“অ্যালেক্সা, তোমাকে বানিয়েছে কে?” ইংরেজিতে এই প্রশ্নের জবাবে সে বলবে, “আমার উদ্ভাবক অ্যামাজন।”

হ্যাঁ, একদিক থেকে চিন্তা করলে সে সত্য কথাই বলছে। কারণ অ্যামাজনই তো বাজারজাত করেছে এই ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টটিকে। কিন্তু এমন উত্তরের পর আরো কিছু বাকি থাকে যায়, যা অ্যালেক্সা আপনাকে জানাচ্ছে না। কারণ সমগ্র অ্যামাজনই তো আর অ্যালেক্সার উদ্ভাবক নয়।

এই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর দেয় না অ্যালেক্সা; Image Source: MyNation

যেকোনো এক বা একাধিক ব্যক্তির হাত ধরে উদ্ভাবিত হয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল এই প্রযুক্তিটি। সেক্ষেত্রে উত্তরটি হওয়া উচিৎ এমন যে, অ্যালেক্সার উদ্ভাবক রোহিত প্রসাদ, যিনি তার সহকর্মী টনি রিডকে সাথে করে আজ থেকে পাঁচ বছরে আগে, ২০১৪ সালে প্রাণসঞ্চার করেছেন অ্যালেক্সায়, দিয়েছেন তাকে অন্যের কথা শুনে সে অনুযায়ী কাজ করার ক্ষমতা।

অনেকেই হয়তো রোহিত প্রসাদ নামটি প্রথমবারের মতো জানছেন। অথচ তিনি কিন্তু নেহাতই উদীয়মান কেউ নন। ভারতের রাঁচি, ঝাড়খন্ড থেকে উঠে আসা এই প্রকৌশলী বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল ব্যক্তিত্বদের একজন। ২০১৭ সালে তিনি ফাস্ট কোম্পানি প্রণীত ব্যবসায়িক অঙ্গনে বিশ্বের সেরা ১০০ জন সৃজনশীল ব্যক্তির তালিকায় ছিলেন ৯ নম্বরে (তার সহকর্মী রিড ছিলেন ১০-এ)।

এছাড়া একই বছর রিকোডের বিশ্বসেরা প্রযুক্তি, ব্যবসা ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের তালিকায় তার অবস্থান ছিল ১৫ নম্বরে। তালিকায় তার থেকে উপরে ছিলেন টিক কুক, এলন মাস্ক, সুসান ফ্লাওয়ার, জেফ বেজোস, মার্ক জাকারবার্গ, সুন্দর পিচাই ও সত্য নাদেলার মতো ব্যক্তিত্বরা।

অ্যালেক্সার দুই উদ্ভাবক টনি রিড ও রোহিত প্রসাদ; Image Source: Vox

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, প্রথমবার রোহিত প্রসাদ নামটি শুনে তাকে যতটা অখ্যাত বলে মনে করেছিলেন, তিনি আসলে তা নন। বরং ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে উঠে আসা তার মতো একজন ব্যক্তিত্বকে না জানা আমাদের জন্য একপ্রকার ব্যর্থতাই বলতে পারেন। তাই চলুন, একটু জানার চেষ্টা করি বর্তমান বিশ্বের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করে সাড়া জাগানো এই ভারতীয় প্রকৌশলীর সম্পর্কে।

যেমনটি আগেই বলেছি, প্রসাদের জন্ম ভারতের রাঁচিতে। তিনি পড়াশোনা করেছেন ডিএভি পাবলিক স্কুলে। এরপর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন মেসরার বিড়লা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে। তারপর তিনি উড়াল দেন যুক্তরাষ্ট্রে, মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ইলিনয়েস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে। সেখানে তার গবেষণা করেন ওয়্যারলেস অ্যাপ্লিকেশনের জন্য নিম্ন বিট-রেটের স্পিচ কোডিং নিয়ে। দীর্ঘ নয় বছরের সংগ্রামের পর, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট থেকে এমবিএ ডিগ্রি নেন তিনি।

প্রসাদের কর্মক্ষেত্রে পদচারণা শুরু ১৯৯৯ সালে; Image Source: CNBC

এদিকে কর্মক্ষেত্রে তার প্রথম পদচারনা ১৯৯৯ সালে, বিবিএন টেকনোলজিসের বিজ্ঞানী পদে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিবিএনেই কাজ করেন তিনি। এরপর কিছু সময়ের জন্য তিনি স্পিচ, ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া বিজনেস ইউনিটে সহ-ব্যবস্থাপক এবং পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি যোগ দেন অ্যামাজনে। অ্যালেক্সা উদ্ভাবনের পেছনে কাজ করার পাশাপাশি সেখানে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি কাজ করেন মেশিন লার্নিং পরিচালক পদে। ২০১৬ সালে তার পদোন্নতি হয়। তিনি পরিণত হন অ্যালেক্সা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান বিজ্ঞানী।

এখন পর্যন্ত প্রসাদের শ্রেষ্ট সৃষ্টিকর্ম অবশ্যই অ্যালেক্সা। এটির সফলতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “অ্যালেক্সার সাফল্যের পেছনে আরো একটি কারণ এই যে, বহুমাত্রিক বিষয়ে তার বোধশক্তি এবং সে অনুযায়ী উত্তর প্রদানের দক্ষতা। এটি একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে গান বাজানো, ভিডিও চালানো, বই পড়া কিংবা স্মার্ট হোম ডিভাইস কন্ট্রোল করা, বন্ধু ও পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা, শপিং করা, রিমাইন্ডার সেট করা কিংবা যেকোনো তথ্য খুঁজে বের করার কাজে।

ভবিষ্যতে আরো স্মার্ট হয়ে উঠবে অ্যালেক্সা; Image Source: Amazon

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ব্যাপারেও বেশ আশাবাদী প্রসাদ। তিনি মনে করেন, যত দিন যাবে, এটি ততই ‘স্মার্ট’ হতে থাকবে।

“আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা দেখতে পাব মেশিন লার্নিং ও রিজনিংয়ের কারণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে আলাপচারিতাও চালানো যাচ্ছে। এটি সম্ভব হবে কেননা ভবিষ্যতে অ্যালেক্সা কোনো কিছু শনাক্ত করা, বোঝা কিংবা কোনো অনুরোধ অনুযায়ী কাজ করার ব্যাপারে আরো সচেতন হয়ে উঠবে। সে এখনের চেয়েও আরো দ্রুতবেগে শিখতে থাকবে, এবং এর ফলে সে আরো বেশি স্মার্ট হয়ে উঠবে।”

অ্যালেক্সা যে এখনই ঠিক কতটা স্মার্ট, তার দৃষ্টান্ত সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় সম্ভবত ভারতে। সেখানে বহু ভাষায় কথা বলা মানুষের বাস, এবং অধিকাংশ ব্যবহারকারীই তাদের মাতৃভাষায় অ্যালেক্সা ব্যবহার করতে চায়। যেমন: হিন্দিভাষী কোনো ব্যবহারী ইংরেজিতে প্রশ্ন করার বদলে অ্যালেক্সাকে হয়তো জিজ্ঞেস করে, “ওয়েদার কেয়া হ্যায়?” এবং অ্যালেক্সাও এসব ভাষা ঠিকমতো বুঝে, সে অনুযায়ী প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকে।

তাছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, অ্যালেক্সার ভারতীয় ভাষার উচ্চারণ মোটেই সাহেবী ঘরানার বিকৃত বা ভাঙা ভাঙা নয়, যা অনেকের মাঝেই হাস্যকর বলে মনে হতে পারে। অ্যালেক্সা অনেকটা স্থানীয়দের মতো করেই উচ্চারণ করতে সক্ষম, ফলে ব্যবহারকারীরা এর সাথে অনেক বেশি একাত্মবোধ করতে পারে।

ভারতেও বেশ জনপ্রিয় অ্যামাজন একো; Image Source: Venture Post

তবে তারপরও, ভারতে অ্যালেক্সাকে একটি ভিন্নধর্মী সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ভারতীয়দের মাঝে কথায় কথায় “আচ্ছা” বলার প্রবণতা রয়েছে। এদিকে “আচ্ছা” শব্দটি অনেকটা অ্যালেক্সার মতো হওয়ায়, যখনই আশেপাশে কেউ এই শব্দটি উচ্চারণ করে, জেগে ওঠে অ্যালেক্সা। প্রসাদ জানিয়েছেন, তিনি ও তার দল অ্যালেক্সাকে এই দুইটি শব্দের পার্থক্য শেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

শীঘ্রই হয়তো এই সমস্যাটি, এবং অনুরূপ আরো অনেক সমস্যার কার্যকরী সমাধান নিয়ে আসতে পারবেন প্রসাদ, যার ফলে অ্যালেক্সা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আরো সুখকর হয়ে উঠবে। পাশাপাশি আরো একবার প্রমাণ হবে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোনো অলীক কল্পনা নয়। চাইলে যন্ত্রকে অবশ্যই বুদ্ধিমান ও সমঝদার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here