গত শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিচরণ ছিল মূলত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতেই। কিন্তু সেটি যে আজ কল্পবিজ্ঞানের পাতা ছেড়ে বেরিয়ে এসে চরম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে, তা সম্ভব হয়েছে যুগে যুগে কম্পিউটার বিজ্ঞানের এই বিশেষ শাখায় কাজ করা গবেষক ও বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আজকের যে অবস্থানে এসে পৌঁছেছে, তা পুরোটাই তাদের অবদান। তারা না থাকলে আজো হয়তো আমাদেরকে কেবল কল্পনাই করে যেতে হতো, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদে পদে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সুফল ভোগের সুযোগ হতো না।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, যাদের কারণে আজ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এই অবস্থান, তাদের কি আমরা চিনি? চিনি না। কেননা তারা সবসময় অন্তরালের নায়ক হয়েই থেকে যান। আমরা কেবল তাদের সৃষ্টিকর্মগুলোকেই দেখি, সেগুলো নিয়েই আবেগের উচ্ছ্বাসে ভেসে যাই। অথচ কাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে সেগুলো উদ্ভাবিত হয়েছে, সে কথা ভাবার ফুসরতটুকুও আমরা পাই না।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে একঝাঁক মেধাবী গবেষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে; Image Source: Your Story

এটি অবশ্যই আমাদের ব্যর্থতা, আমরা প্রকৃত গুণীর গুণের কদর করতে পারি না। হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে প্রকৃত গুণীদের অবস্থান এতটাই উপরে যে, তারা আমাদের স্তুতিবাক্যের অপেক্ষায় বসে থাকেন না কখনো। তবু তাদের নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই। নইলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের পদাঙ্ক অনুসরণের অনুপ্রেরণা পাবে কোত্থেকে!

তাই চলুন পাঠক, জেনে নিই এমনই অসীম মেধাবী কয়েকজন মানুষের সম্পর্কে, যারা বর্তমান আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অঙ্গনে আলো ছড়িয়ে চলেছেন।

নিক বস্ট্রম

নিক বস্ট্রম; Image Source: Getty Images

নিকের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ। তিনি পরিচিত আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স বিষয়ে তার গবেষণার কারণে। কীভাবে যথাযথ দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি গড়ে তোলা যায়, তা দেখিয়েছেন তিনি।

নিকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সুইডেনের হেলসিনবর্গে। কিশোর বয়সে স্কুলে যাওয়ার প্রতি তার ছিল চরম অনীহা। তাই হাই স্কুলের শেষ বছরটা তিনি বাড়িতে বসেই পড়াশোনা করেছিলেন, এবং নিজে নিজেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সাথে নিজেকে পরিচিত করেছিলেন।

কিন্তু তার পরবর্তী শিক্ষাজীবন কিন্তু সোনায় মোড়ানো। তার ব্যাচেলর ডিগ্রি রয়েছে দর্শন, গণিত, যুক্তিবিদ্যা এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে। এছাড়াও তিনি মাস্টার্স ডিগ্রি নেন দর্শন, পদার্থবিজ্ঞান এবং কম্পিউটেশনাল নিউরো সায়েন্সে। ২০০০ সালে তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে দর্শকে পিএইচডি ডিগ্রিও লাভ করেন।

২০০৫ সালে বস্ট্রম গড়ে তোলেন ফিউচার অব হিউম্যানিটি ইনস্টিটিউট, যেটির কাজ হলো মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা করা। ২০১৫ সালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন, যেটির বিষয়বস্তু ছিল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ভয়াবহতা। এক্ষেত্রে তার সাথে যোগ দিয়েছিলেন স্টিফেন হকিং, ম্যাক্স টেগমার্ক, এলন মাস্কসহ আরো অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব।

এসবের বাইরে নিক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংস্থার পরামর্শক ও উপদেষ্টা হিসেবেও সক্রিয় রয়েছেন।

ডেমিস হাসাবিস

ডেমিস হাসাবিস; Image Source: Getty Images

ডেমিস একজন ব্রিটিশ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রামার, উদ্যোক্তা, নিউরোবিজ্ঞানী এবং কম্পিউটার গেম ডিজাইনার। তার জন্ম ১৯৭৬ সালের ২৭ জুলাই, উত্তর লন্ডনে। ছোটবেলায় তিনি একজন দাবা খেলার প্রডিজি ছিলেন, এবং মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তিনি এ খেলার মাস্টার বনে যান।

১৬ বছর বয়সে উত্তর লন্ডনের ক্রাইস্ট’স কলেজ থেকে এ-লেভেল এবং এস-লেভেলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ডেমিস গেম ডিজাইনার ও প্রোগ্রামার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন বুলফ্রগ প্রোডাকশন্সে। ১৯৯৪ সালে তিনি বুলফ্রগ ছেড়ে ক্যামব্রিজের কুইন’স কলেজে ভর্তি হন, এবং ১৯৯৭ সালে সেখান থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে ব্যাচেলর ডিগ্রি লাভ করেন।

ডিগ্রি লাভের পর ডেমিস অল্প কিছু সময়ের জন্য লায়নহেড স্টুডিওজে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াট গেমের প্রধান আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯৯৮ সালে তিনি গড়ে তোলেন তার নিজেরই কোম্পানি। লন্ডনের এলিক্সির স্টুডিওজ ছিল মূলত একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট গেম ডেভেলপিং প্রতিষ্ঠান। স্টুডিওটি মাইক্রোসফট এবং ভিভেন্ডি ইউনিভার্সালের সাথে চুক্তি করে, এবং এক পর্যায়ে সেখানে ৬০ জন মানুষ কাজ করতে থাকে। বেশ কয়েকটি গেম মুক্তি দেয়ার পর, ২০০৫ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় স্টুডিওটি। এর প্রাযুক্তিক স্বত্বগুলো বিক্রি করে দেয়া হয় বিভিন্ন প্রকাশকের কাছে।

এরপর ডেমিস আবারো ফিরে আসেন শিক্ষাজীবনে। প্রথমে তিনি ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন, এবং এরপর এমআইটি ও হারভার্ডে পোস্ট ডক্টরাল কাজ শুরু করেন।

২০১০ সালে ডেমিস প্রতিষ্ঠা করেন ডিপমাইন্ড টেকনোলজিস নামক একটি মেশিন লার্নিং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স স্টার্ট-আপ। ডিপমাইন্ডের লক্ষ্য ছিল “বুদ্ধিমত্তার সমাধান করা, এবং তারপর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আর সবকিছুর সমাধান করা।”

২০১৪ সালে ডিপমাইন্ড কিনে নেয় গুগল, এবং তারপর থেকে কোম্পানিটি ঘোষণা দেয় বেশ কিছু বড় বড় অর্জনের। ডিপমাইন্ডই গড়ে তোলে আলফাগো, যেটি ২০১৬ সালের মার্চে খুবই জটিল একটি গেম ‘গো’-তে হারিয়ে দেয় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লি সেডলকে।

জিওফ্রি ই হিন্টন

জিওফ্রি ই হিন্টন; Image Source: Fortune

জিওফ্রির জন্ম ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর, লন্ডনের উইম্বলডনে। তিনি মূলত একজন কগনিটিভ সাইকোলজিস্ট এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানী। মেশিন লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্ক, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কগনিটিভ সায়েন্স এবং অবজেক্ট রিকগনিশনের কাজ করে তিনি পরিচিত।

মজার ব্যাপার হলো, জিওফ্রির পূর্বপুরুষ ছিলেন জর্জ বুল, যার কাজ পরবর্তী সময়ে আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়।

হিন্টন তার গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন ১৯৭০ সালে, ক্যামব্রিজের কিং’স কলেজ থেকে। তার পাঠের বিষয় ছিল এক্সপেরিমেন্টাল সাইকোলজি। এছাড়া তিনি ১৯৭৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরা থেকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পাঁচ বছর কার্নেগি-মেলোনের ফ্যাকাল্টি মেম্বার থাকার পর, তিনি পরিণত হন কানাডিয়ান ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চের একজন ফিলোতে। এরপর তিনি চলে যান ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে, যেখানে তিনি এখন একজন ইমেরিটাস অধ্যাপক। ২০১৩ সালে তার কোম্পানি ডিএনএন রিসার্চ ইঙ্ককে গুগল কিনে নিলে, তিনি পরিণত হন গুগলের একজন গবেষকে।

দাগ কিটলাস

দাগ কিটলাস; Image Source: Forbes

দাগ একজন নরওয়েজিয়ান আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স উদ্যোক্তা। তার জন্ম ১৯৬৭ সালে। তিনি সুপরিচিত সিরি ও ভিভের ডেভেলপার দলগুলোর নেতৃত্ব প্রদানকারী ব্যক্তি হিসেবে। দাগ ১৯৮৯ সালে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি, ব্লুমিংটন থেকে অর্থনীতিতে বিএ সম্পন্ন করেন, এবং ১৯৯৪ সালে তিনি বিআই নরওয়েজিয়ান বিজনেস স্কুল থেকে স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড মার্কেটিংয়ে এমবিএ করেন।

২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি মটোরোলা মোবিলিটি কোম্পানিতে জেনারেল ম্যানেজার পদে কাজ করেন। এরপর তিনি সিরি নামে একটি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠা করেন ওই বছরই, যেখানে তিনি ছিলেন সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও। নরওয়েজিয়ান ভাষায় সিরি অর্থ হলো “সুন্দর জয়ী পরামর্শক”। পরবর্তীতে এই প্রোগ্রামটিই পরিণত হয় মোবাইল ডিভাইসে ব্যবহৃত প্রথম অটোমেটেড পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টে।

স্টিভ জবসের কাছ থেকে একটি ফোন কলের পর, ২০১০ সালে সিরির মালিকানা নিয়ে নেয় অ্যাপল, এবং দাগ কাজ করতে শুরু করেন অ্যাপল অ্যাপসের একজন পরিচালক হিসেবে। ১৮ মাস অ্যাপলে কাজ করার পর চাকরি ছেড়ে দেন দাগ, এবং তারপর তিনি গড়ে তোলেন ভিভ নামের একটি নতুন স্টার্ট-আপ। ২০১৬ সালে স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৮-এ প্রকাশ করা হয় ভিভ। এটির মাধ্যমেই অ্যাপলের সিরি এবং গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টের জবাব দেয় স্যামসাং।

ইয়ান লেকান

ইয়ান লেকান; Image Source: Fortune

ইয়ান মূলত একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী, যার আগ্রহ রয়েছে মেশিন লার্নিং, মোবাইল রোবটিক্স এবং কম্পিউটার ভিশনের ক্ষেত্রেও। তার জন্ম ১৯৬০ সালে, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অদূরবর্তী এক শহরে। ১৯৮৭ সালে ইউনিভার্সিটি পিয়েরে এট মেরি কুরি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

১৯৮৮ সালে, টরন্টোতে পোস্ট ডক করার পর, ইয়ান কাজ শুরু করেন হোমডেল, নিউ জার্সির এটি অ্যান্ড টি বেল ল্যাবরেটরিজের অ্যাডাপটিভ সিস্টেমস রিসার্চ ডিপার্টমেন্টে। এখানেই তিনি তৈরি করেন জীববিজ্ঞান থেকে অনুপ্রাণিত ইমেজ রিকগনিশন মডেল, কনভলিউশনাল নিউরাল নেটওয়ার্কস, এবং পরবর্তীতে সেটি প্রয়োগ করেন ওসিআরে।

১৯৯৬ সালে ইয়ানের নতুন ঠিকানা হয় এটি অ্যান্ড টি’র ল্যাবস-রিসার্চে। সেখানে তিনি ছিলেন ইমেজ প্রসেসিং ডিপার্টমেন্টের প্রধান, এবং কাজ করতে থাকেন ডিজেভিউ ইমেজ কমপ্রেশন প্রযুক্তি নিয়ে।

২০০৩ সালে ইয়ান নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে যোগদান করেন কম্পিউটার ও নিউরাল সায়েন্সের অধ্যাপক হিসেবে। সেখানে তিনি সেন্টার ফর ডাটা সায়েন্স প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি কাজ করছেন ফেসবুকের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স গবেষণার প্রধান হিসেবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here