আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পক্ষে কি রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে ‘স্মার্ট’ হওয়া সম্ভব? অতি পরিচিত একটি প্রশ্ন। এবং এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দদ্বয় নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে শুরু করি। কেন যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা মানুষের অনুসারী, এবং উল্টোটি নয়, সে ব্যাখ্যার মাধ্যমে আমরা আমাদের উত্তরের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাই।

এক্ষেত্রে শুরুতেই আমরা সবচেয়ে বড় ভুলটি করে ফেলি। কেননা আমাদের গুরুত্বারোপ করা উচিৎ স্মার্ট বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটির উপর। কেননা স্মার্ট শব্দটি আপেক্ষিক, এবং ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে এটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। তাই শুরুর আলোচনায় মনোনিবেশের পূর্বে, আমাদেরকে আগে বুঝতে হবে স্মার্টনেস আসলে কী।

স্মার্টনেসের সংজ্ঞা বুঝতে আমরা সাহায্য নিতে পারি বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জে পি গিলফোর্ডের। ১৯৫০’র দশকে তিনি সৃজনশীল চিন্তাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছিলেন: কনভারজেন্ট (অভিসারী) চিন্তা এবং ডাইভারজেন্ট (অপসারী) চিন্তা।

গিলফোর্ডের মতে মানুষের সৃজনশীল চিন্তা দুই ধরনের; Image Source: YouTube

কনভারজেন্ট চিন্তা বলতে গিলফোর্ড বুঝিয়েছিলেন কোনো প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারার সক্ষমতাকে, যেখানে স্মৃতিশক্তি ও যুক্তি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে তার মতে ডাইভারজেন্ট চিন্তা মানে হলো একটি একক সমস্যা থেকে সম্ভাব্য অনেকগুলো সমাধান বের করে আনতে পারার মতো ‘ক্রিটিকাল অ্যাবিলিটি’, যেখানে কোনো ব্যক্তির আগ্রহ এবং ‘আউটসাইড দ্য বক্স’ চিন্তা করার দক্ষতা প্রাধান্য পায়।

গোটা বিষয়টিকে আরো একটু সহজ করে তোলা যাক। মনে করুন, আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করল, বাংলাদেশের রাজধানীর নাম কী। আপনি সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন ঢাকা। এটি আপনার কনভারজেন্ট চিন্তা। কেননা উত্তরটি কিন্তু আপনি আগে থেকেই জানতেন। স্রেফ প্রশ্নকর্তার মুখে প্রশ্নটি শোনার পর নিজের স্মৃতি হাতড়ে আপনাকে সঠিক উত্তরটি বের করে আনতে হয়েছে।

ডাইভারজেন্ট ও কনভারজেন্ট চিন্তার পার্থক্য; Image Source: PsycholoGenie

কিন্তু এবার ধরুন, আপনি ঢাকা থেকে ঘুরে আসার পর আপনার কাছে জানতে চাওয়া হলো, ঢাকার কোন জায়গাটি সবচেয়ে সুন্দর। এবার কিন্তু আপনাকে কেবল স্মৃতিশক্তির উপর নির্ভর করলেই চলবে না। স্মৃতিশক্তির সাহায্যে ঢাকার কোন কোন স্থানে আপনি গিয়েছেন, সেগুলো বের করবেন বটে, কিন্তু তারপর সেসব স্থানের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই যেকোনো একটি জায়গাকে আপনার সেরা হিসেবে রায় দিতে হবে। এটিই হলো ডাইভারজেন্ট চিন্তা।

এবার ফেরা যাক শুরুর আলোচনায়। স্মার্ট হওয়ার জন্য কনভারজেন্ট ও ডাইভারজেন্ট দুই ধরনের বুদ্ধিমত্তাই জরুরি। যেহেতু কম্পিউটারের স্মৃতিশক্তি অনেক বেশি এবং তার প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষমতাও বেশি, তাই সে সহজেই সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন নিয়ম-নির্ভর খেলা, জটিল হিসাব, ডাটা সংরক্ষণ প্রভৃতিতে হারিয়ে দিতে পারে। এজন্য আমরা কেউ কেউ মানুষের থেকে কম্পিউটারকে এগিয়ে রাখি। কিন্তু কেউ কেউ আবার কম্পিউটারের খুব বড় একটি খুঁতও বের করে ফেলি। তা হলো, কম্পিউটারের কোনো কল্পনাশক্তি নেই, সে নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো বিষয়ে চিন্তা করতে বা আগ্রহ দেখাতে পারে না। অর্থাৎ কম্পিউটারের বুদ্ধিমত্তা ডাইভারজেন্ট নয়।

কিন্তু আমাদের এই সাধারণীকরণের মাধ্যমে বের করে আনা দৃষ্টিভঙ্গি কি আসলেই সঠিক? যদি এমন হয়ে থাকে যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তা সাধারণ মানুষের সমান, কিংবা এমনকি তুলনামূলকভাবে বেশি?

যন্ত্রেরও রয়েছে ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তা; Image Source: Life Boat

বর্তমান সময়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অন্যতম আগ্রহোদ্দীপক একটি ক্ষেত্র হলো জেনারেটিভ ডিজাইন, যেখানে একটি যন্ত্রের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডাটা প্রবেশ করানোর পর, তাকে বলা হয় নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী ডিজাইন তৈরি করতে। কম্পিউটার তখন হাজার হাজার সম্ভাব্য ডিজাইন প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সেরা কয়েকটি ডিজাইন এনে আমাদের সামনে হাজির করে। তাহলে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে, কম্পিউটার কিন্তু এক্ষেত্রে ডাইভারজেন্ট চিন্তারই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

উদাহরণস্বরূপ, যখন আর্কিটেকচার-সফটওয়্যার ফার্ম অটোডেস্ক তাদের অফিসের একটি নতুন ডিজাইন তৈরি করতে চাইল, তখন সেখানকার কর্মচারীদের কাছে কিছু বিশেষ প্রশ্ন করা হলো: অফিসের দেয়ালের রঙ কেমন হবে, নিরাপত্তা কেমন থাকবে, খোলা জায়গা থাকবে কি না ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করে প্রোগ্রামার জরিপটিকে একটি কম্পিউটারে প্রবেশ করালো, এবং জেনারেটিভ ডিজাইন প্রযুক্তি কয়েক মিনিটের মধ্যেই ১০ হাজারেরও বেশি ভিন্ন ব্লু-প্রিন্ট উৎপাদন করে ফেলল।

সুতরাং একটি জিনিস মোটামুটি পরিষ্কার, যে ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তার অনুপস্থিতির কারণে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে সবসময়ই মানুষের চেয়ে স্মার্টনেসের বিচারে পিছিয়ে রাখা হতো, আদতে সেই ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তা কিন্তু তার মাঝে ঠিকই আছে।

জেনারেটিভ ডিজাইন ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তার উদাহরণ; Image Source: Medium

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের একটি বড় সমস্যা তার আবেগ। এই আবেগ অনেক সময়ই তাকে ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তার যথাযথ প্রয়োগে বাধা দিয়ে থাকে। যেমন: কোনো ব্যক্তি হয়তো অনেক স্মার্ট, খুব সহজেই যেকোনো সমস্যার সমাধান বের করে ফেলতে পারে। কিন্তু আজ তার মন কোনো কারণে বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তাই অনেক চেষ্টা করেও সে প্রদত্ত সমস্যায় মনোনিবেশ করতে পারল না। ফলে সমস্যার সমাধান বের করার ক্ষেত্রেও সে ব্যর্থ হলো। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মধ্যে এমন কোনো আবেগীয় সমস্যা নেই। যেহেতু তার মধ্যে কোনো আবেগই নেই, তাই সে যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে ডাইভারজেন্ট চিন্তা করতে পারে, এবং সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারে।

সংশয়বাদীরা এবার আরেকটি জোরালো যুক্তি নিয়ে হাজির হতে পারেন: মানুষের ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তা স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে তা আগে থেকে প্রোগ্রাম করে দিতে হয়।

দ্বিতীয় বক্তব্যটি হয়তো সঠিক, কিন্তু প্রথম বক্তব্যটি কি মানুষের উচ্চতর ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে আদৌ সঠিক? মানুষও কি ছোটবেলা থেকে তার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয় না, যা পরবর্তীতে তার ডাইভারজেন্ট চিন্তায়ও ভূমিকা রাখে? তাছাড়া মানুষ জীবনের প্রথম ১৫ থেকে ২০ বছর পড়াশোনাও যে করে, সেটি কি ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তা লাভের উদ্দেশ্যেই নয়?

যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে মানুষের পড়াশোনা বা বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে আগে থেকে করে রাখা প্রোগ্রামিং, দুইটির মাঝে কি সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়?

স্মার্টনেসে পিছিয়ে নেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: iStock

পরিশেষে এ কথা অনস্বীকার্য যে, নিজ নিজ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়ে যদি জানতে চাওয়া হয় মানুষ নাকি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কে বেশি স্মার্ট, তাহলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকেই এগিয়ে রাখতে হবে। কেননা কনভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের শ্রেষ্ঠত্ব সংশয়াতীত। আর ডাইভারজেন্ট বুদ্ধিমত্তায়ও চাপের মুখে মানুষের চেয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সই বেশি ফলদায়ী।

তাই মানব মাপকাঠিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের চেয়ে স্মার্ট হোক বা না হোক, নিজের সক্ষমতার মাপকাঠিতে সে তার পক্ষে অবশ্যই মানুষের চেয়ে বেশি স্মার্ট হওয়া সম্ভব, এবং ইতিমধ্যেই তার প্রমাণ সে দিয়ে ফেলেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here