শিষ্যের কাছে গুরুর পরাজয় কথাটি আমরা প্রায়ই শিখে থাকি। যন্ত্রকে মানুষের শিষ্যই বলা চলে, কেননা মানুষ নিজ হাতে যন্ত্র গড়ে তুলেছে, এবং তার মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সন্নিবেশ ঘটিয়েছে। তার ফলে এখন দেখা যাচ্ছে, শিষ্য যন্ত্র অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে দিচ্ছে গুরু মানুষকে। যন্ত্র তো আর এমনি এমনি জয়লাভ করছে না, এক্ষেত্রে তাকে সাহায্য করছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। সুতরাং বলা চলে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাছেই হার মানছে মানুষ। তো, কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে এগিয়ে গেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স? চলুন, জেনে নিই।

দাবা খেলা; Image Source: Reuters

দাবা খেলা

মানুষের চেয়ে কম্পিউটারের অধিক বুদ্ধিমত্তার কথা বলতে গিয়ে একটি উদাহরণ সবসময়ই দেয়া হয়, তা হলো: ১৯৯৭ সালে ডিপ ব্লু কম্পিউটারের কাছে গ্র্যান্ডমাস্টার গ্যারি ক্যাসপারভের হার। ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে সেই ঘটনাটি, এবং সেটিকেই অনেকে বিবেচনা করে থাকে যন্ত্রের কাছে মানুষের হারের প্রথম দৃষ্টান্ত হিসেবে। তবে আসলে কিন্তু তা নয়। ১৯৯৭ সালে ডিপ ব্লুর জয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল বলে সেটিকে সবাই মনে রেখেছে। অথচ কম্পিউটার সেই ১৯৮০’র দশক থেকেই দাবা খেলায় শীর্ষস্থানীয় দাবাড়ুদেরকে হারিয়ে এসেছে। এবং বর্তমান সময় এমন বেশ কিছু কম্পিউটারের আবির্ভাব ঘটেছে, মানুষের পক্ষে যাদেরকে হারানো পুরোপুরি অসম্ভব।

ডাটা বিশ্লেষণ; Image Source: MIT

ডাটা বিশ্লেষণ

কোনো নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবার নতুন কোনো সমাধান খুঁজে বের করা, সকল ক্ষেত্রেই ডাটা বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর এই ডাটা বিশ্লেষণকে সহজ করে দিচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এমআইটিতে এমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে, যা ডাটা বিশ্লেষণে মানুষকে অনায়াসে হারিয়ে দিতে সক্ষম। সেটির নাম ডাটা সাইন্স মেশিন। প্রাথমিক ডাটাসেট থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমানযোগ্য ডাটা মডেল তৈরি করতে ডাটা সাইন্স মেশিনের প্রয়োজন হয় সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা। অথচ সমপরিমাণ কাজ করতে একজন মানব ডাটা বিজ্ঞানীর বেশ কয়েক মাস সময় লেগে যায়।

ভিজ্যুয়াল রিকগনিশন; Image Source: MarTech Today

ভিজ্যুয়াল রিকগনিশন

বর্তমান সময়ে ভিজ্যুয়াল রিকগনিশন ফিচারটি নানা ধরনের অ্যাপ্লিকেশনে ব্যবহৃত হয়। হতে পারে সেটি কোনো নিরাপত্তা দরজায়, কোনো ছবি শেয়ারের অ্যাপ্লিকেশনে, কিংবা কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এবং এই কাজটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খুবই দ্রুততা ও তৎপরতার সাথে, প্রায় নির্ভুলভাবে করতে পারে। খেয়াল করে দেখবেন, আজকাল ফেসবুকে অন্য কারো আপলোড করা ছবিতে যদি আপনি থেকে থাকেন, তাহলে সেখানে আপনার মুখ অনেক স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও, ফেসবুক সেটি চিহ্নিত করে ফেলে, এবং তৎক্ষণাৎ আপনাকে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে তা জানিয়ে দেয়। অথচ একজন মানুষের পক্ষে কোনো স্বল্প-পরিচিত, এমনকি কখনো কখনো পরিচিত ব্যক্তির মুখ চিনতেও কত বেগই না পেতে হয়!

পড়া; Image Source: Pixabay

পড়া

আপনি হয়তো কয়েক ঘন্টার মধ্যে ঢাউস আকৃতির একটি বই পড়ে শেষ করে আত্মপ্রসাদে ভোগেন যে আপনার মতো এত দ্রুত কারো পক্ষেই পড়া সম্ভব না। আসলে সেটি আপনার ভুল ধারণা। কেননা চীনের অনলাইন রিটেইল কোম্পানি আলিবাবা এমন একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তৈরি করেছে, যা খুব সহজেই একজন মানুষের চেয়ে দ্রুত যেকোনো লেখা পড়ে ফেলতে সক্ষম। আলিবাবা তাদের এই উদ্ভাবনকে একটি ‘মাইলফল’ হিসেবে অভিহিত করেছে, কেননা তাদের বিশ্বাস এটির মাধ্যমে ভোক্তাদের সেবা দেয়া থেকে শুরু করে জরুরি ওষুধ বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর প্রদান, সকল কাজই আগের চেয়ে অনেক দ্রুত করে ফেলা যাবে।

গান রচনা; Image Source: Fact Magazine

গান রচনা

শুনতে যতই আজব লাগুক, বাস্তবিকই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন মানুষের চেয়ে ভালো গান লিখতেও সক্ষম। যে মানুষটির হাত ধরে এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছে, তিনি ফরাসি গীতিকার বেনয় ক্যারে। তিনি ‘ফ্লো মেশিনস’ নামক একটি মিউজিক প্রোগ্রাম তৈরি করেছেন, যা আশাতীত ভালো ইউরো-পপ অ্যালবাম সৃষ্টির যোগ্যতা রাখে। প্রোগ্রামটি গান রচনা ছাড়াও অরিজিনাল মেলোডি, কর্ড, সঙ্গীত ইত্যাদি সৃষ্টি করতে পারে। তবে হ্যাঁ, দিনশেষে সবকিছুকে একত্র করে একটি বাস্তব গানে পরিণত করতে তাকে অবশ্যই মানুষের সাহায্যই নিতে হয়।

স্ট্র্যাটেজি গেম; Image Source: Wikimedia Commons

স্ট্র্যাটেজি গেম

একটি স্বশিক্ষিত কম্পিউটার স্ট্র্যাটেজি গেম ‘গো’-তে হারিয়ে দিয়েছে বিশ্বের সেরা মানব খেলোয়াড়দেরকে। গুগলের তৈরি করা ডিপ মাইন্ড সিস্টেম ২০১৭ সালের মে মাসে গো-র বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কে জি-কে হারিয়ে দিয়ে পরিণত হয় বিশ্বের নতুন সেরা খেলোয়াড়ে। ডিপ মাইন্ডের অর্জনটি আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে, অতি জটিল এই গেমটি খেলার সময় সে মানুষের কাছ থেকে কোনো ইনপুট গ্রহণ করেনি।

রুবিক’স কিউব সমাধান; Image Source: Guinness World Records

রুবিক’স কিউব সমাধান

দ্রুততম সময়ের মধ্যে রুবিক’স কিউব সমাধানের রেকর্ডটিও এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দখলে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার জ্যারেড ডি কার্লো এবং এমআইটির বায়োমিমেটিক রোবটিক্স ল্যাবের ছাত্র বেন ক্যাটজ ছোট একটি যন্ত্র তৈরি করেন, যেটি রুবিক’স কিউব সমাধানের নতুন রেকর্ড গড়ে। মাত্র ০.৩৮ সেকেন্ডের মধ্যেই কাজটি সম্পন্ন করে সে। এর আগের রেকর্ডটিও ছিল একটি রোবটের দখলে, যে ২০১৬ সালে ০.৬৩৭ সালে রুবিক’স কিউব মিলিয়েছিল। মানুষের পক্ষে দ্রুততম রুবিক’স কিউব মেলানোর সময়কাল হলো ৪.২২ সেকেন্ড

শিল্পকর্ম; Image Source: Deep Dream Generator

শিল্প সমালোচনা ও সৃষ্টি

একদল বিজ্ঞানী মিলে এমন একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম তৈরি করেছেন, যা প্রকৃত শিল্প সৃষ্টিতে সক্ষম। নিউ জার্সির রাটগার্স ইউনিভার্সিটি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ফেসবুক এআই ল্যাব থেকে আসা গবেষকরা মিলিত হয়ে সিস্টেমটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা দুইটি নিউরাল নেটের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রমাগত তাদের ফলাফল উন্নত করতে পারে। একটি নেট কোনো সমাধান বা ছবি তৈরি করে, অন্যটি বসে থেকে সেটির ভুল-ত্রুটি ধরতে থাকে। তখন প্রথম নেটটি আবারো তার কাজে কিছু পরিবর্তন বা সংশোধন আনে। এভাবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে। এ কাজে পারদর্শী করে তোলার জন্য সিস্টেমটিকে ৮১,৫০০টি চিত্রকর্মের উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, যাতে করে সে বুঝতে পারে কোনটি সত্যিকারের মানসম্মত শিল্প, আর কোনটি তা নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here