দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; পৃথিবীর ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনালের বিশ্ব ট্রাফিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এটি ছিল ২০১৮ সালের তৃতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর। তবে এগুলো সবই হয়তো ইতিমধ্যে আপনাদের জানা বিষয়। যেটি আপনারা না-ও জানতে পারেন, তা হলো, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহারেও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দর এটি।

প্রকৃতপক্ষে, দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহারে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন গোটা আরব বিশ্বেই আধিপত্য বিস্তার করছে। দেশটির সরকারও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে এত বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে যে, সেখানে বর্তমানে রয়েছে একটি এআই স্ট্র্যাটেজি বিভাগ, এমনকি মিনিস্ট্রি অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সও।

চলুন আর দেরি না করে, জেনে নেয়া যাক যেসব অভাবনীয় উপায়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে কাজে লাগাচ্ছে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

এআই কাস্টম অফিসিয়ালস

আমিরাতের মিনিস্ট্রি অব দ্য ইন্টেরিয়র জানিয়েছে যে ২০২০ সালের মধ্যেই সেখানে আর কোনো ইমিগ্রেশন অফিসারের প্রয়োজন পড়বে না। কারণ? তাদের জায়গা নেবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স।

পরিকল্পনাটি এমন যে, মানুষকে কেবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পরিচালিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে হবে। তাদেরকে জুতো বা বেল্ট খোলা, কিংবা পকেট খালি করা – এসবের কোনোটাই করতে হবে না।

ভার্চুয়াল অ্যাকুরিয়াম স্মার্ট গেট; Image Source: Getty Images

এছাড়া বিমানবন্দরটি ইতিমধ্যেই একটি ভার্চুয়াল অ্যাকুরিয়াম স্মার্ট গেট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আসছিল। পর্যটকদের স্রেফ চারিদিকে মাছ দিয়ে ঘিরে থাকা ছোট একটি টানেলের ভিতর প্রবেশ করতে হতো। তারা আশেপাশে তাকিয়ে মাছদের সাঁতার কাটতে দেখত, আর সেই ফাঁকে ক্যামেরা তাদের মুখাবয়বকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে পর্যবেক্ষণ করে নিত। এভাবেই খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আইডেন্টিফিকেশন সম্পন্ন হয়ে যেত, সাধারণত ইমিগ্রেশন অফিসারদের মাধ্যমে যা করা খুবই সময়সাপেক্ষ ব্যপার।

এআই ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং

এমিরেটস এয়ারলাইন্সের প্রেসিডেন্ট টিম ক্লার্ক বিশ্বাস করেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বিশেষত রোবটের উচিৎ ইতিমধ্যেই মানুষের ব্যাগেজ বহন করা থেকে শুরু করে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা, কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই তাদের ব্যাগেজ সঠিক স্থানে রেখে দেয়ার মতো কাজগুলো করা। তিনি মনে করেন এ রোবটগুলোর কার্যপদ্ধতি হবে অনেকটা অ্যামাজন ডট কমের ওয়্যারহাউসে কর্মরত অটোমেশন ও রোবটিক্সের মতো।

দুবাই বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট; Image Source: Arabian Business

এআই ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট

কানাডা ভিত্তিক সিরিজ টেকনোলজিসের সাথে জুটি বেঁধে, আরব আমিরাতের জেনারেল সিভিল এভিয়েশন অথরিটি (জিসিএএ) বর্তমানে গবেষণা করছে দেশটির এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার নিয়ে। ২০১৮ সালে এ জুটি বাঁধা সংক্রান্ত এক বিবৃতিতে জিসিএএ নিশ্চিত করে যে আমিরাতের উদ্দেশ্য হলো এটি বের করা যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও অন্যান্য নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির আরো উন্নতিসাধন সম্ভব। এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরো বেশি নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা আনার ক্ষেত্রে এটি অনেক সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলেই সর্বমহলের বিশ্বাস।

অটোমেটেড ভেহিকলস

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও শতভাগ ইলেক্ট্রিকাল বা সৌর শক্তি দ্বারা পরিচালিত সেলফ ড্রাইভিং খুব শীঘ্রই দুবাই বিমানবন্দরের দৈনন্দিন কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে শুরু করে দেবে। কল্পনা করে দেখুন, কীভাবে একজন যাত্রী বিমানবন্দরে আগমন থেকে শুরু করে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে উপকৃত হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে।

ক্রাইস্টচার্চ বিমানবন্দরে ব্যবহৃত স্বয়ংক্রিয় যান; Image Source: Christchurch Airport

ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় যানের (ইতিমধ্যেই আপনার মালামাল বোঝাইকৃত) সাথে আপনার দেখা হবে সরাসরি কার্বে। কিংবা হয়তো সেটি আপনার মালামাল আপনার হোটেল বা বাসা পর্যন্তও পৌঁছে দেবে, ফলে বিমানবন্দরে ব্যাগেজ সংক্রান্ত যেসব জটিলতা ও বিড়ম্বনার সম্মুখীন আপনাকে হতে হয়, সেগুলোও আর থাকবে না।

স্টাফ ক্লিয়ারেন্স

মেট্রোজেট ফ্লাইট ৯২৬৮-এ বোমা হামলার ফলে বিমানবাহী ২২৪ জনের সকলে মারা গিয়েছিল। আর এর পেছনে দায়ী ছিল কারা, জানেন? বিমানবন্দরের স্টাফরা। তাই তো এ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ইজিপ্ট এয়ারের একজন মেকানিক, একজন ব্যাগেজ হ্যান্ডলার ও দুইজন প্যলিশ অফিসারকে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায়ও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন বর্ডার ফোর্স অফিসারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দুবাই বিমানবন্দরের স্টাফ ক্লিয়ারেন্সের কাজও করে দেবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: The Storypedia

সুতরাং বিমানবন্দরে যাতে এমন কোনো অপরাধীকে স্টাফ হিসেবে চাকরি দেয়া না হয়, তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। আর এ কাজটি করতে দুবাই বিমানবন্দরকে সাহায্য করবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। সে একজন সম্ভাব্য স্টাফ সদস্যের আচরণ, অপরাধ ও সহিংসতার পূর্ব ইতিহাস ইত্যাদি পর্যালোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত দেবে যে তাকে চাকরিতে নেয়া যায় কি না। এমনকি চাকরিতে বহালের পরও, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যালগরিদম স্টাফদের আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না, এবং সেগুলো থেকে কোনো অপরাধ জন্মের সম্ভাবনা কতটুকু, এসব দিকে লক্ষ্য রাখা অব্যাহত রাখতে পারে।

অন্যান্য বিমানবন্দরে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার

ইতিমধ্যেই হার্টসফিল্ড-জ্যাকসন অ্যাটলান্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিণত হয়েছে বিশ্বের প্রথম বায়োমেট্রিক বিমানবন্দর টার্মিনালে। এবং অনুরূপ একটি ব্যবস্থা পরিচালিত হয়েচ্ছে দুবাই বিমানবন্দরেও, যদিও তা কেবল প্রথম ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন বিমানবন্দর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করছে, বা করার পরিকল্পনা করছে।

হিথ্রো বিমানবন্দরে ব্যবহৃত হচ্ছে অ্যালেক্সা; Image Source: Heathrow Airport

যেমন: অনেক বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে সাইবার সিকিউরিটির সম্ভাব্য ঘাপলাগুলো দূর করতে সমর্থ হয়েছে। কয়েকটি বিমানবন্দর খুব শীঘ্রই অগমেন্টেড রিয়েলিটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। হিথ্রো বিমানবন্দরে যাত্রীরা ইতিমধ্যেই অ্যালেক্সাকে জিজ্ঞেস করে ফ্লাইট আপডেট জেনে নিতে পারে। তাছাড়া ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের যাত্রীরা একই পরিষেবা পায় গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছ থেকে।

হ্যাঁ, এ কথা অনস্বীকার্য যে এমন আশঙ্কা থেকেই যায়, বিমানবন্দরে মানুষের বদলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার শুরু হলে, সেই সিস্টেমকে পরিবর্তন করেও অনেক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী অপরাধ সংগঠনের চেষ্টা চালাবে। কিন্তু তারপরও দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহারে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে, তা প্রশংসনীয়। এভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োগ বাড়তে থাকলে, নিশ্চিতভাবেই সংশ্লিষ্ট গবেষকরা একে আরো উন্নত করার চেষ্টা অব্যহত রাখবেন, যার মাধ্যমে আমরা এক সময় পেয়ে যাব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পরিচালিত শতভাগ নিখুঁত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here