ফেক নিউজ বা ভুয়া সংবাদের ব্যাপারে নিশ্চয়ই নতুন করে আর কিছু বলার নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রবেশ করলেই দেখা যায় ভুয়া সংবাদের ছড়াছড়ি।

পাঠকদের বোকা বানিয়ে বেশি বেশি ভিজিটর পাওয়ার লোভে ক্লিকবেইট ওয়েবসাইটগুলোতে বহুদিন ধরেই ভুয়া সংবাদের চর্চা হয়ে আসছে। আগে তো কেবল মানুষই নিজেদের মতো করে এসব ভুয়া সংবাদ তৈরি করত। এখন তাদের সাহায্য করতে চলে এসেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সও। বিভিন্ন টেক্সট জেনারেটরের সাহায্যে খুব সহজেই সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে ভুয়া সংবাদ।

বর্তমানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সও সৃষ্টি করতে পারে ভুয়া সংবাদ; Image Source: Unbabel

তবে সমস্যা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে এর সমাধানও। এক দল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিশেষজ্ঞ তৈরি করেছে এমন একটি অ্যালগরিদম, যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা সৃষ্ট “নিউরাল” ভুয়া সংবাদ শনাক্তকরণে সক্ষম।

মজার ব্যাপার হলো, গ্রোভার নামক এ মডেলটি নিজেও একটি জেনারেটর, অর্থাৎ সে নিজেও ভুয়া সংবাদ তৈরি করতে সক্ষম। আর বিশেষজ্ঞরা শুরুতেই গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ পেয়েছেন যে, একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তখনই অন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কর্তৃক সৃষ্ট ভুয়া সংবাদ শনাক্ত করতে পারে, যখন সে নিজেও অমন সংবাদ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়।

অর্থাৎ কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতোই ব্যাপার অনেকটা। যেহেতু গ্রোভার নিজেও একটি জেনারেটর, সে কারণেই অন্য জেনারেটরের ভুয়া সংবাদ সে খুবই সফলতার সাথে শনাক্ত করে। পরিসংখ্যান বলছে, ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রেই সে মানব রচিত ও যন্ত্র রচিত সংবাদের মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে।

গ্রোভার (Grover) এর পূর্ণরূপ হলো Generating aRticles by Only Viewing mEtadata Records.

গ্রোভার কর্তৃক এই আর্টিকেলটির মূল ইংরেজি সংস্করণ রচনার নমুনা; Image Source: Adweek

নতুন এই উদ্ভাবনটি এসেছে উইনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের অ্যালেন ইনস্টিটিউট ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের গবেষকদের হাত ধরে। মে মাসের শেষ সপ্তাহে তারা এ বিষয়ক একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে। সেখানে তারা গ্রোভার মডেলটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানায়, ৯২ শতাংশ সফলভাবে ভুয়া সংবাদ শনাক্তকরণ অবশ্যই এ খাতে একটি বিশাল এগিয়ে চলার পদক্ষেপ, যেহেতু ইতিপূর্বে সর্বোচ্চ সফলতার হার ছিল ৭৩ শতাংশ, অর্থাৎ বর্তমানের চেয়ে পুরো ১৯ শতাংশ কম।

গ্রোভার মডেলটি তৈরি হয়েছে জিপিটি-২ নামক বৈপ্লবিক টেক্সট জেনারেশন সিস্টেমটির অনুকরণে। এটিই হলো সেই প্রোগ্রাম, যেটি তৈরি করেছে ওপেন এআই নামক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি, কিন্তু পরবর্তীতে বিপদের আশঙ্কায় সেটিকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রকাশ থেকে বিরত থেকেছে।

ওপেন এআই’র জিপিটি-২ কাঠামো থেকেই তৈরি হয়েছে গ্রোভাড়; Image Source: OpenAI

গ্রোভারের মূল কাঠামো জিপিটি-২ এর আদলে নির্মিত হলেও, এর উদ্ভাবকরা এটিতে নতুন কিছু সেটিংস যোগ করেছে, যার মাধ্যমে লেখার ধরন এবং লেখার বিষয়বস্তু পাবলিশার ডোমেইনের ইচ্ছানুযায়ী পরিবর্তন করা যায়।

উদাহরণস্বরূপ, আপনি চাইছেন আপনি চাচ্ছেন এ সিস্টেমটির মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট পল ক্রুগম্যানের একটি আর্টিকেল তৈরি করতে। কীভাবে তা করবেন? এক্ষেত্রে আগে আপনাকে ট্রেনিং ডাটা হিসেবে ক্রুগম্যানের পূর্বের কিছু লেখা সরবরাহ করতে হবে, এবং সেগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিস্টেমটি অনেকটাই ক্রুগম্যানের আদলে সম্পূর্ণ নতুন একটি আর্টিকেল তৈরি করে ফেলবে।

তাছাড়া প্রোগ্রামটি দিয়ে কিন্তু সময়কাল নির্দিষ্ট কনটেন্টও তৈরি করা যাবে। ধরুন, আপনি সময়কাল হিসেবে দিলেন ২০০৮ সাল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বারাক ওবামা, বিশ্বব্যাপী চলছিল অর্থনৈতিক মন্দা, কিংবা প্রথমবারের মতো বসেছিল ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের আসর। তাই সংবাদকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে, সেখানে এসব খুঁটিনাটি বিভিন্ন তথ্যেরও উল্লেখ থাকতে পারে।

থমাস ফ্রাইডম্যানের রচনাশৈলীর অনুকরণে আর্টিকেল তৈরি করেছে গ্রোভার; Image Source: Adweek

ওপেন এআই’র গবেষকদের মতো, গ্রোভার নিয়ে কাজ করা দলটিও প্রথমে দোটানায় ছিল যে তারা তাদের প্রোগ্রামটিকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে কি না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, ৩৫,০০০ ডলার মূল্যমানের এ সেটআপটি সহজেই অনুকরণযোগ্য, তাই পরবর্তীতে অন্য কেউও এটি তৈরি করে ফেলতে পারে। তাই এটি থেকে সম্ভাব্য বিপদের কথা না ভেবে, এটির ইতিবাচক দিকগুলোকেই প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। (অনলাইনে প্রোগ্রামটি পাওয়া যাবে এখানে)

এ প্রকল্পের আরেকটি চমকপ্রদ আবিষ্কার হলো, এক গুচ্ছ নমুনা পাঠকের অভিমতের মাধ্যমে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, মানবসৃষ্ট ভুয়া সংবাদ বা আর্টিকেলের চেয়ে, গ্রোভারের আর্টিকেলগুলো অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

গ্রোভার নিয়ে কাজ করেছেন যারা; Image Source: UW CSE News

গ্রোভারের গবেষক দলটিতে ছিলেন রোয়ান জেলারস, আরি হলজম্যান, হ্যানা রাশকিন, ইয়োনাটান বিস্ক, আলি ফারহাদি, ফ্রাঞ্জিসকা রোয়েসনার এবং ইয়েজিন চই। তারুণ্যে ভরপুর উদ্যমী ও স্বপ্নবিলাসী এ গবেষক দলটির মতে, যন্ত্র কর্তৃক নির্মিত ভুয়া সংবাদের গণ প্রযোজনার বিরুদ্ধে অ্যালগরিদমিক ডিফেন্স মেকানিজমের পথে তাদের এ গবেষণাটি একটি লম্বা পথচলার প্রথম ধাপ। তারা আশা করছেন, ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, এ বিষয়ে উৎসুক ও জানাশোনা অনেকেই এটি নিয়ে উচ্চতর গবেষণায় আগ্রহী হবে। পাশাপাশি তারা নিজেরাও আগামীতে এটি নিয়েই নতুন আরো কিছু গবেষণা করারও পরিকল্পনা করছেন।

শেষ করার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেয়া প্রয়োজন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এ জাতীয় নিত্যনতুন উদ্ভাবন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকবেই, এবং এগুলো আদৌ কতটা উপকারী বা অপকারী – তা নিয়েও জল্পনা-কল্পনা চলবেই। তবে এটুকু আমরা বলতেই পারি যে, একবার কোনো উদ্ভাবন ঘটলে সেটিকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সেটি কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ পাবেই। তার থেকে বরং উদ্ভাবনটিকে ইতিবাচক ক্ষেত্রে প্রয়োগই অধিক যুক্তিযুক্ত, যাতে তা থেকে সর্বোচ্চ উপকারিতা লাভ করা যায়, এবং সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ যথাসম্ভব কমিয়ে আনা যায়। গ্রোভারের গবেষক দলটিও ঠিক সেটিই করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here