আপনি যদি সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই চলতি ট্রেন্ডটির সাথে খুব ভালোভাবেই পরিচিত আছেন। আপনার বন্ধুরা তাদের বর্তমানের ছবি, এবং ভবিষ্যতে (বা বৃদ্ধ হওয়ার পর) তারা দেখতে কেমন হবে, তার ছবি দিচ্ছে। অনেকে আবার নিজেদের তরুণ বা কমবয়সী সংস্করণও তৈরি করছে, যদিও সে প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম।

যে বিশেষ অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে এ কাজটি তারা করছে, সেটি পরিচালিত হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা। অ্যাপটির নাম: ফেসঅ্যাপ। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভাইরাল এ অ্যাপটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর মৌখিক অভিব্যক্তি, চেহারা, এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে তারা দেখতে কেমন হবে এগুলো ফুটিয়ে তুলছে। ব্যবহারকারীর গোমড়া মুখকেও অ্যাপটি করে দিতে পারে হাস্যোজ্জ্বল, কিংবা মলিন মুখকে চকচকে ও আনন্দিত। ব্যবহারকারীর লিঙ্গান্তরিত মুখাবয়ব সৃষ্টিও সম্ভব। এবং একই সাথে, ব্যবহারকারীরা ফেসঅ্যাপকে দিয়ে দিচ্ছে যেকোনো সময়, যেকোনো উদ্দেশ্যে তাদের ছবি ব্যবহারের ক্ষমতা।

২০১৭ সালে মুক্তির পর প্রথম ভাইরাল হয়েছিল অ্যাপটি, তবে চলতি সপ্তাহে আবারো নতুন করে ভাইরাল হয়েছে এটি; Image Source: FaceApp

অ্যাপ অ্যানির এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৭ জুলাই ২০১৯ পর্যন্ত গুগল প্লে থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করেছে ১০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ। এছাড়া অ্যাপটি এখন ১২১টি দেশে আইওএস অ্যাপ স্টোরের শীর্ষ অ্যাপ।

যদিও ফেসঅ্যাপের টার্মস অব সার্ভিস বলছে যে ব্যবহারকারীরা এখনো চাইলে তাদের “ইউজার কনটেন্ট” নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে, তারপরও রাশিয়ান কোম্পানিটির হাতে রয়েছে প্রত্যাহার অযোগ্য, রয়্যালটি-ফ্রি লাইসেন্স, যার মাধ্যমে তারা আপনার সামনেই চাইলে আপনার ছবি নিয়ে যা খুশি করতে পারবে।

আজ থেকে কয়েক মাস পর যদি দেখা যায় মস্কোর কোনো এক রাস্তার মোড়ের বিলবোর্ডে অন্য আরো অনেকের সাথে তারা আপনার ছবিও কোলাজ করে রেখেছে, এতে আপনার বলার থাকবে না কিছুই। কেননা অ্যাপটি ব্যবহারের শুরুতেই আপনি তাদেরকে অনুমতি দিয়ে দিচ্ছেন যে চাইলে তারা আপনার ছবিটির পুনরুৎপাদন, পরিবর্তন, রূপান্তর থেকে শুরু করে প্রকাশের যাবতীয় ক্ষমতা রাখে।

তবে না, এখনই ভয় পেয়ে যাওয়ার মতো কিছু হয়নি। উপরে যেসব ক্ষমতাগুলোর কথা বলা হলো, সেগুলো ফেসঅ্যাপের একচেটিয়া কোনো ক্ষমতা নয়। আপনি নিত্যদিনের প্রয়োজনে স্মার্টফোনে যেসব অ্যাপ ব্যবহার করেন, সেগুলোর প্রায় সবগুলোতেই এ ধরনের চরিত্র দেখা যায়। বিশেষত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পরিচালিত অ্যাপগুলো নিজেদের মেশিন লার্নিংকে সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে এটি আরো বেশি করে।

ফেসঅ্যাপ চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিজেরা বুড়ো বয়সে দেখতে কেমন হবেন তা অনলাইনে প্রকাশ করছেন তারকারা; Image Source: Mirror Online

সুতরাং অ্যাপটি রাশিয়ান শুনেই অনেক আমেরিকান বা পশ্চিমা বিশ্বের আরো অনেক দেশের অধিবাসীরা যেমন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে যে অ্যাপটির রাশিয়ান প্যারেন্ট কোম্পানি ওয়্যারলেস ল্যাবস আপনার ছবি নিয়ে এফবিএসকে দিয়ে দেবে এবং এরপর আপনার যাবতীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিসত্তা বিঘ্নিত হবে, তেমন ভয় অমূলক।

এ ব্যাপারে ফোন এরিনার পিটার কোস্তাদিনোভ বলেন, “হ্যাঁ, এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে আপনার ছবি হয়তো মস্কোর কোনো বিলবোর্ডে জায়গা পেতে পারে, কিন্তু আপনার ছবির সবচেয়ে বেশি কার্যকারিতা হলো এই যে, সেটি কিছু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফেসিয়াল রিকগনিশন অ্যালগরিদমকে প্রশিক্ষিত করে তুলবে।”

অবশ্য এরপরও অনেককেই দেখা যাচ্ছে পুরোপুরি নিশ্চিত না হতে। এর কারণ প্রধানত তাদের সাম্প্রতিক অতীতের বাজে অভিজ্ঞতা। বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে ফেসবুকে ভাইরাল অ্যাপগুলো অনেক সময়ই এমন অনেক কাজে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্ত কাজে লাগায়, যা আমাদের চিন্তারও বাইরে। তাছাড়া তারা তাদের সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিতেও তেমন একটা গুরুত্বারোপ করে না, যার ফলে ঘটে গেছে ফেসবুক-ক্যামব্রিজ ডাটা অ্যানালিটিকা স্ক্যান্ডালের মতো ঘটনা।

মোট ১৫০ মিলিয়ন মানুষের ছবি রয়েছে ফেসঅ্যাপের কাছে; Image Source: Getty Images

একবার যখন ক্লাউডে কোনো জিনিস আপলোড করা হয় যায়, তখন থেকেই আপনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন আপনার কনটেন্টের উপর। এ কারণেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপারে অতিরিক্ত সংবেদনশীল অ্যাপল তাদের অধিকাংশ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংক্রান্ত কাজই সেরে ফেলে সরাসরি ডিভাইসেই।

গোমড়া মুখকে হাস্যোজ্জ্বল করে তুলতে পারে ফেসঅ্যাপ; Image Source: Olly Images

কিন্তু ফেসঅ্যাপ ফিল্টার পরিবর্তনের জন্য আপনার ছবিটিকে আগে নিজেদের সার্ভারে আপলোড করে। যেমন, আইওএস ব্যবহারকারীরা যখন কোনো ছবি পছন্দ করে ফিল্টার লাগানোর জন্য, তখন ছবিটি প্রথমে ফেসঅ্যাপের নিজস্ব সার্ভারে আপলোড হয়ে যায়, এবং সেখান থেকে সম্পাদিত ও প্রক্রিয়াজাত হয়েই সেটি আবার ফিরে আসে। এখন অনেকেরই আশঙ্কা, ফেসঅ্যাপ হয়তো কেবল ওই একটি ছবিই নয়, ব্যবহারকারীর ক্যামেরা রোলের সকল ছবিই নিয়ে নেয়।

এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইয়ানডেক্সের সাবেক নির্বাহী এবং ফেসঅ্যাপের প্রধান নির্বাহী ইয়ারোস্লাভ গোনচারোভ। তিনি দ্য ভার্জকে বলেন, ছবিগুলো তারা নিজেদের সার্ভারে আপলোড করে নেয় মূলত ব্যান্ডউইথ কমানোর জন্য। কেউ যদি একই ছবিতে একাধিক ফিল্টার লাগাতে চায়, সেজন্য তাকে ওই ছবির পেছনে যেন বারবার ইন্টারনেট ডাটা খরচ করতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য। এবং কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই সার্ভার থেকে ছবিটি মুছে যায়।

টেক ক্রাঞ্চকে দেয়া আরেক বিবৃতিতে ফেসঅ্যাপ জানিয়েছে, তারা সরাসরি ব্যবহারকারীদের কাছ থেকেও অনুরোধ গ্রহণ করে সার্ভার থেকে তাদের ডাটা মুছে ফেলার ব্যাপারে। তাদের দলটি বর্তমানে “ওভারলোডেড”, যে কারণে সরাসরি তাদের পক্ষে সব ব্যবহারকারীর অনুরোধ দেখা সম্ভব হয় না। তবে Setting>Support>Report a bug এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অনুরোধটি পাঠানো সম্ভব। আর এর মাধ্যমে যেকোনো ব্যবহারকারীই পারবেন নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে আরো খানিকটা জোরদার করতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here