ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের নিয়মিত অনুসারী মাত্রই জানেন, খেলার অতিরিক্ত সময় কিংবা নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে আলোচনা অনুষ্ঠানগুলোতে কীভাবে বিবিধ পরিসংখ্যান নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। কোন খেলোয়াড় কতগুলো পাস সম্পন্ন করেছে থেকে শুরু করে কোন খেলোয়াড় কী পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করেছে, তার কিছুই বাদ যায় না এসব বিশ্লেষণে।

বলাই বাহুল্য, প্রাক্তন ফুটবলার ও বিশেষজ্ঞরা সাধারণ দর্শকের সামনে যেসব বিচার-বিশ্লেষণ করেন, ফুটবল ক্লাবের ম্যানেজাররাও ড্রেসিংরুমে কিংবা টিম মিটিংয়ে বসে অবশ্যই সেগুলো করেন, এবং এসবের মাধ্যমেই নির্ধারণ করেন যে পরের ম্যাচে তাদের দলের গেম প্ল্যান কেমন হবে, কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে, ইত্যাদি।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, নিছকই সংখ্যা সম্বলিত এসব পরিসংখ্যান কি যথেষ্ট গেম প্ল্যান ঠিক করার জন্য? এসব শুষ্ক পরিসংখ্যান কি আদৌ খেলাটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? পরিসংখ্যানবিদরা রাগ করতে পারেন বটে, কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, “আউট অব কনটেক্সট” পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেয়া গেলেও, আদতে তাতে কাজ খুব একটা হয় না। অন্তত ফল পাওয়া যায় না অবশ্যই।

ফুটবল ম্যাচ নিয়ে চলে বিশেষজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণ; Image Source: Getty Images

ফুটবল ম্যানেজারদের এখন যা প্রয়োজন, তা হলো একটি নতুন সিস্টেম, যা কেবল কোনো খেলোয়াড়ের অতিক্রম করা দূরত্বটুকুই তুলে ধরবে না, পাশাপাশি জানাবে যে কেন সে এই দূরত্বগুলো অতিক্রম করেছিল, এবং এক্ষেত্রে তার আতিশয্য ও প্রাবল্যই বা কী পরিমাণ ছিল। এটিও দেখতে হবে, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী, দলের তার কাছ থেকে চাহিদা কতটুকু ছিল, সে তার কত শতাংশ পূরণ করতে পেরেছিল, এবং সার্বিক বিচারে তার অবদান কী ছিল।

নতুন সিস্টেমটি একজন ম্যানেজারকে আরো জানাবে, কোন খেলোয়াড় তার ঠিক করে দেয়া গেম প্ল্যান মাঠে অনুসরণ করেছে, এবং কোন খেলোয়াড় স্বার্থপরের মতো খেলেছে। এবং সব শেষে এ সিস্টেম পরিসংখ্যানের মাধ্যমেই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার করে দেবে, প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা ও খেলার ধরনের সাথে তুলনামূলক বিচারে, ম্যানেজারের নির্ধারিত গেম প্ল্যান আদৌ কার্যকর ছিল কি না।

বর্তমানে ফুটবলের এলিট ক্লাবগুলো ম্যাচ চলাকালীন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। জিপিএস থেকে শুরু করে অটোমেটেড ক্যামেরা, কী না তারা ব্যবহার করে! যেহেতু ইউরোপসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় লিগগুলোতে খেলোয়াড়দের শারীরিক দৃঢ়তার চাহিদা ক্রমশ বেড়ে চলেছে, তাই এখন গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে এ জাতীয় পরিসংখ্যানেও, যা আপনাকে বলে দেবে একজন খেলোয়াড় খেলার মাঠে তার শারীরিক শক্তির কী পরিমাণ প্রয়োগ করতে পারছে।

সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় ফুটবল খেলোয়াড়দের; Image Source: BBC

প্রায় চার দশক ধরে, ক্লাবগুলো বিভিন্ন পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে এসেছে চিরাচরিত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। অর্থাৎ ধরুন একজন খেলোয়াড় কত দূরত্ব অতিক্রম করেছে তা বের করার জন্য তারা স্রেফ আলাদা করে তার হাঁটা ও দৌড়ের পরিমাণ। এই “সেকেলে” পদ্ধতিতে কিছু প্রাথমিক উপাত্ত, যেমন খেলোয়াড়টি মাঠে কতটা সক্রিয় ছিল প্রভৃতি জানা গেলেও, গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়গুলোই বাদ থেকে যেত। যেমন, একজন খেলোয়াড় কেন কম নড়াচড়া করেছে, এটি কি তার ত্রুটি না গেম প্ল্যানের সমস্যা ইত্যাদি।

কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে এমন সিস্টেম তৈরি করছেন, যা এসব প্রয়োজনীয় প্রশ্নের সঠিক তথ্য তুলে ধরতে পারবে।

পল এস ব্র্যাডলি ও জ্যাক ডি এড ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি গবেষণা চালান, যেখানে তারা প্রতিটি খেলার ম্যাচ ফুটেজ বিচার-বিশ্লেষণ করে খেলোয়াড়দের “হাই ইন্টেনসিটি” দূরত্ব অতিক্রমের উপাত্ত বের করেন। এরপর তারা প্রতিটি খেলোয়াড়ের স্বতন্ত্র শারীরিক প্রোফাইল, ম্যাচে তার কৌশলগত পারফরম্যান্স, এবং গেম প্ল্যান অনুযায়ী তার কর্তব্যের বিষয়গুলোকে আলাদা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।

এবং এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পায়ে বল না থাকা অবস্থায়, বলের গতিপ্রকৃতির উপর ভিত্তি করে খেলোয়াড়রা কীভাবে নিজেদের অবস্থানের পরিবর্তন করেছে, এবং পায়ে বল থাকা অবস্থায় তারা কীভাবে কতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করেছে – এ দুই ধরনের উপাত্তই এ গবেষণায় বের করা হয়েছে।

বলাই বাহুল্য, এই একই ধরনের পদ্ধতি যদি ক্লাব ম্যানেজাররাও ব্যবহার করতে শুরু করেন, তাহলে প্রতি খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সকে তারা আলাদা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে পারবেন।

পায়ে বল নিয়ে একজন ফুটবলার কতটুকু দুরত্ব অরিক্রম করল, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; Image Source: talkSPORT

অনেক সময়ই দেখা যায় যে, একজন খেলোয়াড় মাঠে খুবই সক্রিয় থাকলেও এবং নিজের সর্বস্ব নিংড়ে দিলেও, খেলার মাঝে সে বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয় না। অন্যদের তারা সে-ও প্রভাবিত হয়, ফলে অনেক দায় তার কাঁধেও বর্তায়। এভাবে ভালো খেলা সত্ত্বেও অন্যদের কারণে একজন খেলোয়াড়ের দল থেকে ছিটকে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এ বিষয়টি যে কেবল ওই একজন খেলোয়াড়ের জন্যই দুঃখজনক বিষয়, তা কিন্তু নয়। বরং এতে ওই গোটা দলেরই ক্ষতি। কেননা একজন ভালো খেলোয়াড় যেভাবে ছিটকে পড়ছে, অন্য একজন খেলোয়াড় খারাপ খেলা সত্ত্বেও দলে রয়ে যাচ্ছে, যার ফলে দলের ভারসাম্য আরো বিঘ্নিত হচ্ছে।

অথচ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এ নতুন পদ্ধতিকে যদি অটোমেশনের মাধ্যমে নিয়মিত করে তোলা যায়, তবে একজন ম্যানেজার কেবল নিজের দলের শক্তিমত্তা ও দুর্বলতার দিকগুলোই চিহ্নিত করতে পারবেন না, পাশাপাশি তিনি একই কাজ করতে পারবেন প্রতিপক্ষের উপরও। আর যখন একজন ম্যানেজারের অগাধ জ্ঞান থাকবে নিজ দলের খেলোয়াড়ি দক্ষতার পাশাপাশি বিপক্ষ দলের ব্যাপারেও, তখন তিনি প্রতিটি ম্যাচকে ধরে ধরে আরো কত বেশি কার্যকরভাবে গেম প্ল্যান নির্ধারণ করতে পারবেন, তা নিশ্চয়ই আর বলে দেয়ার অপেক্ষা রাখে না। ফলে তার সাফল্যের হার নিশ্চিতভাবেই বহুগুণে বেড়ে যাবে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পারে ফুটবলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা বাড়িয়ে দিতে আরো; Image Source: YouTube

যারা ভাবছেন, যদি সব ক্লাবই এভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে ব্যবহার করতে থাকে, তাহলে তো সব কিছু আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। কোনো দল আর বাড়তি সুবিধা পাবে না। এ কথা সত্য। তবে লাভ কেউ না কেউ তো অবশ্যই পাবে। সেই “কেউ”-টি এক্ষেত্রে আমরা, সাধারণ দর্শকরা। আমরা তখন কৌশলগত দিক থেকে আরো নিখুঁত ও মসৃণ ফুটবল দেখতে পাব। অগোছালো ফুটবলের পরিবর্তে পরিকল্পিত, ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবল দেখার অভিজ্ঞতা হবে আমাদের নিত্যদিন, যে কারণে খেলাটির প্রতি ভালোবাসাও উত্তরোত্তর বাড়তে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here