নেটফ্লিক্সের প্রথম ভারতীয় অরিজিনাল ওয়েব সিরিজ সেকরেড গেমসের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? শুধু শোনা কেন, অনেকে হয়তো দুইটি সিজনই দেখেও ফেলেছেন। গণেশ গাইতোন্ডে এবং সারতাজ সিংদের সাথে পবিত্র খেলায় যোগ দিয়ে দৌড়ে বেড়িয়েছেন বোম্বে থেকে মুম্বাই, কিংবা ভারত থেকে কেনিয়া, এমনকি ক্রোয়েশিয়া পর্যন্ত।

আপনাদের এ-ও জানার কথা যে ওয়েব সিরিজটি মূলত নির্মিত হয়েছে বিক্রম চন্দ্র রচিত প্রায় এক হাজার পাতার ঢাউস আকারের সেকরেড গেমস নামক উপন্যাসটি অবলম্বনে। কে জানে, হয়তো সেই মূল উপন্যাসটিও পড়া আছে কারো কারো। যারা উপন্যাসটি পড়েছেন তারা জানেন, ৬০ বছর সময়কাল ধরে ব্যাপ্ত হয়েছে উপন্যাসটির কাহিনী, যেখানে এসেছে শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, এবং তারা পা রেখেছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, সাঁতার কেটেছে নো-ম্যান্স ল্যান্ডেও।

নেটফ্লিক্স অরিজিনাল সিরিজের সুবাদে সেকরেড গেমসের নাম সকলেই জানেন; Image Source: Netflix

এত বিশাল কলেবরের উপন্যাস লেখা কিন্তু কোনো সহজসাধ্য বিষয় নয়। হাজার পাতার বই পড়তে গিয়ে পাঠক হিসেবে আমাদেরই যদি গলদঘর্ম অবস্থা হয়, তাহলে ভেবে দেখুন সেটি লিখতে গিয়ে লেখককে কতটা কষ্ট করতে হয়!

একটি বিশাল কলেবরের উপন্যাস লেখা নিজস্ব একটি পৃথিবী তৈরির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এবং বিক্রম চন্দ্রও তার এই নিজস্ব পৃথিবীটি তৈরি করতে গিয়ে সেইসব টুলেরই আশ্রয় নিয়েছেন, যেগুলো অধিকাংশ লেখক নিয়ে থাকেন: ফ্ল্যাশকার্ড, চার্ট, স্প্রেডশিট ইত্যাদি।

কোনো কোনো লেখক, যেমন উইলিয়াম ফকনার তো প্লট আউটলাইন তৈরির জন্য এমনকি নিজের ঘরের দেয়ালকেও তার ক্যানভাস বানাতেন। বিক্রম চন্দ্র অবশ্য তেমন কিছু করেননি। প্রযুক্তি জগতের মানুষ তিনি। তাই তিনি হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন, যদি লেখকদের সহায়তাকারী কোনো সফটওয়্যার বা তেমন কিছু পাওয়া যায়।

২০০৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটি লেখার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি তখন ভাবছিলাম, নিশ্চয়ই কেউ না কেউ এই ঝামেলাগুলো মোকাবিলা করার উপযোগী একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছেন।”

বড় পরিসরের উপন্যাস লিখতে গিয়ে বেশ ঝামেলায়ই পড়েছিলেন বিক্রম চন্দ্র; Image Source: Livemint

কিসের এত ঝামেলা? সেটিও পরিষ্কার হয়ে যাবে তার পরবর্তী কথাতেই, “যখনই আপনি আপনার টেক্সটে কোনো একটি পরিবর্তন আনবেন, তা সে যত সামান্য কিছুই হোক না কেন, সেটির সূত্র ধরে ম্যানুস্ক্রিপ্টের আরো অনেকগুলো জায়গাও আপনাকে আপডেট করতে হবে। এবং সেটি করতে করতেই আমার মাথায় একটি পদ্ধতিগত ধারণা চলে আসে, যাকে সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা খুবই সম্ভব।”

ঠিক এভাবেই সেকরেড গেমস রচনাকালে একটি ছোট্ট ধারণা হিসেবে বিক্রম চন্দ্রের মাথায় জন্ম নেয় গ্রন্থিকা সৃষ্টির চিন্তা। গ্রন্থিকা কী? এটি হলো এমন একটি সফটওয়্যার, যা “ডিজিটাল যুগের জন্য লেখা ও পড়ার পদ্ধতিকে নতুন করে আবিষ্কার করবে।”

বিশাল কলেবরের উপন্যাস সেকরেড গেমস; Image Source: Twitter

একজন লেখক একটি সাধারণ প্লট মাথায় রেখেই লেখা শুরু করেন বটে, কিন্তু যতই তিনি সামনের দিকে এগোতে থাকেন, তার মাথায় কাহিনীর ডালপালা আরো বিস্তৃত হতে থাকে। নতুন নতুন আরো অনেক চরিত্র, তথ্য, স্থান, ঘটনা ইত্যাদির উদ্ভব ঘটে, এবং গোটা কাহিনীর সাথেই সেগুলোকে একাত্ম করার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়।

কোনো মানুষের পক্ষে অনায়াসে এগুলো মনে রাখা সম্ভব নয়। তাই তাকে প্রতিটি নতুন নতুন সংযোজনের ব্যাপারে কিছু নোট বা লেবেল লিখে রাখতে হয়। সেটি আগেকার দিনে তারা করতেন তাদের লেখার নোটবুক বা খসড়া খাতায়।

কিন্তু এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এভাবে কিছু নোট করে রেখে তা খুঁজে বের করা খুবই সময়সাধ্য কাজ। অনেক সময় তো সেগুলো একেবারেই গায়েবও হয়ে যায়। তবে গ্রন্থিকা এমন একটি সফটওয়্যার, যেখানে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সকল নোট সংরক্ষিত থাকে, এবং দুই-একটি কি-ওয়ার্ড লেখামাত্রই সেগুলো বের হয়ে আসে।

ডিজিটাল লেখনীকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে গ্রন্থিকা; Image Source: Granthika

আবার এ সফটওয়্যারের আছে নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যার মাধ্যমে কোনো এক জায়গার একটি পরিবর্তন থেকেই সে বুঝে নিতে পারে আর কোথায় কোথায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেমন ধরুন আপনি যেকোনো একটি ঘটনার বিবরণে পরিবর্তন আনলেন। এরপর থেকে কাহিনীর আর যেখানেই সেই ঘটনার উল্লেখ আসবে, সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন পরিবর্তনটি আপডেট হয়ে যাবে।

বড় উপন্যাস লিখতে গিয়ে লেখকদের আরেকটি বড় ঝক্কির কারণ হয়ে দাঁড়ায় ন্যারেটিভ স্টাইল। যেমন সেকরেড গেমসের কথাই ধরুন। একেকবার একেক সময়কালে চলে যাচ্ছে কাহিনী। কখনো বর্তমানের সারতাজ সিং, আবার কখনো বা অতীতের গণেশ গাইতোন্ডে। এভাবে সমান্তরালে দুইটি সময়কালের কাহিনী লিখতে গিয়ে লেখকের অনেক অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে বসতে পারে। আগের ঘটনা পরে, আর পরের ঘটনা আগে চলে আসতে পারে। তাতে করে গোটা উপন্যাসের কাহিনীই যেতে পারে ঝুলে। কিন্তু গ্রন্থিকা সফটওয়্যারটিতে আপনি একটি টাইমলাইন তৈরি করে নিতে পারবেন, যেটি আপনাকে জানান দেবে কোন ঘটনা কোথায় আসা প্রয়োজন।

লেখকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে গ্রন্থিকা; Image Source: Granthika

অনেক লেখকের আবার ভুলে যাওয়ার রোগ আছে। দুইশ পাতা আগে তিনি কী লিখেছেন, এখন আর সেটি তিনি মনে করতে পারেন না। তাই তাকে আবার দুইশ পাতা আগে ফিরে গিয়ে দেখতে হয় কী ঘটেছিল সেখানে। কিন্তু আপনি যখন গ্রন্থিকা সফটওয়্যারে বসে লিখবেন, কোনো চরিত্র, ঘটনা, স্থান, তারিখ, সময়, উপাদান কিংবা তথ্য লেখামাত্রই সেগুলোর সাথে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য তথ্য স্ক্রিনের একপাশে প্রদর্শিত হতে থাকবে। ফলে আপনি কোনো কষ্ট ছাড়াই সেসব তথ্যকে কাজে লাগিয়ে আপনার সাধারণ লেখার গতি অব্যহত রাখতে পারবেন।

প্রায় ১০-১২ বছর গবেষণার ফসল গ্রন্থিকা, যা আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এটি নির্মাণে অবদান রেখেছে ব্লুমবার্গ বেটা। বিক্রম চন্দ্রের বিশ্বাস, তার উদ্ভাবিত এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়্যার কেবল লেখকদেরই নয়, সাহায্য করবে প্রকাশক ও সম্পাদকদেরও।

যেহেতু বর্তমানে ইবুকের যুগ, তাই লেখকদের পৃষ্ঠা বা ফর্মা নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে কম। তারা পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে লিখতে পারছেন, এবং লেখার পরিধি যত খুশি বাড়াতে পারছেন। সুতরাং ভবিষ্যতে আমরা যে সেকরেড গেমসের মতো আরো বিশাল বিশাল সব উপন্যাসের দেখা পাব, সে কথা বলাই বাহুল্য। আর বিশালাকার উপন্যাসগুলো যেন আরো বেশি নিখুঁত ও নির্ভুল হয়, এবং সেগুলো রচনার অভিজ্ঞতাও যেন সুন্দর ও সাবলীল হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে গ্রন্থিকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here