আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন আর কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়। ধীরে ধীরে এটি পরিণত হচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে। কিন্তু সমস্যা হলো, কম্পিউটার বিজ্ঞানের এই বিশেষ ও সর্বাধুনিক ধারাটির ব্যাপারে সম্যক জ্ঞানের যথেষ্ট অভাব রয়েছে সাধারণ মানুষের মনে। তারা যতটুকু যা জানে, তার অধিকাংশই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (হোক তা বই কিংবা চলচ্চিত্র) থেকে ধার করা। তাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণা জন্মে গেছে মানুষের মনে। এই লেখায় আমরা একে একে তুলে ধরব সেসব ভুল ধারণার কথা।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কেড়ে নেবে মানুষের কাজ

হ্যাঁ, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে এমনটি বারবারই দেখা গেছে যে কর্মক্ষেত্রে মানুষের জায়গা দখল করে নিচ্ছে রোবট। ফলে জীবিকার মাধ্যম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়া মানুষেরা ক্রমশ ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে, এবং রোবটরাই সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে।

অনেকেরই বিশ্বাস, রোবট কেড়ে নেবে মানুষের কাজ; Image Source: Reconteur

এ কথা সত্য যে অটোমেশনের কারণে মানুষের অনেক কাজই যন্ত্রের হাতে চলে যাবে। কোনো কাজ যদি মানুষের চেয়ে যন্ত্র বেশি দ্রুততার সাথে, নির্ভুলভাবে করতে পারে, তাহলে যন্ত্রকে তো সে কাজ করতে দেয়াই উচিৎ, তাই নয় কি? যেমন: আজকাল আর কেউ বিশাল বড় গাণিতিক হিসাব নিজে করতে যায় না, কম্পিউটারের সাহায্যেই করে ফেলে। এখানেও বিষয়টি ঠিক তেমনই।

তবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে মানুষ তাদের সব কাজ হারাবে, এটি খুবই অতিরঞ্জিত বক্তব্য। বরং ২০১৮ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সাল নাগাদ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে মানুষের ৭৫ মিলিয়ন চাকরি চলে যাবে, কিন্তু নতুন ১৩৩ লক্ষ চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, মানুষ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে বেকার হবে না, বরং অন্তত ৫৮ মিলিয়ন মানুষের বেকারত্ব ঘোচার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যেকোনো সমস্যার সমাধানে সক্ষম

এটি মানুষের আরেকটি বড় সমস্যা যে যখন তারা কাউকে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন তার উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে যায়। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বেলায়ও ঠিক তেমনটিই ঘটেছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কে মানুষের দুই ধরনের চরম ধারণা রয়েছে। এক শ্রেণীর মানুষ মনে করে এটি মানবসভ্যতার কফিনে শেষ পেরেকটি গেঁথে দেবে। আরেক শ্রেণীর মানুষ মনে করে, এটির পক্ষেই সম্ভব মানবসভ্যতাকে বাঁচানো।

কারো কারো ধারণা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যেম যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব; Image Source: Frontiers Blog

শেষোক্ত শ্রেণীর মানুষেরা আরো মনে করে, প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট সকল সমস্যারই সমাধান রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাছে। তারা এটি বুঝতে চায় না যে, একেকটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কেবল সেই নির্দিষ্ট কাজটিই করতে পারে, তাকে যেটির জন্য প্রোগ্রাম করা হয়েছে। তাছাড়া তার কাজের জন্য ডাটা খুবই জরুরি। যেসব কাজে ডাটা অন্তর্ভুক্ত নয়, তার পক্ষে সেসব কাজ করাও সম্ভব নয়।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কখনো ব্যর্থ হবে না

অধিকাংশ বিবেচনাবোধ সম্পন্ন মানুষই এটি বুঝতে পারে যে, যেসব যন্ত্র ডাটা নিয়ে কাজ করে, কোনো এক সময় বাগ বা যেকোনো কারণেই হোক, তারা ভুল করে ফেলতেই পারে। কিন্তু তারপরও বিশ্বব্যাপী এমন মানুষেরও অভাব নেই যারা বিশ্বাস করে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পক্ষে কখনোই কোনো ভুল করা সম্ভব নয়।

এ ধরনের ভুল ধারণা সামগ্রিক প্রযুক্তি জগতের জন্যই অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। মানুষের মনে রাখা উচিৎ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কিংবা অন্য যেকোনো সিস্টেম মানুষের হাতেই গড়ে ওঠে, এবং মানুষ যদি সেই সিস্টেমের সবকিছু ঠিকভাবে প্রোগ্রাম করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দিনশেষে ওই সিস্টেমটিও তার নির্ধারিত কাজ করতে ব্যর্থ হবে। তার পক্ষে সম্ভব নয় আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজে নিজেই ভুল সংশোধন করে নির্ধারিত কাজটি সম্পন্ন করা।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিং একই

এমনটি মনে করার পেছনে কারণও সেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যাপারে যথাযথ জ্ঞানের অভাব। মূলত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স একটি ‘আমব্রেলা টার্ম’, এবং রোবটিক প্রসেস, অটোমেশন, ডিপ লার্নিং, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং কিংবা মেশিন লার্নিং, সবই এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়।

মেশিন লার্নিং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের একটি অংশ মাত্র; Image Source: Advectas

মেশিন লার্নিং মূলত পরিসংখ্যান নির্ভর এক ধরনের মেথডোলজি যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমকে প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর দুইটি ভাগ রয়েছে: সুপারভাইজড লার্নিং এবং আনসুপারভাইজড লার্নিং। এরা এসভিএম, কে-মিনস প্রভৃতি অ্যালগরিদম ব্যবহার করে থাকে।

এদিকে ডিপ লার্নিং হলো মেশিন লার্নিংয়েরই আরো একটি উপসেট, যা একাধিক স্তরবিশিষ্ট নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিভিন্ন জটিলতর সমস্যার সমাধান করে অনেকটা ‘মানবিক’ উপায়ে।

মানবসভ্যতার সমাপ্তি ঘটাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স

১৯৮৪ সালে প্রথম টার্মিনেটর ফ্র্যাঞ্চাইজির চলচ্চিত্র মুক্তির পর থেকেই অনেক মানুষ আশঙ্কা করে আসছে, স্কাইনেটের মতো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আবির্ভাব ঘটবে এবং তা মানবসভ্যতা বিলুপ্তির কারণ হবে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে রোবট মানুষের জায়গা দখল করে নেয়ার মতোই, এটিও নিছকই একটি ভুল ধারণা।

অনেকের ধারণা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে বিলুপ্তি ঘটবে মানবসভ্যতার; Image Source: Techopedia

যেমনটি আমরা এই লেখার শুরুতেই বলেছি, প্রকৃত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মোটেই তেমন কিছু নয়, যার বর্ণনা আমরা পেয়েছি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে। পুরোপুরি আত্মসচেতন ও স্বশাসিত সিস্টেম গড়ে তোলা আপাত অসম্ভব একটি ব্যাপার, অন্তত এই মুহূর্তে যে গতিতে প্রযুক্তির ক্রমবিকাশ হচ্ছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অনেক দামি

হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে বৃহত্তর পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড সিস্টেম গড়ে তোলার খরচ কম নয়। কিন্তু আজকাল কোন জিনিসের খরচ কম, বলুন তো! এমনকি টেরাবাইট ডাটা বিশ্লেষণের জন্য একটি অ্যানালিটিক টিম গড়ে তোলা হলে, সেটির পেছনেও তো অনেক খরচ হবে। তাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স একদম কম খরচে পেয়ে যাবেন, তেমনটি আশা করা বোকামি।

তবে কোনো সংস্থার প্রয়োজন ও লক্ষ্য বিবেচনাপূর্বক, সীমিত বাজেটেই এমন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নাগাল পাওয়া সম্ভব যাতে করে আপনার পকেটের সকল টাকা খরচ হয়ে যাবে না। যেকোনো ব্যবসার মতো এখানেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি জানা যে আপনি আসলে কী করতে চান এবং এজন্য আপনার কী দরকার, কেন দরকার। যদি তা করতে পারেন, তাহলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পেছনে খরচকে আপনার আর সকল খরচের মতোই সাধারণ ও যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হবে।

প্রচলিত বিশ্বাস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মূল্য অনেক চড়া; Image Source: Medium

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তাৎক্ষণিক ফলাফল এনে দেয়

অনেক ব্যবসায়ীই মনে করে, তারা যেহেতু চড়া দামে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স স্থাপন করছে, তাহলে হয়তো তারা সাথে সাথেই ফল পেতে শুরু করবে, এবং পরবর্তীতে এ নিয়ে তাদেরকে আর মাথা ঘামাতে হবে না।

এধরনের উচ্চাশা নিঃসন্দেহে হতাশার কারণ হবে, এবং ফিরতি বিনিয়োগে বড় ধরনের লোকসানেরও সম্মুখীন হতে হবে। মূলত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খুবই জটিল একটি প্রক্রিয়া, এবং এর থেকে যথাযথ ফল লাভের জন্য শুধু অর্থই নয়, যথেষ্ট পরিমাণ সময় ও ধৈর্যের বিনিয়োগও একান্ত প্রয়োজন।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কেবল টেক জায়ান্টদের জন্য

কেবল বড় বড় কোম্পানি যেমন গুগল ও অ্যামাজনই কি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করবে? না, সেটি সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। আপনার ব্যবসাটি একটি এন্টারপ্রাইজই হোক কিংবা একক মালিকানার, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অবশ্যই আপনার গ্রাহকদের কাছ থেকে সম্ভাব্য সকল ডাটা সংগ্রহ করবে, এবং জোর সম্ভাবনা রয়েছে যে অন্তত মেশিন লার্নিং থেকে অবশ্যই আপনার লাভ হবে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি কেবল টেক জায়ান্টদের জন্য? Image Source: Marketing Trends

ভোক্তার তথ্য-উপাত্তের সুগভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি কোম্পানির পক্ষে সহজেই তাদের আচরণ, অভ্যাস, বৈশিষ্ট্য প্রভৃতি সম্পর্কে ভালো একটা ধারণা লাভ করা যায়। এছাড়া চ্যাটবট জাতীয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্যে সামগ্রিকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মিথস্ক্রিয়তা ও পারস্পরিক যোগাযোগও এর মাধ্যমে বৃদ্ধি করা যায়। তাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কেবল বড় কোম্পানিগুলোই নয়, মাঝারি কিংবা উদীয়মান ছোট কোম্পানিগুলোও ব্যবহার করতে পারে, এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনা থাকলে এ থেকে অবশ্যই লাভের মুখ দেখাও সম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here