শুরু করা যাক একটি সমস্যা দিয়ে। ধরুন, আপনি একটি প্রোগ্রাম তৈরি করতে চান, যেটি বিড়াল চিহ্নিত করতে পারবে। এক্ষেত্রে আপনি কিছু সেকেলে পদ্ধতির আশ্রয় নিতে পারেন, যেমন প্রোগ্রামটিকে শিখিয়ে দিতে পারেন “বিড়ালের খাড়া কান আছে”, “বিড়ালের শরীর লোমে ভর্তি” ইত্যাদি। এর মাধ্যমে আপনার প্রোগ্রামটি বিড়াল চিহ্নিত করে পারবে ঠিকই, তাতে কোনো সমস্যাই হবে না। সমস্যাটা হবে তখন, যখন আপনি আপনার প্রোগ্রামটিকে কোনো বাঘের ছবি দেখাবেন। বিড়ালের যেসব বৈশিষ্ট্য আপনি উল্লেখ করেছেন, সেগুলো তো বাঘের সাথেও সাদৃশ্যপূর্ণ। সেক্ষেত্রে আপনার প্রোগ্রামটি যদি বাঘকেও বিড়াল বলে মনে করে বসে, তাতে কি তাকে খুব বেশি দোষারোপ করা যাবে? বরং সেটিই কি স্বাভাবিক নয়?

বিড়াল চিহ্নিতকরণেও ব্যবহৃত হতে পারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: WikiHow

অবশ্য এটি স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক, কারো আদৌ দোষ আছে কি নেই, এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অবান্তর। বরং ভাবা উচিৎ, এই সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যায়। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সেরা সমাধান হলো এই যে, আপনার যন্ত্রটিকে নিজে নিজেই শেখার সুযোগ করে দিতে হবে। আপনি তাকে বিপুল পরিমাণ ছবি দেখাতে পারেন বিড়ালের। মনে করুন, হাজারখানেক বিড়ালের ছবি দেখালেন তাকে। প্রতিটি ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সে নিজের মতো করে বিড়ালের শুধু কান বা লোমই নয়, খুঁটিনাটি সকল বৈশিষ্ট্যই আয়ত্ত করে নিল। ফলে সে এখন জানে, একটি বিড়ালের মধ্যে সামগ্রিকভাবে কী কী থাকতে পারে, আর কী কী পারে না। সুতরাং, এখন আর কোনোভাবেই সে বাঘকে বিড়াল ভেবে বসার ভুল করবে না।

এই যে যন্ত্রের নিজে নিজে শেখার পদ্ধতি, একেই বলে মেশিন লার্নিং। অনেকেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর মেশিন লার্নিংকে এক করে ফেলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। মেশিন লার্নিং সেটির একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। যেমন: উপরে বিড়াল চিহ্নিতকরণের যে দুইটি পদ্ধতি বলা হয়েছে, উভয়ই কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আওতায় পড়ে। কিন্তু যন্ত্রকে ছবি দেখিয়ে নিজে নিজে শিখতে দেয়ার যে পদ্ধতি, সেটিই কেবল মেশিন লার্নিং।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের একটি অংশ মেশিন লার্নিং; Image Source: Advectas

অর্থাৎ বলা যায়, সকল মেশিন লার্নিং-ই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কিন্তু সকল আর্টিফিশিয়ালই মেশিন লার্নিং নয়। তবে এ কথাও মানতেই হবে যে, কোনো কাজ যথাসম্ভব নির্ভুল ও নিখুঁতভাবে করার ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভিন্ন ধারার মধ্যে মেশিন লার্নিং-ই সবচেয়ে বেশি কার্যকরী।

মেশিন লার্নিংয়ের সংজ্ঞা হিসেবে বলা যায়, যখন একটি কম্পিউটারকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়, যেন সে নিজেই নিজেকে নতুন শিক্ষাদান করতে পারে, এবং তার মাধ্যমে কোনো কাজে নিজের পারফরম্যান্সের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটাতে পারে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডাটা বিশ্লেষণ করা। মেশিন লার্নিং নিজেকে উন্নততর করে তোলার জন্য ইতিমধ্যেই লভ্য হাজার হাজার ডাটা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সব ধরনের সমাধান ও সিদ্ধান্ত নিজের মধ্যে মজুদ করে রাখে।

গুগল, অ্যামাজন, নেটফ্লিক্সের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো একজন ব্যবহারকারীর অতীত সার্চ, ক্রয়, পেজ ভিউয়িং ইতিহাস প্রভৃতির অ্যালগরিদম বিশ্লেষণ করে, সিমেন্টিক (শব্দার্থগত) ফলাফল প্রদান করে থাকে। এর মাধ্যমেই তারা যেকোনো ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই নির্ভুলভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে যে তারা কোন তথ্য খুঁজছে (গুগল), কোন পণ্য ক্রয়ের কথা ভাবছে (অ্যামাজন), কিংবা কোন সিনেমা বা টিভি শো দেখার প্রতি তার আগ্রহ রয়েছে (নেটফ্লিক্স)।

নেটফ্লিক্সের রিকমেন্ডেশন ফিচারের মূলে রয়েছে মেশিন লার্নিং; Image Source: Columbia Daily Spectator

এবং এই কাজগুলো করার জন্য তাদের কাছে রয়েছে যে পরিমাণ ডাটা, তা রীতিমতো বিস্ময়জাগানিয়া। উই আর সোশ্যাল এবং হুটসুইট থেকে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক ডিজিটাল প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৮ সালে কোনো কিছু খুঁজে বের করার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ বিলিয়ন স্পর্শ করেছে। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪০,০০০ এর মতো সার্চ প্রক্রিয়াজাত হয়েছে, যার অর্থ হলো: দিনে ৩.৫ বিলিয়ন সার্চ, কিংবা এক বছরে ১.২ ট্রিলিয়ন সার্চ। আরো একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, বিগত বছরটিতে মানুষ অনলাইনে যে পরিমাণ সময় কাটিয়েছে, তা সর্বমোট ১ বিলিয়ন বছরের সমান!

প্রতিদিন অনলাইনে যে পরিমাণ ডাটা জমা, মেশিন লার্নিংয়ের সাহায্য ছাড়া তা বিশ্লেষণ করা কখনোই সম্ভব হতো না। তবে কেউ যদি মনে করে থাকেন মেশিন লার্নিং কেবল অনলাইন সার্চ রেজাল্ট কিংবা বিড়াল চিহ্নিতকরণের মতো মামুলি কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে তারা নিঃসন্দেহে বোকার স্বর্গে বাস করছেন। মেশিন লার্নিং বর্তমানে সম্ভাব্য সব ধরনের শিল্প ও কর্মক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

শিক্ষকের কাজের চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব মেশিন লার্নিং দিয়ে; Image Source: bold.expert

হাল আমলে আপনি যেখানেই তাকাবেন, আবিষ্কার করবেন মেশিং লার্নিংয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ধারণা করে নিতে পারি, এই লেখা যারা পড়ছেন তাদের মধ্যে সিংহভাগই কোনো না কোনোভাবে শিক্ষাক্ষেত্রের সাথে জড়িত। শিক্ষাক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে কত ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়, ভেবে দেখুন। শিক্ষাবিদ, প্রভাষক, পরীক্ষক, কূটনীতিক, বিশ্লেষক, গবেষক, কাউন্সেলর, মেন্টর – এই সকল পেশাই অন্তর্ভুক্ত এক শিক্ষকতা পেশায়। সুতরাং যন্ত্রের পক্ষে হয়তো কখনোই একজন রক্ত-মাংসের শিক্ষকের বদলি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সম্ভব না। তারপরও একটি কম্পিউটারে ডাটা মাইনিংয়ের মাধ্যমে তাকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা সম্ভব, যাতে করে সে অন্তত প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক স্টাডি প্ল্যান তৈরি করতে পারে।

কীভাবে? সে প্রতিটি শিক্ষার্থীর ইতিহাস ঘেঁটে দেখবে, তাই তার পক্ষে খুব সহজেই সম্ভব হবে শিক্ষার্থীদের অতীত ফলাফলের ভিত্তিতে অ্যালগরিদম বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনাক্ত করা যে কোন শিক্ষার্থীর শক্তিমত্তার জায়গা কোনটি, তার দুর্বলতাই বা কোনটি। এ থেকে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এমন একটি চার্ট তৈরি করতে পারবে, যেখানে লেখা থাকবে একজন নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর কোন বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, আর কোন বিষয়ে কম গুরুত্ব দিলেও চলবে।

মেশিন লার্নিং-ই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভবিষ্যৎ; Image Source: YouTube

এভাবে শুধু শিক্ষাক্ষেত্রই নয়, আইন, শিল্পক্ষেত্র, শ্রমবিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা, যানবাহন ইত্যাদি সবখানেই মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ফল লাভ করা সম্ভব। শুরুর দিকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে মানব-কর্তৃক প্রোগ্রামিংকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের প্রোগ্রামিংয়ে ডেভেলপার কোনো ভুল করে ফেললে, যন্ত্রের পক্ষে সেই ভুল শুধরানো সম্ভব নয়। তাছাড়া একজন মানুষের পক্ষে কোনো বিষয়ে সকল খুঁটিনাটি তথ্যও তো যন্ত্রকে দেয়া সম্ভব নয়। দুই-একটি তথ্য বাদ পড়ে যেতেই পারে। আর তখন বাঘকে বিড়াল হিসেবে চিহ্নিত করার মতো হাস্যকর ভুলও হতেই পারে। অথচ যন্ত্র যদি নিজে নিজে ডাটা মাইনিংয়ের মাধ্যমে সকল ডাটা বিশ্লেষণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করে, তবে তার পক্ষে যেকোনো সমস্যার সমাধান বের করে ফেলা সম্ভব। তাই এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মেশিং লার্নিংই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বর্তমান তো বটেই, এমনকি ভবিষ্যতও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here