আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে পৃথিবীকে। সহজ করে দিচ্ছে মানুষের জীবন। তবু এক শ্রেণীর মানুষ সবসময়ই এর ব্যাপারে বিরাগভাজন। কারণ তাদের বিশ্বাস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আধিপত্যের কারণে ক্ষতির শিকার হবে রক্ত-মাংসের মানুষেরা। তাদের চাকরি কেড়ে নেবে যন্ত্র, এবং তাদেরকে বেকার হয়ে পড়তে হবে।

এমন বিশ্বাসের ভিত্তি কী? এ বিশ্বাসের কতটুকুই বা সত্য? আসলেই কি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পক্ষে মানুষের চাকরি কেড়ে নেয়ার যোগ্যতা আছে? সত্যি কথা বলতে, আছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাদের The Future of Jobs 2018 শীর্ষক প্রতিবেদনে সে ইঙ্গিতই দিয়েছে। তারা বলেছে, ২০২২ সালের মধ্যে মানুষের প্রায় ৭৫ মিলিয়ন চাকরি চলে যাবে যন্ত্রের হাতে।

রোবট কেড়ে নেবে মানুষের কাজ? Image Source: Forbes

তাছাড়া একটু মাথা খাটালেই তো বোঝা যায়, যন্ত্রের কাজই হলো মানুষের কাজকে সহজ করে দেয়া। শিল্প বিপ্লবের আগে যেমন অধিকাংশ কাজই মানুষকে নিজ হাতে করতে হতো, কিন্তু এরপর যন্ত্রের আধুনিকতার সুবাদে সেসব কাজ আর মানুষকে নিজেকেই করতে হয় না। এমনটাই তো হওয়ার কথা। যন্ত্র যত উন্নত হবে, মানুষের কাজ সে তত বেশিই নিজের করে নিতে পারবে।

তবে মুদ্রার অপর পিঠটায়ও কিন্তু একবার নজর বুলিয়ে নেয়া দরকার। মানুষের ৭৫ মিলিয়ন কাজ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের করায়ত্তে চলে যাবে, তা না হয় ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে কি চাকরি হারানো ৭৫ মিলিয়ন মানুষ একদম বেকার হয়ে যাবে? মোটেই না। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনটিতে আরেকবার ভালো করে নজর বোলালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেখানে স্পষ্ট করেই বলা আছে, ৭৫ মিলিয়ন চাকরি কেড়ে নেয়ার বদলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ২০২২ সালের মধ্যে নতুন ১৩৩ মিলিয়ন চাকরি সৃষ্টি করবে।

২০২২ সালে চাকরির বাজার; Image Source: World Economic Forum

এবার তাহলে নিজেই হিসাবটি মিলিয়ে নিন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কিন্তু দিনশেষে মানুষকে মোটেই বেকার করে দিচ্ছে না। বরং যোগ-বিয়োগ করে সামগ্রিকভাবে যে নতুন ৫৮ মিলিয়ন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, এর মাধ্যমে কিন্তু বিশ্বব্যাপী নতুন ৫৮ মিলিয়ন মানুষের বেকারত্বও ঘুচে যাচ্ছে। সুতরাং, মানুষের বেকারত্বের পিছনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে দায়ী করার যে প্রবণতা, তা পুরোপুরি অর্থহীন।

এবার আরেকটু বিস্তারিত বলা যাক। ২০১৮ পর্যন্ত মানুষ ও যন্ত্রের কাজের অনুপাত ছিল ৭১-২৯। অর্থাৎ প্রতি ১০০ ঘন্টা কাজের মধ্যে ৭১ ঘণ্টা করত মানুষ, আর ২৯ ঘণ্টা যন্ত্র। ২০২২ সাল নাগাদ সেই অনুপাত দাঁড়াবে ৫৮-৪২ এ। আর ২০২৫ সাল নাগাদ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষের কাজের পরিমাণ যন্ত্রের চেয়ে কমে যাবে। নতুন অনুপাতটি হবে ৪৮-৫২।

অটোমেশনের হার; Image Source: World Economic Forum

২০টি উদীয়মান অর্থনীতির ১২টি শিল্পের মোট ৩১৩টি বৈশ্বিক কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তাদের উপর – যারা মোট ১৫ মিলিয়ন চাকরিজীবীর প্রতিনিধিত্ব করে – জরিপ চালিয়ে সৃষ্ট এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে বোঝা যায়, কীভাবে কর্মক্ষেত্রে মানুষ ও যন্ত্রের ভূমিকার বিশাল অদল-বদল ঘটতে চলেছে। আর এই পরিবর্তনটি নিঃসন্দেহে মানুষের জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে।

পুরনো চাকরি ঝরে গিয়ে নতুন চাকরির উদ্ভব ঘটছে, এবং সেসব নতুন চাকরি মোটেই সবার জন্য সমান উপযোগী হবে না। উদ্যমী, উদ্ভাবনী শক্তি আছে, এবং নতুনকে আলিঙ্গন করার মতো মনের জোর রয়েছে, এমন মানুষেরাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিপক্ষে লড়াই করে টিকে থাকতে পারবে। আর তাই প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে, বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলোর ৫৪ শতাংশ কর্মকর্তাকেই তাদের চাকরি টিকিয়ে রাখতে চাইলে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে, এবং নিজেদেরকে পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে হবে। এর অর্থ হলো, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কর্মক্ষেত্রে যে বিশাল আঘাত হানতে চলেছে, তারপর বৃহৎ কোম্পানিগুলোর মাত্র ৪৬ শতাংশ কর্মকর্তারই ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকবে, অর্থাৎ তারা পূর্বে যেভাবে কাজ করত, ভবিষ্যতেও সেভাবে কাজ করলেই চলবে।

সব মিলিয়ে ৫০ শতাংশ কোম্পানিই মনে করছে ২০২২ সাল নাগাদ অটোমেশনের কারণে তাদের পূর্ণ-ঘন্টার কর্মশক্তি ও জনবলের পরিমাণ সংকুচিত হতে চলেছে। অন্যদিকে ৪০ শতাংশ কোম্পানি মনে করছে অটোমেশনের প্রভাবে তাদেরকে আরো জনবল নিয়োগ দিতে হবে। আর ২৫ শতাংশ কোম্পানির ধারণা, অটোমেশনই কর্মক্ষেত্রে নতুন নতুন ভূমিকার জন্ম দেবে।

অটোমেশনের প্রভাব; Image Source: The Economic Times

চাকরির বাজারের এই দৃশ্যপটে সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক হাল-হকিকতও একটি বড় ভূমিকা পালন করবে। তাছাড়া বর্তমান বিশ্ব আরো বেশ কিছু বড় সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেমন: জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি, ক্রমবর্ধমান বয়োজ্যোষ্ঠ জনসংখ্যা ইত্যাদি।

এর মধ্যে শেষোক্ত বিষয়টির কারণে চাকরির বাজারে নতুন আরেকটি জটিলতা সৃষ্টিরও সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে দিন দিন মানুষের স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ঘটছে, আর তাই গড় আয়ুষ্কালও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধিরও জোর দাবি উঠতে পারে। তখন স্বাভাবিকভাবেই তরুণ চাকরিপ্রার্থী জনসংখ্যার সাথে ইতিমধ্যেই চাকরি করছে কিন্তু ছাড়তে চাচ্ছে না এমন একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী যোগ হবে, ফলে চাকরির চাহিদা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়ে যাবে।

তবে প্রতিবেদনটি বলছে, আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে প্রযুক্তির সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি ঘটবে মূলত চারটি ক্ষেত্রে – দ্রুতগতির ইন্টারনেট পরিষেবা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিন্স, বৃহৎ ডাটা অ্যানালিটিকস ও ক্লাউড কম্পিউটিং। এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই যেহেতু বয়স নয়, বরং কর্মদক্ষতাই বেশি জরুরি, তাই নিজেদের কাজ দেখিয়ে প্রকৃত যোগ্যতা সম্পন্নরাই চাকরির বাজারে টিকে থাকতে পারবে।

ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে দক্ষতাই প্রাধান্য পাবে সর্বাধিক; Image Source: Analytics India Magazine

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আগে প্রাইস ওয়াটারহাউজ কুপার্সও অনুরূপ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেখানে তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবটিক্স এবং স্মার্ট অটোমেশন প্রযুক্তিকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান সূচক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল, এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে এই তিনই একত্রে বিশ্বব্যাপী ১৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার জিডিপিতে অবদান রাখবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here