আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগ এখন, যখন আমাদের নিত্য ব্যবহার্য যন্ত্রপাতি নিজেরাই ক্রমশ বুদ্ধিমান থেকে বুদ্ধিমানতর হয়ে উঠছে। কিন্তু এ যুগটি কি লিঙ্গ সমতাকে ত্বরান্বিত করবে, নাকি সেটিকে আরো দূরে সরিতে দেবে?

গেমা লয়েড; ওয়ার্ক ১৮০ নামক একটি অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক আন্তর্জাতিক জব নেটওয়ার্কের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি তার ইঞ্জিনিয়ারিং টিমকে নিয়ে খুবই গর্বিত। কেননা সেখানে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাই বেশি। কিন্তু সার্বিক চিত্র কি তাকে সন্তুষ্ট করতে পারছে? না। কারণ তিনি করেন, বিশ্বব্যাপী সব জায়গাতেই যদি নারী প্রকৌশলীর সংখ্যা বাড়ত, তবে অনেক ভালো হতো।

“যদি এসব কাজে পর্যাপ্ত সংখ্যক নারীর উপস্থিতি না থাকে, তাহলে আমাদের পণ্যগুলোও অতটা ভালো হবে না, যতটা আদতে হওয়া উচিৎ। এবং আমাদের পণ্যগুলো সমাজের কাছে পুরোপুরি আকাঙ্ক্ষিতও হবে না, কেননা নারীরাই যে সমাজের ৫০ শতাংশ।”

প্রযুক্তি খাতে এখনো নারীদের উপস্থিতি আশানুরূপ নয়; Image Source: Financial Times

নারী সমতা নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের কাছে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির খাতগুলোতে নারীদের অনুপস্থিতি বা ক্ষীণ উপস্থিতি খুব বড়সড় একটি মাথাব্যথার কারণ। বিশেষত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো একটি খাত, যেটি কিনা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর নেতৃত্ব প্রদান করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে পর্যাপ্ত নারীর উপস্থিতি না থাকা খুবই হতাশাজনক একটি বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে তাদের কাছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপকারিতার স্বাদ আস্বাদন করবে নারী-পুরুষ সকলেই। তাই সেখানে যেন উভয় লিঙ্গেরই সমতা ও স্বার্থ রক্ষা করা হয়, সেটিই তো কাম্য হওয়া উচিৎ। কিন্তু এখন পর্যন্ত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খাতে যারা কাজ করছে, তাদের মধ্যে মাত্র ২২ শতাংশ নারী। সুতরাং এ কথা বলাই বাহুল্য যে, এক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। প্রতি তিনজন পুরুষের বিপরীতে যদি একজন নারীকে খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়, তাহলে এ ছাড়া আর কী-ই বা হওয়ার আছে!

অনেকেরই আশংকা, আমাদের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের হাত ধরে তৈরি হচ্ছে, তাই সে ভবিষ্যতে পুরুষরাই কর্তৃত্ব স্থাপনের সুযোগ পাবে। এমন পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কোডিং থেকে শুরু করে উদ্ভাবন কিংবা বিনিয়োগ, সকল ক্ষেত্রেই নারীদের আরো বেশি সক্রিয় হওয়া উচিৎ।

তাছাড়া নারীরা যাতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে সঠিকভাবে এগোতে পারে, সে ব্যাপারে তাদের সাহায্য করাটাও বিশেষভাবে দরকার। কেননা এমন অনেক প্রযুক্তি আছে, যেগুলোকে বলা হয় ফেমটেক, যেগুলো সৃষ্টিতে নারীদের অবদান খুব বেশি পরিমাণে প্রয়োজন। যেমন নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক যেসব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পরিচালিত অ্যাপস তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর তত্ত্বাবধায়নে নারীদের উপস্থিতিই একান্তভাবে কাম্য। নতুবা এসব অ্যাপস যথাযথভাবে সৃষ্টি করা অসম্ভব।

প্রযুক্তি খাতে নারীদের অনুপস্থিতি চিন্তার কারণ; Image Source: Small Business Trends

এদিকে আইএমএফ গবেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে অটোমেশনের কারণে আগামী দুই দশকে বাজারে বিদ্যমান যে ১০ শতাংশ চাকরির সংকোচন ঘটবে, তার ফলে চাকরি হারানোর প্রকোপটা তুলনামূলকভাবে বেশি পড়বে নারীদের উপরই। ৩০টি দেশের উপর চালানো গবেষণার মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তে আসা হয়েছে যে নারীদের চাকরি খোয়াবার অনুপাতই বেশি হবে, কেননা বর্তমানে প্রযুক্তির অঙ্গনে সেসব কাজকেই অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসা বেশি সহজ, যেগুলোর সাথে নারীরা যুক্ত।

অবশ্য মুদ্রার অপর পিঠে কিছু সুখবরও কিন্তু রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা আশা করছে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে সৃষ্ট প্রযুক্তি নতুন নতুন চাকরির পদও সৃষ্টি করবে, যেগুলো একাধারে বেশ অর্থকরী ও লাভজনকও হবে। আর সেসব কাজে অনেক নারীকেই খোঁজা হবে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে উন্নতি করতে গেলে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি আবশ্যক; Image Source: IDG Connect

কিন্তু তখন পর্যাপ্ত পরিমাণ যোগ্য নারী খুঁজে পাওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না, সেটিও কিন্তু ভেবে দেখার মতো বিষয়। কারণ আইএমএফ’র গবেষণা থেকে যা জানা যাচ্ছে, তাতে বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশন ও গণিত নিয়ে পাঠরত নারীর সংখ্যা মোটেই আশানুরূপ নয়। নারীরা যদি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে কাজ করার মতো প্রয়োজনীয় শিক্ষায় শিক্ষিতই না হয়, তাহলে তো চাকরির বাজারে তাদের জন্য অজস্র সুযোগ থাকলেও কোনো লাভ নেই, তাই না?

উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কথা। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালের পর থেকেই কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি লাভকারী নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এদিকে প্রাইসওয়াটারহাউজ কুপারসের ২০১৭ সালে করা এক জরিপ থেকে জানা যাচ্ছে, যুক্তরাজ্যের মাত্র ৩ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী প্রযুক্তিকে তাদের ক্যারিয়ারের প্রধান পছন্দ হিসেবে মনে করে। অথচ ১৫ শতাংশ পুরুষের কাছে প্রযুক্তিই কিন্তু সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ক্যারিয়ার।

অবশ্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নারীদের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে দেবে, এমন তত্ত্বের সাথে কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞই একমত নন। বরং তাদের মতে, এতদিন পুরুষেরা কর্মক্ষেত্রে নারীদের চেয়ে এগিয়ে ছিল তাদের শারীরিক শক্তির কারণে। কিন্তু ভবিষ্যতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে যেহেতু শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সাধিত কাজগুলোর দায়ভার সব যন্ত্রের উপর অর্পণ করে দেয়া হবে। মানুষের ক্ষেত্রে তখন শারীরিক শক্তি নয়, দক্ষতাই বেশি প্রাধান্য পাবে। ফলে নারীরা পুরুষদের সমপর্যায়ে চলে আসবে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের টেক্কাও দিতে পারবে।

ফেই ফেই লি কম্পিউটার বিজ্ঞানের একজন বিশ্ববিখ্যাত অধ্যাপক; Image Source: YouTube

কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি, ইউনিয়ন কলেজ এবং এমআইটির শিক্ষাবিদদের করা গবেষণা থেকে জানা যায়, দলীয় কাজের ক্ষেত্রে যেসব দলে নারীদের উপস্থিতি বেশি থাকে, সেসব দলের সাফল্যের সম্ভাবনাও বেশি থাকে। এদিকে ২০১৭ সালে ম্যাককিনসিতে করা এক গবেষণা থেকে জানা গিয়েছিল, কর্মক্ষেত্রে সম্প্রদায় ও লিঙ্গভেদে বৈচিত্র্য থাকলে তা অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক হয়। কিন্তু কোনো কর্মক্ষেত্রে পুরুষদের একচেটিয়া প্রাধান্য থাকলে সেখানে খরচ অনেক বেশি হয় এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হার হ্রাস পায়।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে নারী-পুরুষের সমতার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরো ১০০ বছরেরও বেশি সময়; Image Source: Accenture

তবে শেষটা করব যে তথ্য দিয়ে, তা অনেকের কাছেই হতাশাজনক মনে হতে পারে। এ কথা যদি আমরা মেনেও নিই যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ফলে এক সময় কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে, তারপরও প্রশ্ন থেকে যায় যে সে সময়টি কবে আসবে। সম্প্রতি অ্যালেন ইনস্টিটিউট ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের করা এক গবেষণার ফলাফল জানাচ্ছে, সে সমতা আগামী ১০০ বছরের মধ্যেও আসবে না।

কোনো খাতে নারী ও পুরুষের আনুপাতিক অবস্থান জানা যায় সে বিষয়ে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা থেকে। কিন্তু এই জায়গাটিতেই অনেক পিছিয়ে রয়েছে নারীরা। ২০১৮ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ে যেখানে ৪,৭৫,০০০ জন পুরুষ গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছে, সেখানে নারীর সংখ্যা মাত্র ১,৭৫,০০০। এ থেকে বোঝাই যায়, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ে দক্ষতার দিক থেকেও নারীরা পুরুষদের তুলনায় ঢের পিছিয়ে রয়েছে।

১৯৭০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২.৮৭ মিলিয়নেরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ রচনায় নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা বিধান ২১৩৭ সাল নাগাদ ঘটবে। অর্থাৎ তার আগ পর্যন্ত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষের মধ্যে সমতা আসবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here