আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জগতের অতি জনপ্রিয় শব্দযুগল। বাংলা করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি মূলত কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি শাখা, যেখানে মানুষের চিন্তাশক্তি, অনুভূতি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে কম্পিউটারের মাধ্যমে অনুকৃত করা হয়ে থাকে।

আরো সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কম্পিউটারের বুদ্ধিকে ঠিক মানুষের বুদ্ধির সমতুল্য করে তোলা, এবং এর মাধ্যমে মানবিক আবেগ-অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারকে নিজের মতো করে কোনো পরিবেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজের যোগ্য করে তোলাই হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাজ।

মানবিক বুদ্ধিমত্তা থেকেই আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা; Image Source: PhysioWizard

একজন মানুষের বুদ্ধিমত্তা পাঁচটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। সেগুলো হলো: শিক্ষা, বিচার-বিবেচনা, সমস্যার সমাধান, উপলব্ধি এবং ভাষার ব্যবহার। একটি কম্পিউটারের মধ্যে যখন মানবিক বুদ্ধিবৃত্তির সংযোজন ঘটে, তখন সে-ও এই বিষয়গুলো আয়ত্ত করে নেয়। তবে কম্পিউটারের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো একটু ভিন্নভাবে কাজ করে।

চলুন পাঠক, জেনে নিই কীভাবে একটি কম্পিউটার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে মানুষের সমান বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে।

শিক্ষা

কম্পিউটার বেশ কয়েকভাবে শিখতে পারে। এর মধ্যে শেখার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো চেষ্টা ও ভুল করা। উদাহরণস্বরূপ, একটি সরল কম্পিউটার প্রোগ্রাম সঠিক চালের মাধ্যমে দাবা খেলা শিখবে। যেহেতু তাকে কেউ হাতে-কলমে শিখিয়ে দেবে না, তাই সে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন চাল প্রয়োগ করে দেখতে থাকবে, এবং এভাবে বারবার ভুল করার পর এক পর্যায়ে সে সঠিক ধারাটি খুঁজে পাবে। এভাবে শেখার জন্য কম্পিউটারকে অতীতের প্রতিটি ভুল চালই মনে রাখতে হয়, এবং সঠিক চাল ও ভুল চালের মধ্যকার পার্থক্য চিহ্নিত করতে হবে।

ভুল থেকে শিক্ষা নেয় কম্পিউটার; Image Source: Smithsonian Magazine

এর থেকেও বেশি চ্যালেঞ্জিং ধাপটি হলো সাধারণীকরণ। এক্ষেত্রে কম্পিউটার তার অতীত অভিজ্ঞতাকে স্মরণ করে, এবং ধরে নেয় যে এবারও তাকে একই রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে, আর তার সমাধানও হবে অভিন্ন। যেমন: একটি কম্পিউটারে হয়তো ইতিপূর্বে reach এর অতীতকাল হিসেবে reached লেখা হয়েছে, আবার march এর অতীতকাল লেখা হয়েছে marched. তাহলে কম্পিউটারটি ধরেই নেবে যে সকল শব্দের অতীতকালই হয় ed যোগ করে। কিন্তু সেক্ষেত্রে কিছু ঝামেলা রয়েছে। কারণ সব শব্দের অতীতকাল তো আর এভাবে হয় না। teach শব্দের অতীতকালও যখন কম্পিউটার দেখাবে teached, তখন তো ভুল হয়ে যাবে। তাই এভাবে শেখা অনেক সময়ই কার্যকর হয় না।

বিচার-বুদ্ধি

কম্পিউটার এক্ষেত্রে বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে বিদ্যমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফলটি বের করে আনতে চায়। তবে এখানেও তাকে অনুমানের ভিত্তিতেই এগোতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রেড জাদুঘর অথবা ক্যাফেতে আছে। যদি সে জাদুঘরে না থাকে, তার মানে অবশ্যই সে ক্যাফেতে আছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে শুধু জাদুঘরই খতিয়ে দেখা হলো, ক্যাফে দেখা হলো না। সাধারণত এভাবেই সঠিক সিদ্ধান্তে আসা যায় বটে, কিন্তু কখনো কখনো ভুল হওয়ারও আশঙ্কা থেকে যায়। হয়তো ফ্রেড জাদুঘরে নেই ঠিকই, কিন্তু সে ক্যাফেতেও নেই। সুতরাং কেবল জাদুঘরে না থাকাই সবসময় তার ক্যাফেতে থাকার পেছনে যুক্তি হতে পারে না।

বিচার-বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে সমাধানের চেষ্টা করে কম্পিউটার; Image Source: Researchgate

আবার নির্দিষ্ট ধারা খুঁজে বের করার মাধ্যমেও কম্পিউটার সমাধানে পৌঁছাতে পারে। সেক্ষেত্রে গাণিতিক বিচার-বুদ্ধির সাহায্য নেয়া হয়, যা অধিকাংশ সময়ই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। যেমন: একটি ধারা দেয়া আছে ১, ২, ৪, ৮, ১৬… এখান থেকে কম্পিউটার খুব সহজেই ধারার অন্তর্নিহিত সূত্রটি খুঁজে বের করতে পারবে, অর্থাৎ প্রতিবার সংখ্যাটি পূর্বাপেক্ষা দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু এভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে গেলেও যথেষ্ট তথ্য থাকা প্রয়োজন। কারণ পাঁচটি সংখ্যার বদলে এখানে যদি ১, ২… থাকত, তাহলে কম্পিউটারের পক্ষে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশে নেমে আসত। হয় সে প্রতিবার এক করে বাড়ছে বলে ভাবত, অথবা সংখ্যাটি দ্বিগুণ হচ্ছে বলে ভাবত। তাই সঠিক সূত্রটি যে কী, তা নিশ্চিতভাবে বের করার জন্য তাকে অবশ্যই অন্তত তিনটি সংখ্যা (অর্থাৎ পর্যাপ্ত তথ্য) দেখাতে হবে।

সমস্যার সমাধান

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে সমস্যার সমাধান বলতে বোঝানো হয়ে থাকে অসংখ্য সম্ভাব্য সমাধানের মধ্য থেকে নিয়মানুগ ধারায় সঠিক সমাধানটি খুঁজে বের করা। এভাবে সমস্যার সমাধানকে দুইটি প্রণালীতে ভাগ করা যায়: বিশেষ উদ্দেশ্য এবং সাধারণ উদ্দেশ্য।

একটি সমস্যার সম্ভাব্য একাধিক সমাধান নিয়ে হাজির হয় কম্পিউটার; Image Source: Resource Computer Solutions

বিশেষ উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সেই সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ধারা বর্ণিত থাকে। সে অনুযায়ী কম্পিউটারকে ধাপে ধাপে সমাধানের দিকে এগোতে হয়। অর্থাৎ বিশেষ উদ্দেশ্যের সমাধান পদ্ধতি সবসময়ই স্বতন্ত্র ও অভিন্ন থাকে। কিন্তু সাধারণ উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই কম্পিউটার বুঝতে পারে না যে তাকে ঠিক কোন পথে এগোতে হবে। তাই প্রাথমিকভাবে সে সম্ভাব্য সকল সমাধানের রাস্তা বের করে নেয়, এবং কেবলমাত্র কার্যকরী উপায়টি বের করার পরই সে ঐ নির্দিষ্ট উপায়ে এগোতে থাকে।

উপলব্ধি

যেকোনো নতুন সমস্যার সমাধানের আগ পর্যন্ত কম্পিউটার ওই ব্যাপারে একদমই অজ্ঞ থাকে। কিন্তু একবার যখন সে সমস্যাটির সমাধান করে ফেলে, তখন ওই সমাধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট উপলব্ধি জন্মে যায়।

কম্পিউটারের উপলব্ধি ঘটে এমনই জটিল প্রক্রিয়ায়; Image Source: Depositphotos

এমন উপলব্ধির ক্ষেত্রে কম্পিউটার আগে কেবল গাণিতিক সূত্রই মেনে চলত। অর্থাৎ, গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করা গেলেই শুধুমাত্র সে সমাধান প্রক্রিয়াটিকে বুঝতে সক্ষম হতো। তবে ইদানিং কম্পিউটারের সাথে বিভিন্ন সেন্সর ব্যবহৃত হচ্ছে বলে, তাকে কেবল গণিতের উপরই নির্ভর করে থাকতে হচ্ছে না। গাণিতিক যুক্তিগ্রাহ্য তো বটেই, এছাড়া অন্য কোনোভাবেও (মানবিক আবেগ, বাস্তব সম্ভাব্যতা) যদি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়, সেটিকে সে নিজের উপলব্ধির আয়তায় নিয়ে আসতে পারে।

ভাষা

ভাষা হলো মনের ভাব প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত সংকেত। সেটি যে সবসময়ই লিখিত বা কথোপকথনের ভঙ্গিতে হতে হবে, তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যেমন: ট্রাফিক সাইনে কিন্তু কিছু বলা বা লেখা থাকে না, কিন্তু সেখানে দর্শিত নানা রঙের বাতিগুলোই নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে, এবং পথচলতি মানুষও সেগুলো বুঝে নিতে পারে।

কম্পিউটারে ব্যবহৃত বাইনারি কোড; Image Source: 123RF.com

ঠিক একই কথা প্রযোজ্য কম্পিউটারের ক্ষেত্রেও। মানুষের মতো কম্পিউটারের নির্দিষ্ট কোনো ভাষা নেই তো কী হয়েছে, তাতে কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। দ্বিমিক বা বাইনারি কোডে, অর্থাৎ ০ ও ১-এর সমন্বয়েই কম্পিউটারকে যাবতীয় নির্দেশাবলী দেয়া সম্ভব, এবং এভাবেই সে BASIC, COBOL, C, C++, PASCAL, FORTRAN ইত্যাদি উচ্চস্তরের ভাষা তৈরি করে নিতে পেরেছে। ফলে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক বহিঃপ্রকাশ কিংবা কার্যোদ্ধারে কম্পিউটারকে মোটেই বেগ পেতে হয় না। তবে অদূর ভবিষ্যতেই হয়তো কম্পিউটার বাইনারি কোডের বদলে মানুষের মতোই হুবহু বাংলা-ইংরেজিতে কথা বলতে পারবে, ফলে মানুষ ও কম্পিউটারের হৃদ্যতা আরো গভীর হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here