হিউম্যানয়েড বলতে বোঝায় এমন কিছু যা দেখতে মানুষের মতো হলেও, আদতে তা মানুষ নয়। হিউম্যানয়েড রোবট তথা মানবসদৃশ রোবট আমাদের পপুলার কালচারের অতি পরিচিত একটি উপাদান। কিন্তু তারপরও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: যন্ত্রের মানুষের মতো দেখতে হওয়াটা কি খানিকটা অদ্ভূত, এবং সম্ভবত ভয়ংকরও নয়?

আইজ্যাক আসিমভের রোবটিক উপন্যাসই হোক, কিংবা ১৯৮০-র দশকের চলচ্চিত্র চরিত্র জনি ৫, অথবা হলিউডের অ্যাভেঞ্জার্স: দ্য এজ অব আলট্রন, বা চ্যানেল ৪-এর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হিউম্যানস, সবখানেই দেখা গেছে মানুষের ভিতরকার সেই অদম্য আকাঙ্ক্ষা যে রোবট একদিন হয়ে উঠবে সেন্টিয়েন্ট বা সংবেদী, অর্থাৎ তাদের মধ্যে থাকবে মানুষের মতো সচেতনতা, এবং অনুভূতিশক্তিও হবে মানুষের ন্যায়।

সেন্টিয়েন্ট রোবট জনি ৫; Image Source: Tristar Pictures/Sony Pictures

কিন্তু সত্যিই কি রোবটের মানুষের সমপর্যায়ে চলে আসার বিষয়টি বাস্তবসম্মত?

এ বিষয় কথা বলেন বেন গোয়ের্তজেল। চিনতে পারছেন না তাকে? তিনিই হলেন হংকং ভিত্তিক হ্যানসন রোবটিক্সের অধীনে বিখ্যাত সোশ্যাল-হিউম্যানয়েড রোবট সোফিয়ার নির্মাতা। তিনি মনে করেন, রোবট মানুষের মতো দেখতে হবে এ কারণে, যাতে “মানুষের সন্দেহ দূর হয় এবং সকল সংকোচ কাটিয়ে উঠে তারা স্বাভাবিকভাবে রোবটের সাথে মিথস্ক্রিয়া চালাতে পারে।”

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে হিউম্যানয়েড রোবট আসবে, কারণ মানুষ তাদের পছন্দ করে। মানুষ রুম্বাকে (ভ্যাকুয়াম ক্লিনার রোবট) নয়, একটি হিউম্যানয়েড রোবটকে বিভিন্ন কাজের নির্দেশ দিতে বা তার কাছে নিজের প্রেমিকার নামে গালমন্দ করতে বেশি পছন্দ করবে।”

এরপর তিনি সমালোচনায় মুখর হন সফটব্যাংকের পিপার রোবটের ব্যাপারেও, “আমার মনে হয় পিপার খুবই কদর্য একটি রোবট। এটি দেখতে অনেকটা রোলিং কিওস্কের মতো। অথচ সোফিয়া একদম আপনার চোখের দিকে তাকাবে, আপনার মৌখিক অভিব্যক্তিকে প্রতিফলিত করবে। পিপারের বুকে একটি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার তুলনায় এটি একদমই ভিন্ন একটি অভিজ্ঞতা।”

পিপার রোবট; Image Source: YouTube

এই মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী অস্তিত্ব রয়েছে মোট ২০টি সোফিয়া রোবটের। তাদের মধ্যে ছয়টিকে কাজে লাগানো হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা প্রদান এবং এ বিষয়ক প্রযুক্তির প্রচারণার লক্ষ্যে।

বিভিন্ন কোম্পানি প্রায়ই দ্বারস্থ হয় হ্যানসন রোবটিক্সের। তাদের ইচ্ছা, সোফিয়াকে তারা কাজে লাগাবে নিজেদের ক্রেতাদের অভ্যর্থনা বা স্বাগত জানাতে। তবে গোয়ের্তজেল স্বীকার করেন, পিপার বা সোফিয়ার মতো হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করা এখনো খুবই ব্যয়সাধ্য একটি কাজ।

এদিকে রোবট যেন দেখতে বা শুনতে মানবসদৃশ না হয়, তার পক্ষেও জোর মতামত প্রদান করে থাকেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তেমন একজন হলেন ডর স্কুলার, ইনট্যুইশন রোবটিক্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী।

তার ফার্ম থেকে তৈরি করা হয় এলি কিউ নামের একটি ছোট, সোশ্যাল হোম রোবট। এটির উদ্দেশ্য হলো বয়স্ক ব্যক্তিদেরকে একাকীত্ব দূরীকরণে সাহায্য করে। এটি আপনার সাথে কথা বলতে পারবে, আপনার বিভিন্ন প্রশ্নের ত্বরিত জবাবও দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটিও ঠিকই আপনাকে বুঝিয়ে দেবে যে, এটি আসলে একটি যন্ত্র, কোনো মানুষ নয়।

এলি কিউয়ের সাথে স্কুলার; Image Source: Intuition Robotics

স্কুলার মূলত “আনক্যানি ভ্যালি ইফেক্ট”-এর সমর্থক। এটি হলো মাসাহিরো মোরি প্রণীত একটি ধারণা যে, রোবট যত বেশি মানবসদৃশ হয়ে উঠবে, আমরা এদেরকে তত বেশি ভীতিপ্রদ ও বিরক্তিকর হিসেবে গণ্য করতে থাকব।

পাশাপাশি তিনি এ-ও মনে করেন যে, রোবট যদি মানুষের মতো হওয়ার ভান করে তবে সেটি হবে নৈতিকভাবেও একটি ভুল কাজ। এক পর্যায়ে গিয়ে মানুষ অনুধাবন করবে যে রোবট আসলে সত্যি নয়, এবং তখন তারা নিজেদেরকে প্রতারিত বলে মনে করবে। “আমার মনে হয় না আপনাকে বোকা বানাতে চাওয়ার সাথে আপনার চাহিদা মেটানোর কোনো যোগসূত্র আছে।”

তিনি আর বলেন, “এলি কিউ খুবই মিষ্টি, এবং সে একজন বন্ধুপ্রতীম রোবট। আমরা আমাদের গবেষণা থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি, একটি অবজেক্টয়েড (জড়বস্তু সদৃশ) রোবটের পক্ষেও ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং একাকীত্ব ঘোচানো সম্ভব। এজন্য তার মানুষের মতো ভান করার কোনো প্রয়োজন নেই।”

স্কুলারের সাথে সহমত পোষণ করেন ড. রেইড সিমন্সও। তিনি কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির রোবটিক্স ইনস্টিটিউটের একজন গবেষণা অধ্যাপক, এবং একই সাথে এটির আন্ডারগ্র্যাজুয়েট আর্টিফিশিয়াল ডিগ্রিরও পরিচালক।

“আমরা অনেকেই যা বিশ্বাস করি তা হলো, কাজেকর্মে একটি রোবটের মানবসদৃশ বৈশিষ্ট্য থাকাই যথেষ্ট। তার একই সাথে হাইপার-রিয়েলিস্টিক হিউম্যান ফর্মে থাকাটাও জরুরি নয়। আমি খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করি যে আমাদের দূরে থাকা প্রয়োজন আনক্যানি ভ্যালির থেকে। এটি আমাদের মনে এমন কিছু প্রত্যাশার জন্ম দেয়, যা প্রযুক্তির পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়।”

রোবট সোফিয়া ও গোয়ের্তজেল; Image Source: SingularityNet

কিন্তু এত বিরোধিতা সত্ত্বেও গোয়ের্তজেল হার মানতে নারাজ। তিনি বিশ্বাস করেন, সোফিয়ার মতো রোবটরা যদি কোনোদিন মানুষের চেয়ে স্মার্ট হতে না-ও পারে, অন্তত মানুষের সমান স্মার্ট তো হবেই। তাছাড়া আমরা যত বেশি হিউম্যানয়েড রোবট দেখতে পাব, তত তাড়াতাড়ি এর সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠব।

কিন্তু আমরা কি কোনোদিন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারব, যখন রোবটেরা চেতনা লাভ করবে, এবং নিজেদের পছন্দ-অপছন্দও ঠিক করতে পারবে?

গোয়ের্তজেলের জবাব, “আমি মনে করি রোবট যদি মানুষের সমান বুদ্ধিমত্তা অর্জন করে, তখন তারা মানুষের সমান চেতনাও লাভ করবে।”

এমন বিশ্বাস আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (এজিআই)-এর ক্ষেত্রে একদম বিরল নয়। তবে এটি যে খুব বিস্তৃতভাবে জনপ্রিয়, তা-ও নয়।

“পাঁচ বছর আগেও এজিআই ছিল গবেষণার খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ। কিন্তু এখন গুগল ডিপমাইন্ডে কর্মরত বড় বড় গবেষকরাও এটিকে গুরুত্বের সাথে নিতে শুরু করেছেন,” বলেন তিনি।

“আমাদের চাওয়া রোবট যেন আরো বেশি দয়াশীল ও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা চাই না তারা যেন মানবিক আবেগেরও অনুকরণ করতে শুরু করে।”

চ্যানেল ৪-এ প্রচারিত হিউম্যানসের অ্যান্থ্রোপোমরফিক রোবট; Image Source: Channel 4

কিন্তু অনেক রোবটিসিস্ট এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানই এর বিরোধিতা করেন। যেমন স্কুলার বলেন, “এটি অসম্ভব। আবেগ একটি স্বতন্ত্র মানবিক বৈশিষ্ট্য। এটি কেবল জীবিত বস্তুর মাঝেই বিদ্যমান। এক সেট রুল ও অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আপনি কারো মধ্যে নৈতিকতা বা চেতনার বীজ বপন করে দিতে পারবেন না।”

যদিও তিনি স্বীকার করেন যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পক্ষে মানুষের আচরণ বোঝা ও সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখানো সম্ভব, কিন্তু ফের তিনি দাবি করেন যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিজেও একই রকম আবেগ অনুভব করে না।

ব্ল্যাক মিররের এক সাম্প্রতিক পর্বে মাইলি সাইরাস ও তার মতো দেখতে রোবট ডল; Image Source: Netflix

ব্ল্যাক মিররের একটি সাম্প্রতিক পর্বে, মাইলি সাইরাস এমন একজন পপস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, যার মস্তিষ্ককে একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমে ডাউনলোড করে রাখা হয়েছে, যাতে করে সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে ছোট ছোট রোবট ডল তৈরি করা যায়, যাকে নিজেদের সাথে রাখতে পারবে কিশোরীরা।

কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞেরই দাবি, এ ধরনের ব্যাপার চিরকাল কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ড. সিমন্স বলেন, “আমি বলব, কারো মস্তিষ্ক বা ব্যক্তিত্বকে ডাউনলোড করে রোবটের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। মানব মস্তিষ্কের প্রতিলিপি তৈরি থেকে এখনো বহুদূরে অবস্থান করছি আমরা।”

এরপরও হার মানতে নারাজ গোয়ের্তজেল, “১৯২০-র দশকে যখন নিকোলা টেসলা তার রোবট উন্মোচন করেছিলেন, কেউ তাকে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু আজ আমরা সেগুলোকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। এমন অনেক কিছুই ভবিষ্যতে হবে, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here