আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স থেকে উদ্ভূত যেসব প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে এবং নানাভাবে আমাদের জীবনকে প্রভাবিতও করছে, তার মধ্যে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তিটি অন্যতম।

অবশ্যই এ কথা সত্য যে বর্তমান আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তিসমূহের মধ্যে ফেসিয়াল রিকগনিশন এক নম্বর নয়, কেননা এর থেকেও অনেক আকর্ষণীয় ও অবিশ্বাস্য প্রাযুক্তিক সম্ভাব্যতা নিয়ে কাজ করে চলেছেন গবেষকরা। কিন্তু তাই বলে ফেসিয়াল রিকগনিশন কিন্তু একেবারে ফেলনাও নয়, বিশেষত এর পেছনে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকৃত অর্থের হিসাব করা হলে।

মার্কেটস অ্যান্ড মার্কেটসের মতে, বিশ্বব্যাপী ফেসিয়াল রিকগনিশন বাজারের মূল্যমান ২০২২ সাল নাগাদ দাঁড়াবে ৭.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এ থেকে সহজেই বোঝা যায়, বর্তমান সময় তো বটেই, এবং অদূর ভবিষ্যতেও এ প্রযুক্তিটি ঠিক কতটা প্রভাবশালী রূপে আবির্ভূত হতে চলেছে।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, আমরা সকলে কি পুরোপুরিভাবে ফেসিয়াল রিকগনিশনের ব্যবহার ও প্রায়োগিক দিক সম্পর্কে অবগত? আমরা কি জানি, ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে এ প্রযুক্তিটি?

তালিকাটি বিশাল। তবে জনপ্রিয়তার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে বিশেষ পাঁচটি খাত। তাহলে চলুন, আর দেরি না করে জেনে নিই, সবচেয়ে জনপ্রিয় কোন পাঁচটি খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি।

অ্যাকসেস কন্ট্রোল

নিজের বাসস্থানে প্রবেশের ক্ষেত্রে; Image Source: Tech Xplore

ফেসিয়াল রিকগনিশনের সর্বাধিক ব্যবহৃত দিক হলো অ্যাকসেস কন্ট্রোল বা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ। সেটি হতে পারে কারো ব্যক্তিগত ডিভাইসে, কারো বাসস্থানে, যানবাহনে, অফিসে কিংবা যেকোনো জায়গায়। এটি অনেকটা ডিজিটাল তালার মতো, যা ভেদ করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ভিন্ন আর কারো পক্ষে প্রবেশ করা অসম্ভব। এর মাধ্যমে আপনি নিশ্চিত করতে পারবেন যে, আপনার অধিকৃত কোনো জিনিসে প্রবেশের, বা তা ব্যবহারের, অধিকার কেবল আপনারই রয়েছে, কিংবা অন্য যাকে আপনি সে অধিকার দিয়েছেন।

কতটা ভরসাযোগ্য এটি? আপনি যদি কোনো তারকাও হন এবং হুবহু আপনার মতো দেখতে অন্য কেউও যদি থেকে থাকে ও জানে আপনি কোথায় থাকেন, কী ব্যবহার করেন, তারপরও একটি উন্নত ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম নিশ্চিত করবে সে যেন আপনার জিনিস ব্যবহার করতে না পারে। এমনকি ওয়েব থেকে নেয়া আপনার স্ন্যাপশটও এক্ষেত্রে তাকে খুব একটা সাহায্য করতে পারবে না।

মজার ব্যাপার হলো, সাম্প্রতিক সময় বেশ কিছু বাস্তবধর্মী ফেসিয়াল রিকগনিশন অ্যালগরিদম তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা কিনা এমন মানুষদেরকেও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সম্ভব, যারা প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে নিজেদের বাহ্যিক রূপের পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলেছে।

অ্যাটেন্ডেন্স ট্র্যাকিং অ্যান্ড কন্ট্রোল

উপস্থিতি যাচাইয়ে; Image Source: SlideShare

ধরুন আপনি কোনো একটি ক্লাস নিচ্ছেন, যেখানে কয়েকশ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকার কথা। সকলে উপস্থিত হয়েছে কি না, কিংবা ঠিক কতজন উপস্থিত হয়েছে, সেগুলো ব্যবহারের জন্য আপনি কী করবেন? চিরাচরিত ম্যানুয়াল প্রথা অনুসারে রোল কল করবেন বা মাথা গণনা করবেন? না, এক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করতে পারবে ফেসিয়াল রিকগনিশন। এবং এর আরেকটি সুবিধা হলো, ভুল করে সে একজন ব্যক্তিকে একাধিকবার গুনেও ফেলবে না। আজকাল বিভিন্ন ইভেন্টে বা খেলায় যে কতজন দর্শক হয়েছে সে সংখ্যা প্রকাশ করা হয়, তা কিন্তু সম্ভব এই সিস্টেমের কল্যাণেই।

পাশাপাশি এই সিস্টেমের পক্ষে সম্ভব কোনো ইভেন্টের শৃঙ্খলাও নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। কীভাবে? ধরুন আপনার আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসে কোনো ব্যক্তি অশিষ্ট আচরণ করছে বা কোনো একটি অপরাধ সংগঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে। আপনার স্রেফ যা করতে হবে তা হলো, আপনার মোবাইলে ফেস রিকগনিশন অ্যাপ ইনস্টল করে নিয়ে, ওই ব্যক্তির ছবিটি তুলে রাখতে হবে। এরপর ওই অ্যাপই আপনাকে ওই ব্যক্তির পরিচয় জানিয়ে দেবে, এবং সে অনুযায়ী আপনি পরবর্তীতে ব্যবস্থা নিতে পারবেন। একই কাজ সম্ভব হবে কোনো স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমেও, যদি সেটিতে ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম ইনস্টল করা থাকে।

মার্কেটিং

পর্যটন খাতে; Image Source: Sytoss

মার্কেটিং হলো ব্যবসার সেই খাত, যেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রভাব রাখছে সবচেয়ে বেশি। এবং এখন কেবল সোশ্যাল মিডিয়া বা ই-কমার্স সাইটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর স্বভাব শনাক্ত করে তাকে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ নেই। ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম বিষয়টিকে একদম ভিন্ন একটি মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে। এটি কেবল পণ্যকে বিক্রিকে সহজই করে তোলেনি, এমনকি সেইসব মুহূর্তেও বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রেখেছে, যখন হয়তো ক্রেতা অন্য কোনো পণ্য পছন্দ করে ফেলেছে, কিংবা বর্তমান পণ্যটিরই ফিচারসমূহ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ট্যুর প্রোভাইডার এক্সপিডিয়ার কথা। তারা বর্তমানে গাঁটছড়া বেঁধেছে হাওয়াই ভিত্তিক একটি ট্যুরিস্ট এজেন্সির সাথে, যারা পর্যটকদের অফার করছে বিভিন্ন ফেসিয়াল রিকগনিশন রিকমেন্ডেড ট্যুরের অপশন। এক্ষেত্রে ওই কোম্পানি কর্তৃক ব্যবহৃত সিস্টেমটি এক্সপিডিয়ার ওয়েবসাইটে আগত দর্শনার্থীদের সামনে বিভিন্ন ট্যুর লোকেশন প্রদর্শনের মাধ্যমে যাচাই করে দেখছে, কোন কোন লোকেশন তাদের মুখে সবচেয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।

ব্যাংকিং

ব্যাংকিং খাতে; Image Source: Innovation is Everywhere

আজকাল ব্যাংকিং খাতে যেন কোনো প্রতারণার ঘটনা না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন সলিউশন ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণ টু-স্টেপ তো বটেই, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনকি থ্রি-স্টেপ অথেন্টিকেশনও ব্যবহৃত হচ্ছে। এর অর্থ হলো, আপনি স্রেফ একবার নিজের পরিচয় দিলেই হবে না, আপনাকে দ্বিতীয়বার তা প্রমাণ করতে হবে, এবং কখনো বা তৃতীয়বারও। মোটামুটি জটিল একটি প্রক্রিয়া এটি, যা অনেক সময় ব্যবহারকারীর মনে বিরক্তিবোধের সৃষ্টি করে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, এভাবে প্রতারণার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।

জাতীয় নিরাপত্তা

জাতীয় নিরাপত্তায়; Image Source: The Intercept

ফেসিয়াল রিকগনিশন কেবল ব্যক্তিগত খাতেই নয়, বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু সেই ২০০১ সালেই সুপার বোল চলাকালীন হাজার হাজার দর্শকের ভিড়ে কোনো সন্ত্রাসী লুকিয়ে আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রথমবারের মতো ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবহৃত হয়েছিল। ৯/১১ ট্র্যাজেডির পর এর ব্যবহার প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়, এবং জাতীয় নিরাপত্তার সকল স্তরেই এর ব্যবহার ঘটতে থাকে।

আজকাল শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই সীমান্ত পার হওয়ার সময়, এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে কিংবা অন্যান্য সম্ভাব্য সকল স্থানেই এ প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সাধারণ ক্ষেত্রে কেবল পরিচয়পত্র সাথে রাখলেই চলে বটে, কিন্তু সংবেদনশীল স্থানগুলোতে কেউ যদি তার সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, সার্টিফিকেট ইত্যাদিও রাখে, তারপরও তাকে ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়। এর কারণ হলো, চাইলেই কেউ অন্যান্য নথি বা কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে পাল্টে নিতে পারবে, কিন্তু নিজেদের মৌখিক বৈশিষ্ট্যগুলো অবশ্যই ফেসিয়াল রিকগনিশনে ধরা পড়বে। এজন্যই, ফেসিয়াল রিকগনিশন ব্যবহারের পরও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here