু মানবচালিত গাড়ির চেয়ে বেশি নিরাপদ। পরিসংখ্যানও এ দাবির স্বপক্ষেই যুক্তি দেয়। ২০১৬ সালে আত্মচালিত গাড়ির প্রতিটি দুর্ঘটনার বিপরীতে মানবচালিত গাড়িতে দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৪০,০০০টি।

আত্মচালিত গাড়িই যাতায়াতের ভবিষ্যৎ; Image Source: Newsweek

তাছাড়া আত্মচালিত গাড়ির অন্যান্য সুবিধার কথাও ভুলে গেলে চলবে না। ইন্টেল ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এ ইন্ডাস্ট্রির মোট মূল্যমান হবে ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া জনসাধারণের নিরাপত্তায় ব্যয়িত ২৩৪ মিলিয়ন ডলারও বাঁচিয়ে দেবে আত্মচালিত গাড়ি।

কিন্তু এসব ইতিবাচক পরিসংখ্যানের পরও সাধারণ মানুষ কিন্তু এখন পর্যন্ত আত্মচালিত গাড়িতে চড়ার ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী নয়, যতটা তারা হবে বলে আশা করা হচ্ছিল। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের করা একটি জরিপে উঠে আসে, মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ আত্মচালিত গাড়িতে চড়ার ব্যাপারে উৎসুক। অপর দিকে ৬১ শতাংশ মানুষ বলেছে তারা নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে যে এ ধরনের গাড়িতে তারা চড়বে না।

এদিকে পিউ রিসার্চ সেন্টারের করা এক জরিপ থেকে জানা যাচ্ছে, মাত্র ৩৯ শতাংশ আমেরিকান নাকি মনে করে যে আত্মচালিত গাড়ির ফলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে। আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, পুরো ৮৭ শতাংশ মানুষ মনে করে একটি গাড়ি চলার সময় ড্রাইভিং সিটে একজন মানুষের বসে থাকা আবশ্যক; তা সে সাধারণ গাড়িই হোক, কিংবা অটোনোমাস। সব মিলিয়ে পিউর প্রতিবেদন থেকে আমরা যা জানতে পারছি তার সংক্ষিপ্তসার হলো, সাধারণ মানুষ আত্মচালিত গাড়ির উদ্ভাবন ও আগমন সম্পর্কে যতটা না উত্তেজিত, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি উদ্বিগ্ন।

আত্মচালিত গাড়ির ব্যাপারে জনপ্রিয় অভিমত বেশ নেতিবাচক; Image Source: Nerd Wallet

কিন্তু আত্মচালিত গাড়ি নিয়ে এমন দুশ্চিন্তা কি আসলেই যুক্তিসঙ্গত? অনেকেরই ধারণা, এটি ঠিক সেরকমই একটি রক্ষণশীল চিন্তাভাবনা, যেমন চিন্তাভাবনার কারণে অনেক মানুষ ভয় পায় যে রোবট তাদের চাকরি কেড়ে নেবে এবং তারা বেকার হয়ে যাবে। আত্মচালিত গাড়ির ক্ষেত্রেও জনপ্রিয় অভিমত এটিই যে, এর ফলে রাস্তায় চলার পথে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর থেকে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব কমে যাবে। অথচ তারা ওয়াশিংটন পোস্টের এ প্রতিবেদনটিকে আমলেই নিচ্ছে না, যেখানে বলা হয়েছে ৯৪ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটে থাকে মানবীয় ভুলের কারণে। সুতরাং রাস্তায় চলার পথে মানুষের নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন বলে যে চিন্তাধারা, তা নিছকই একটি বিভ্রম বৈ আর কিছুই নয়।

চলুন পাঠক, এবার আপনাদের সামনে তুলে ধরি এমন কিছু কারণ, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে আত্মচালিত গাড়ির ব্যাপারে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া বা নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা উচিৎ নয় তো বটেই, বরং এটি নিয়ে আশাবাদী হওয়াই যুক্তিযুক্ত।

১। বৈশ্বিক অর্থনীতি চাঙ্গা হবে

ইন্টেলের ভবিষ্যদ্বাণী বলছে ২০৫০ সাল নাগাদ আত্মচালিত গাড়ির ইন্ডাস্ট্রির মূল্যমান দাঁড়াবে ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এ থেকেই বোঝা যায়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জিনিসটি ঠিক কতটা প্রভাব ফেলবে। এবং এর পাশাপাশি আনুষঙ্গিক অনেক ক্ষেত্রেও কিন্তু বিভিন্ন নতুন নতুন সম্ভাবনার সুচনা ঘটবে। যেমনটি ওয়্যারডের অ্যালেক্স ডেভিস ব্যাখ্যা করেছেন, “আপনি যদি এই নতুন, আত্মচালিত অর্থনীতিতে একটি চাকরি পেতে চান, তাহলে আপনার সম্ভাব্য সেরা বাজি হবে আইটি এবং ডাটা বিশ্লেষণ।” এ থেকেই বোঝা যায়, রোবটরা আমাদের চাকরি কেড়ে নেবে সে আশঙ্কা আংশিকভাবে সত্য হতে পারে, কিন্তু নতুন নতুন আরো অনেক চাকরিও সৃষ্টি হবে, যার ফলে আমাদের জীবিকার ব্যবস্থা অটুট থাকবে।

আআত্মচালিত গাড়ির রয়েছে ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ভবিষ্যৎ; Image Source: Intel

২। অটোনোমি ব্যবসায় নতুন নতুন উদ্ভাবনের জন্ম দেবে

উদাহরণস্বরূপ বলা যাক অ্যামাজন প্রাইম ডেলিভারি সিস্টেমের কথা। অ্যামাজন তাদের এই বিশেষ সেবার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের হাতে খুব দ্রুত বিভিন্ন অর্ডারকৃত পণ্য পৌঁছে দিতে পারছে ঠিকই। কিন্তু মানবচালিত গাড়িতে করে নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে সে সময় লাগে, আত্মচালিত গাড়িতে করে যেতে অবশ্যই তার চেয়ে অনেক কম সময় লাগবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অ্যামাজন আরো দ্রুততর সময়ের মধ্যে গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে পারবে। এভাবেই অপারেশনাল বিজনেস সিস্টেমে নতুন জাগরণের সৃষ্টি হবে। এছাড়া তেলের পিছনে খরচও ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে। অর্থাৎ সময়ের পাশাপাশি অটোনোমি খরচও কমাচ্ছে।

৩। স্থানীয় ব্যবসাও উপকৃত হবে

বৃহৎ পরিসরে ব্যবসায় কী কী উপকার হবে, তা তো জানলাম। কিন্তু স্থানীয়, সীমিত পরিসরের ব্যবসাগুলোরও কিন্তু উপকৃত হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন ধরুন পিজা ডেলিভারি কিংবা ডোর-টু-ডোর কুরিয়ার সার্ভিসের কথা। এসব ছোট ছোট ব্যবসার কথা অনেকেই সেভাবে চিন্তা করে না। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, সময়ের কথা চিন্তা করে যে মানুষটি এখনো ফুড হোম ডেলিভারি সেবা নেয়নি, যখন সে দেখবে যে কাঙ্ক্ষিত খাবারটি সে পূর্বাপেক্ষা অর্ধেকেরও কম সময়ের মধ্যে হাতে পেয়ে যাচ্ছে, তখন কি সে ওই সেবাটি নেয়ার ব্যাপারে দ্বিতীয়বার ভেবে দেখবে না? এভাবেই কিন্তু একদম তৃণমূল পর্যায়েও ব্যবসার একটি নতুন জোয়ার আসবে, যার মাধ্যমে ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করবে দেশের সার্বিক অর্থনীতি।

আত্মচালিত গাড়ি টিকে থাকতেই এসেছে; Image Source: Fortune

পরিশেষে বলব, গণমাধ্যমের কাজই হলো জনগণের সামনে কোনো একটি বিষয়ের ভালো ও মন্দ দুইটি দিকই নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা। কিন্তু কখনো কখনো গণমাধ্যম চাঞ্চল্য সৃষ্টির তাগিদ থেকে কেবল একতরফা দৃষ্টিভঙ্গিই প্রচার করতে থাকে, যেমনটি ঘটেছে আত্মচালিত গাড়ির ক্ষেত্রেও। তবে গণমাধ্যমের জেনে রাখা দরকার, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সেরা উদ্ভাবনগুলোর একটি হলো আত্মচালিত গাড়ি। এর পিছনে ইতিমধ্যেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করে ফেলেছেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞরা। তাই গণমাধ্যমের অপপ্রচারের মাধ্যমে এর জয়যাত্রা রুখতে পারা সম্ভব হবে না। আগামী এক দশকের মধ্যেই হয়তো উন্নত বিশ্বের রাস্তায় রাস্তায় আত্মচালিত গাড়ি চলা একটি অতি স্বাভাবিক ও পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here