অর্ণব কাপুর কেবল চিন্তা করেই একটি পিৎজা অর্ডার করতে পারেন। আপনার পিৎজার উপর পেপারনি চাই? কোনো সমস্যা নেই — তিনি সেটিরও ব্যবস্থা করে ফেলতে পারবেন কোনো শব্দ উচ্চারণ, কিংবা কোনো আঙ্গুল উঁচিয়ে না ধরেও।

গোটা বিষয়টা শুনতে হয়তো সায়েন্স ফিকশনের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু না, সিবিএস নিউজের “সিক্সটি মিনিটস” অনুষ্ঠানে এসে সকল কলাকুশলীকে এভাবেই ডোমিনোজ পিৎজা অর্ডার করে খাইয়েছেন অর্ণব।

সবাইকে ডোমিনোস পিৎজা খাওয়াচ্ছেন অর্ণব; Image Source: CBS News

কীভাবে অর্ণব এই অসাধ্য সাধন করলেন? তার আগে জানতে হবে তিনি কে, এবং কোথা থেকে এসেছেন। তিনি একজন পিএইচডি প্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অভ টেকনোলজি (এমআইটি)-র মিডিয়া ল্যাবে। এটি এমন একটি ল্যাব, যেখানে রীতিমতো অদ্ভুতুড়ে সব ধারণা নিয়ে কাজ করা হয়, এবং সেগুলোকে বাস্তবায়িত করা হয়। অর্থাৎ এক সময় যে প্রযুক্তি সকলের কল্পনারও বাইরের বস্তু থাকে, সেগুলোরই বাস্তব রূপায়ন ঘটায় ল্যাবটি।

গত শতকের আশির দশকে পথচলা শুরু হয় এ ল্যাবের। শুরু থেকেই এর লক্ষ্য বেশ সোজাসাপটা, আর তা হলো কম্পিউটার ও শিল্পকে এক সুতোয় গাঁথা। কালের প্রবাহে ল্যাবটি এখন কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে দুই শতাধিক গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীকে, যারা নির্বিঘ্নে তাদের অবাস্তব সব কল্পনাকে বাস্তব করার কাজ চালিয়ে যেতে পারছে এ ল্যাবে বসে।

এবার জানা যাক অর্ণব কীভাবে করেন কাজটি। তিনি মূলত অল্টার ইগো নামে একটি ডিভাইস পরেন। এ ডিভাইসটি সেইসব ইলেকট্রিকাল সংকেতকে ইন্টারসেপ্ট করতে পারে, যেগুলো মূলত মানব মস্তিষ্ক ভোকাল কর্ডে পাঠায়। এরপর ডিভাইসটি সেসব সংকেতকে তথ্য আকারে পাঠিয়ে দেয় একটি কম্পিউটারে।

অর্ণবের অল্টার ইগো; Image Source: CBS News

তবে না, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ডিভাইসটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত কোনো চিন্তাভাবনা ধরে ফেলে না। ব্যবহারকারীকে প্রথমে নিজে থেকেই ডিভাইসটি অ্যাক্টিভেট করে নিতে হয়। আর সেটি করা হয় “ইন্টারনালি ভোকালাইজিং” এর মাধ্যমে; অর্থাৎ নীরবে, মনে মনে চিন্তা করে, যেমনটি আমরা সাধারণত করে থাকি নিজের সাথে নিজে কথা বলার ক্ষেত্রে।

তথ্যটি কম্পিউটারের কাছে পৌঁছানোর পর শুরু হয় পরবর্তী প্রক্রিয়া। ধরুন আপনি মনে মনে জানতে চেয়েছেন বাংলাদেশের রাজধানী কোনটি, কিংবা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম কী। কম্পিউটার সেটি ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে বের করবে, এবং উত্তরটি অল্টার ইগোর মাধ্যমে আপনার কানে পৌঁছে দেবে। আর যদি আপনার চিন্তাটি অন্য কাউকে পৌঁছে দেয়ার প্রয়োজন হয়, যেমন কোনো রেস্টুরেন্টে অর্ডার দিতে বলা হয়, সেটিও করে দেবে ওই ইন্টারনেটযুক্ত কম্পিউটারটি।

মজার ব্যাপার হলো, অর্ণব অল্টার ইগো নিয়ে কাজ করছেন বেশিদিন নয় কিন্তু। মাত্র বছরখানেক হয়েছে। এবং এরই মধ্যে তিনি যে তার উদ্ভাবন নিয়ে এতটা এগিয়ে যেতে পেরেছেন, তার জন্য এমআইটি মিডিয়া ল্যাবকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। এখানে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে যেতে পেরেছেন বলেই না স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এতখানি অগ্রগতি হয়েছে অর্ণবের।

মাত্র বছরখানেক হলো এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন অর্ণব; Image Source: CBS News

“সিক্সটি মিনিটস” অনুষ্ঠানে এমআইটি মিডিয়া ল্যাবকে তাই আখ্যায়িত করা হয়েছে “ভবিষ্যতের কারখানা” হিসেবে, এবং এর পেছনে জোরালো যুক্তিও রয়েছে। এই যে বর্তমানের টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি কিংবা ইলেকট্রনিক ইঙ্ক, এগুলো সবই জন্মেছে এই মিডিয়া ল্যাবে। এমনকি ১৯৮৯ সালে এ ল্যাব থেকে “ব্যাকসিট ড্রাইভার” নামে যে টার্ন-বাই-টার্ন নেভিগেশন সিস্টেম নিয়ে কাজ করা হয়েছিল, তারই সূত্র ধরে সৃষ্টি হয়েছে বর্তমান সময়ে স্মার্টফোনের জিপিএস সিস্টেম। এছাড়া ১৯৯৭ সালে এ ল্যাবেই প্রথম তৈরি করা হয় এমন একটি ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, যা মানুষের মৌখিক আদেশ মানতে সক্ষম। ঠিক ধরেছেন, এ প্রযুক্তিই পরবর্তী সময়ে জন্ম দিয়েছে সিরি, অ্যালেক্সাদের।

বর্তমানে এই ভবিষ্যতের কারখানায় কাজ করছেন অধ্যাপক হিউ হার। তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন প্রস্থেটিক প্রযুক্তিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। প্রস্থেটিকের ব্যাপারে অধ্যাপক হারের আগ্রহ জন্মেছে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বদৌলতে। ১৭ বছর বয়সে পর্বতারোহণ করতে গিয়ে তুষার ঝড়ে আটকে গিয়ে ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হন তিনি, যা কেড়ে নেয় তার পা দুটি। পা অ্যাম্পুটেশনের পর তিনি নিজেই প্রস্থেটিকের নকশা তৈরি করেন, যাতে তিনি পর্বতারোহণ অব্যহত রাখতে পারেন।

প্রস্থেটিক নিয়ে কাজ করছেন অধ্যাপক হার; Image Source: CBS News

“আমি তখন বুঝতে পেরেছিলাম প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের প্রতিবন্ধকতাকে সারিয়েই তোলে না, তার প্রাকৃতিক ও মানসিক সক্ষমতাকেও আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে,” এভাবেই প্রযুক্তির ব্যাপারে নিজের মুগ্ধতার কথা জানান অধ্যাপক হার।

এই মুহূর্তে অধ্যাপক হার কাজ করছেন একটি ফুট অ্যান্ড অ্যাঙ্কেল এক্সোস্কেলেটন নিয়ে, যা মানুষের পায়ে নতুন পেশি যোগ করতে পারবে। ফলে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের দক্ষতা ও ক্ষমতাও বেড়ে যাবে। অধ্যাপক হার স্বপ্ন দেখেন, তার এ প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে ভবিষ্যত পৃথিবীর মানুষের হাঁটা, দৌড়ানো বা লাফ-ঝাঁপের দক্ষতা নতুন মাত্রায় উত্তীর্ণ হবে।

যদিও এখন পর্যন্ত এক্সোস্কেলেটনটি একটি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত, কিন্তু অধ্যাপক হার আশা করেন খুব দ্রুতই তিনি এটির বাণিজ্যিক প্রসার ঘটাতে পারবেন। তার এমন আশাবাদের কারণ মিডিয়া ল্যাবের পূর্বের ট্র্যাক রেকর্ড। অতীতেও এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সব প্রকল্পকে সফল করতে পেরেছে ল্যাবটি, তাহলে অধ্যাপক হারের প্রকল্পটিই বা ব্যর্থ হবে কেন!

প্রস্থেটিক পরে সিবিএসের প্রতিবেদক স্কট পেলি; Image Source: CBS News

এ ব্যাপারে অধ্যাপক হার বলেন, “এখানে আমরা সুযোগ পাই ভবিষ্যত পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করার। কী অবস্থা হবে এই পৃথিবীর, আজ থেকে ১০, ২০ বা ৩০ বছর বাদে? কেমন দেখতে হবে সে? ভবিষ্যতের এই বিষয়গুলো নিয়ে পূর্বানুমানের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো নিজেই ভবিষ্যতকে উদ্ভাবন করা।”

এভাবেই নিজ হাতে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর নীল-নকশা তৈরি করে চলেছেন মিডিয়া ল্যাবের বিজ্ঞানী-গবেষকরা। অর্ণবের ব্যান্ড-এইড আকৃতির হেডসেট তাকে নিজ মস্তিষ্কের সাহায্যেই ইন্টারনেট সার্ফিংয়ের সুযোগ দিচ্ছে, অধ্যাপক হার সৃষ্টি করতে পারছেন উন্নততর অ্যাম্পুটেশন। এছাড়াও প্রতিনিয়ত আরো একশো রকম উদ্ভাবনের বীজ বোনা হচ্ছে এখানে। তাই ভবিষ্যতে যখন এসব নতুন প্রযুক্তি সর্বসাধারণের হাতের নাগালে চলে আসবে, তার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান থাকবে এই ল্যাবেরই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here