আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে গুগল কাজ করছে বহুদিন ধরে, এবং এ খাতের সবচেয়ে অগ্রসর গবেষণাগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি এসেছে তাদের হাত ধরেই। তবে তারা নিজেদের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে বেশ স্পষ্ট। তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে অস্ত্র তৈরি করবে না, এমন কোনো নিরাপত্তা সিস্টেম তৈরি করবে না যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালার পরিপন্থী, এবং এমন কোনো প্রযুক্তিরও উদ্ভাবন ঘটাবে না যেখানে উপকারিতার চেয়ে অপকারিতার পরিমাণই বেশি।

তাহলে কী করতে চায় গুগল? সম্প্রতি এক সম্মেলনে বিষয়টি খোলাসা করেছেন গুগলের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলেজেন্স প্রধান জেফ ডিন। তিনি বলেছেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিংকে এ টেক জায়ান্ট ব্যবহার করতে চায় মানবজাতির স্বার্থে, যে কারণে এ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের তারা নাম দিয়েছে “আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর সোশ্যাল গুড”।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায় গুগল তাদের নিজস্ব পণ্য ও পরিষেবাগুলোর উন্নতি তো করছেই, পাশাপাশি অন্যান্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক সংস্থার সাথেপ অংশিদারিত্ব গড়ে তুলেছে তারা, যার মাধ্যমে এমন সব সমস্যার সমাধানে তারা আগ্রহী, সাধারণ মানুষের জন্য যা অনেক বেশি জটিল ও কঠিন হয়ে যায়।

“আমরা বিশ্বাস করি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় কিছু সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব। এবং এর ব্যাপ্তি কেবল কম্পিউটার বিজ্ঞানেই সিমাবোড্ডহ নয়, পাশাপাশি আপনি এটিকে আশা করতে পারেন স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও কৃষিকাজের মতো বিবিধ খাতেও,” বলেন জেফ ডিন

স্বাস্থ্যসেবা

গুগল হেলথের পণ্য ব্যবস্থাপক লিলি পেং জানান, তাদের কোম্পানি স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ফুসফুসের ক্যান্সার স্ক্রিনিং ও ব্রেস্ট ক্যান্সারের মেটাস্টেট শনাক্তকরণে সফল হয়েছে।

ফুসফুস ক্যান্সারজনিত কারণে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ১৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে, এবং এটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম মৃত্যুর কারণ।

এ বিষয়টি চিকিৎসা বিজ্ঞানে বেশ ভালোভাবেই প্রমাণিত যে, যত দ্রুত এ ক্যান্সার শনাক্ত করা যাবে, আরোগ্যলাভের সম্ভাবনাও ততই বাড়বে। কিন্তু এক্ষেত্রে সাধারণ সিটি স্ক্যানে অনেক সময় ভুল ফলাফল আসার আশঙ্কা থাকে। সিটি স্ক্যান অনেক রোগীর রোগ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়, আবার অনেক সুস্থ মানুষকেও রোগী বানিয়ে দেয়। কিন্তু গুগলের সিটি স্ক্যান মডেলটি ব্যবহার করে দেখা গেছে, এটি ৫ শতাংশ অধিক ক্যান্সার শনাক্তকরণের পাশাপাশি, ফলস পজিটিভের সম্ভাবনাও কমিয়ে দিচ্ছে ১১ শতাংশ।

গুগলের ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্তকরণ; Image Source: Health IT Analytics

এদিকে ব্রেস্ট ক্যান্সারের মেটাস্টেট শনাক্তকরণে গুগল তার মেশিন লার্নিং মডেলের সহায়তায় প্যাথোলজি ইমেজ ঠেকে ৯৫ শতাংশ ক্যান্সার লিজিয়ন বের করতে পারে। অথচ সাধারণ প্যাথোলজিস্টদের এক্ষেত্রে সফলতার হার মাত্র ৭৩ শতাংশ।

পরিবেশ সংরক্ষণ

ক্রমাগত তিমি শিকারের দরুণ হাম্পব্যাক তিমি বর্তমানে পরিণত হয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তিমিতে। কিন্তু গুগল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এ প্রজাতিটিকে পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রাখার। তাই তারা জুটি বেঁধেছে ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এন.ও.এ.এ.) সাথে।

হাম্পব্যাক তিমি; Image Source: NOAA

এ প্রকল্পটিকে সফল করতে এন.ও.এ.এ. সমুদ্র তলদেশ থেকে তাদের সংগৃহীত দীর্ঘ ১৯ বছরের অডিও ডাটা তুলে দিয়েছে গুগলের হাতে। এখন গুগল তার নিউরাল নেটওয়ার্ককে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যে কীভাবে হাম্পব্যাক তিমির ডাক চিহ্নিত করা যায়।

গুগলে কর্মরত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স গবেষকরা শুরু করেছিল সমুদ্র তলদেশের অডিও ডাটার ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনের মাধ্যমে, যার নাম স্পেকটোগ্রাম। এভাবে স্পেকটোগ্রাম থেকে অ্যালগরিদম সংগ্রহ করে তারা তাদের মেশিন লার্নিংকে আরো বুদ্ধিদীপ্ত করে তুলেছে, যা এখন অতি সহজেই হাম্পব্যাক তিমিরা কোথায় যায় বা কোথায় বাস করে এ বিষয়ক তথ্য অনুধাবন করতে পারছে।

অভিগম্যতা

অ্যামিওট্রোফিক লেটারাল স্ক্লেরোসিস (এ.এল.এস.) হলো একটি নিউরো ডিজেনারেটিভ কন্ডিশন, যার ফলে মানুষ কথা বলা বা নড়াচড়ার ক্ষমতা হারায়।

গুগল জুটি বেঁধেছে এমন কিছু অলাভজনক এ.এল.এস. প্রতিষ্ঠানের সাথে, যাতে করে তারা এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গি রেকর্ড করতে পারে। এরপর তারা নিজস্ব অ্যালগরিদম ভিত্তিক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে কাজে লাগিয়ে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কথাকে লিখিত রূপ প্রদান করছে।

প্রতিবন্ধীদের শব্দ ও ভঙ্গিকে লিখিত রূপ দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে গুগল; Image Source: Venture Beat

এভাবে একাধারে গুগল যেমন তাদের স্পিচ রিকগনিশনকে উন্নত করছে, তেমনই তাদের পারসোনালাইজড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যালগরিদমকে প্রশিক্ষিত করে তুলছে এমন সব শব্দ ও ভঙ্গি শনাক্ত করতে, যা গুগল হোমকে কমান্ড দিতে সক্ষম।

বন্যা পূর্বাভাস

বন্যা একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যার ফলে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো প্রতি বছর কোটি কোটি টাকাই কেবল হারায় না, বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জনজীবনও। তারপরও প্রতি বছর বন্যার দুর্গতি কমাতে না পারার কারণ, এ সংক্রান্ত সঠিক পূর্বাভাসের অভাব।

তবে গুগলের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিভাগ এখন গভীরভাবে কাজ করে চলেছে এ বিষয়টি নিয়ে, যাতে করে তারা তাদের উন্নত মেশিন লার্নিংকে কাজে লাগিয়ে ফ্লাড জোন বা বন্যাপ্রবণ অঞ্চলসমূহকে আগেভাগে শনাক্ত করতে পারে। এজন্য তারা প্রাথমিক উপাত্ত সংগ্রহ করছে নিজেদের অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট ইমেজের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকার প্রদত্ত ইমেজ থেকেও। আর এভাবেই তাদের গবেষকরা সফলভাবে গড়ে তুলেছেন ফ্লাড ফোরকাস্টিং ইনিশিয়েটিভ।

বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষকে আগে থেকে সতর্ক করে দেয় গুগল; Image Source: FirstPost

গুগল গত বছর ভারতে শুরু করেছিল তাদের একটি পাইলট প্রকল্প। এক্ষেত্রে ভারতকে বেছে নেয়ার কারণ, গোটা বিশ্বে প্রতি বছর বন্যা বা অতি বৃষ্টির কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তার ২০ শতাংশই হয় ভারতে। পাইলট প্রকল্পটি পাটনায় বন্যার আগে হাজার হাজার সিমুলেশন নিয়ে কাজ করেছিল, এবং ৯০ শতাংশ নিখুঁত পূর্বাভাস দিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, বন্যাপ্রবণ এলাকায় অবস্থানরত মানুষদের স্মার্টফোনে নটিফিকেশনের মাধ্যমে তারা সতর্কও করে দিয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here