হালের উন্মাদনাই বলুন, কিংবা হুজুগ, সেটি হলো ফেসঅ্যাপ। বাজি ধরে বলতে পারি, সাম্প্রতিক সময়ে কোনো জাতীয় ইস্যু ব্যতীত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে যে ট্রেন্ডটিকে আপনি সবচেয়ে বেশিবার ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন, সেটি হলো ফেসঅ্যাপ চ্যালেঞ্জ। কে জানে, আপনি নিজেও হয়তো এ ধরনের কোনো চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়েছেন, পোস্ট করেছেন নিজের বর্তমান ও অনাগত ভবিষ্যতের ছবি!

রাশিয়ান এ অ্যাপটি নিয়ে কিন্তু সমালোচনারও শেষ নেই। অনেকেরই ভয়, অ্যাপটি আপনার গোপন তথ্য চুরি করে রাশিয়ানদের হাতে তুলে দিচ্ছে না তো! কিংবা আপনার ভবিষ্যৎ দেখানোর ছলে অ্যাপটি আপনার ভবিষ্যতকে পুরোপুরি অন্ধকারে নিমজ্জিত করে দিতে চায় না তো! এক আমেরিকান রাজনীতিবিদ তো এ-ও দাবি করেছেন যে, অতিসত্বর এফবিআইয়ের উচিৎ তদন্ত করে দেখা, এ অ্যাপের অন্তরালে আসলে কী মতলব ফেঁদেছে রাশিয়ানরা।

গোটা বিশ্ব কাঁপছে ফেসঅ্যাপের উন্মাদনায়; Image Source: CNET

আসলেই এ অ্যাপ নির্মাতারা নির্দোষ-নিরীহ মনে অ্যাপটি তৈরি করেছেন, নাকি তাদের কোনো হীন উদ্দেশ্য আছে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু যেহেতু এ অ্যাপটি পরিচালিত হয় সরাসরি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে, তাই আমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, আসলে কতটা নিখুঁতভাবে নিজের “প্রকৃত” কাজটি করতে পারে এ অ্যাপ। কেননা এ অ্যাপের কার্যকারিতা যে পরোক্ষভাবে আমাদেরকে ইঙ্গিত দেয় সামগ্রিক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অগ্রগতি সম্পর্কেও।

তাই নিঃসন্দেহে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, অ্যাপটি কতটা নিখুঁত। আর সে কাজটি করে দিয়েছে বিবিসি নিউজবিট। তারা বিভিন্ন তারকার অতীতের ছবিকে ফেসঅ্যাপ করার মাধ্যমে তুলনা করে দেখিয়েছে, সেগুলোর সাথে তাদের বর্তমান চেহারার কতটুকু মিল রয়েছে। এবং সে অনুযায়ী তারা ফেসঅ্যাপকে দশের মধ্যে নম্বরও দিয়েছে।

চলুন, আর দেরি না করে আমরাও দেখে নিই, ফেসঅ্যাপ (কিংবা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) আদৌ পাশ নম্বর তুলতে পারল কি না।

স্যার ইয়ান ম্যাককেলেন

স্যার ইয়ান ম্যাককেলেন; Image Source: GETTY IMAGES/FACEAPP/ALAMY

অ্যাপটিকে পুরোপুরি নিখুঁতই বলা চলে স্যার ইয়ান ম্যাককেলেন অর্থাৎ দ্য লর্ড অব দ্য রিংসের গ্যানডালফের ক্ষেত্রে।

বাঁয়ের ছবিটি যখন তোলা হয়েছিল (১৯৬৮ সালে), তখন ম্যাককেলের বয়স ত্রিশও ছোঁয়নি। মাঝখানের ছবিটি ফেসঅ্যাপের মাধ্যমে কারিকুরি করা, আর একদম ডানের ছবিটি নেয়া হয়েছে এক্স মেন: ডেজ অব ফিউচার পাস্ট ছবি থেকে, ৭৫ বছর বয়সে ম্যাককেলেন যেখানে অভিনয় করেছেন ম্যাগনেটোর ভূমিকায়।

দেখতেই পাচ্ছেন, ফেসঅ্যাপের কৃত্রিম ছবির সাথে স্যার ইয়ানের বর্তমান চেহারা হুবহু মিলে গেছে। তাই এক্ষেত্রে ফেসঅ্যাপকে ১০/১০ দেয়াই যায়।

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো; Image Source: GETTY IMAGES/FACEAPP

হ্যাঁ, এটিও খুব খারাপ নয়।

বাঁয়ের ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৯৬৫ সালে, স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোর বয়স যখন ৩৯ বছর। মাঝখানের ছবিটি ফেসঅ্যাপের মাধ্যমে তৈরি, আর ডানের ছবিটি এ বছরের শুরুর দিকে তোলা, যখন তার বয়স ৯৩ বছর।

পুরোপুরি মিলে না গেলেও, এক্ষেত্রে ফেসঅ্যাপ বাস্তবের অনেকটা কাছাকাছিই যেতে পেরেছে। তাই এক্ষেত্রে সে পাচ্ছে ৭/১০।

ডলি পারটন

ডলি পারটন; Image Source: GETTY IMAGES/FACEAPP

নাহ, এটি একদমই সন্তোষজনক নয়।

একদম বাঁয়ের ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৯৭৭ সালে, কান্ট্রি সিঙ্গার ডলি পারটনের বয়স যখন ত্রিশের গোড়ায়। মাঝখানেরটি সেই ছবির ফেসঅ্যাপ’ড সংস্করণ, আর একদম ডানেরটি ২০১৯ সালের শুরুর দিকে তোলা, যখন তার বয়স ৭৩।

বলাই বাহুল্য, ফেসঅ্যাপে তাকে যেমন দেখাচ্ছে, সে তুলনায় অনেক সুন্দরভাবেই বুড়িয়েছেন ডলি পারটন। এক্ষেত্রে তাই ২/১০-এর বেশি দেয়া যাচ্ছে না ফেসঅ্যাপকে। আরো উন্নতির প্রয়োজন।

মরগান ফ্রিম্যান

মরগান ফ্রিম্যান; Image Source: GETTY IMAGES/FACEAPP

বাঁয়ের ছবিটি ১৯৯০ সালে তোলা, যখন মরগান ফ্রিম্যানের বয়স পঞ্চাশের গোড়ায়। তখনো তার দুচোখে দারুণ একটা উজ্জ্বলতা ছিল, যা অনেকটাই মলিন হয়ে গেছে মাঝখানের ফেসঅ্যাপ’ড ছবিটিতে। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয়, বাস্তবে তা ঘটেনি। এ বছরের জুনে তোলা ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, ফ্রিম্যানের চোখে আজো সেই উজ্জ্বলতা বর্তমান।

সুতরাং এক্ষেত্রে ফেসঅ্যাপকে ভালো বললেও খুব ভালো বলা চলে না। একজন মানুষের চেহারার অন্যতম আকর্ষণীয় দিকটিকেই এভাবে মুছে দিলে কীভাবে হবে, ফেসঅ্যাপ? তাই এক্ষেত্রে নম্বর টেনেটুনে ৬/১০।

ডেইম জুডি ডেঞ্চ

জেইম জুডি ডেঞ্চ; Image Source: GETTY IMAGES/FACEAPP

বাঁয়ের ছবিটি তোলা ১৯৬৭ সালে, কিংবদন্তী অভিনেত্রী ডেইম জুডি ডেঞ্চের বয়স যখন ৩৩। মাঝেরটি? ঠিকই ধরেছেন, ফেসঅ্যাপ করা। আর ডানেরটি ২০১৯ সালে তোলা, যখন তার বয়স ৮৪।

আর কিছু না হোক, এটুকু আমরা বলতেই পারি যে জেমস বন্ড অভিনেত্রী এ ফলাফলে খুব একটা খুশি হতেন না।

ফেসঅ্যাপ আবারো পাচ্ছে ৬/১০। আরো চেষ্টা করতে হবে।

আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার

আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার; Image Source: GETTY IMAGES/FACEAPP

সত্যি কথা বলতে, এটি কিন্তু বেশ ভালো,

বাঁয়ের ছবিটি ১৯৭৬ সালে তোলা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার নামের এক তরুণ অস্ট্রিয়ান অভিনেতার। মাঝের ছবিটি প্রক্রিয়াজাত হয়েছে ফেসঅ্যাপের মাধ্যমে। আর একদম ডানের ছবির মানুষটি সিরিয়াস রাজনীতিবিদ আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের; ২০১৯ সালে ছবিটি তোলার সময় যার বয়স ৭৪।

ফেসঅ্যাপ পাচ্ছে ৮/১০।

ফেসঅ্যাপ কী?

আর যা-ই হোক, ফেসঅ্যাপ নতুন কিছু নয়। সেই দুবছর আগেই এটি প্রথম সংবাদের শিরোনাম হয়েছিল এর “এথনিসিটি ফিল্টার”-এর কারণে।

এ ফিল্টারগুলো দিয়ে অ্যাপটি একজন ব্যবহারকারীর চেহারাকে এক জাতি থেকে অন্য জাতই ভেদে পরিবর্তন করে দিতে পারত। বুঝতেই পারছেন, গোটা থিমটিই কতটা সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর ছিল। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই এটি চারদিক থেকে সমালোচনায় বিদ্ধ হতে থাকে, এবং শীঘ্রই কর্তৃপক্ষ এ থিমটি তুলে নিতে বাধ্য হয়।

ফেসঅ্যাপের রয়েছে বিভিন্ন মজার ফিচার; Image Source: TechCrunch

তবে এ অ্যাপটি আরো অনেক মজাদার কাজই করতে পারে। যেমন চাইলে সে গম্ভীর মুখের কাউকে হাস্যোজ্জ্বল করে তুলতে আবার। আবার হাস্যরত মানুষটির মুখকে গুরুগম্ভীর করে তুলতে পারে। বিভিন্ন মেক-আপ স্টাইল বসাতে পারে ব্যবহারকারীর মুখে, কিংবা তার প্রিন্টেড পোর্ট্রেটও তৈরি করতে পারে। এসবের পাশাপাশি ছবিতে কারো বয়স বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেয়ার বিষয়টি তো রয়েছেই।

এই পুরো ব্যাপারটিই সে করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে। আপনার ইনপুট ছবিগুলোকে একটি অ্যালগরিদম গ্রহণ করে, তারপর আপনার পছন্দসই থিমের সাথে সেটিকে সমন্বয় করে। এবং সেই সমন্বয়ের কাজটি যে সে দারুণভাবে করছে, এতক্ষণ আলোচনার পর তা আর নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here