আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে প্রতিনিয়ত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, এবং একে আমাদের জন্য সুখবরই বলতে হয়। কেননা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারে যে অনেক ঝুঁকি ও বিপদের আশঙ্কা রয়েছে তা অনস্বীকার্য হলেও, দিনশেষে এর উপকারিতাই কিন্তু বেশি। মানবসমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন-অগ্রগতিতে এটি অবদান রাখছে তো বটেই, পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য নতুন নতুন সব সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন করছে এটি। এই লেখায় আমরা তুলে ধরব সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের জীবনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের শ্রেষ্ঠতম পাঁচ সুবিধা সম্পর্কে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরো নিরাপদ করে তোলা

ট্রাফিক কন্ট্রোলে কাজ করছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: Sky Rocket Development

ভবিষ্যতের ট্রাফিক ব্যবস্থা হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত, কিংবা আগের থেকে অনেক বেশি অটোমেটেড তো অবশ্যই। সকল সামঞ্জস্যপূর্ণ সূচক ও সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিত্য-নতুন সব উপায় বের করছে। চেষ্টা চলছে আর কয়েক বছরের মধ্যেই আত্মচালিত গাড়ি নিয়মিতভাবে রাস্তায় নামিয়ে দেয়ার, যাতে করে যাতায়াতের মানোন্নয়ন হয়, এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়।

তবে নিরাপদ ট্রাফিক বলতে কেবল যানের নিরাপত্তার কথাই বোঝানো হচ্ছে না। এর ব্যাপকতা আরো অনেক বৃহৎ ও বিস্তৃত। চীনের কথাই ধরুন, সেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ও বহুমাত্রিকভাবে ট্রাফিক লাইটের সার্কিটগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে যখনই কোনো নির্দিষ্ট রাস্তার মোড়ে অ্যাম্বুলেন্স, কিংবা পুলিশ ও ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি এসে উপস্থিত হচ্ছে, সেটি টের পেয়ে ট্রাফিক লাইট নিজে থেকেই বদলে যাচ্ছে, যেন এমার্জেন্সি যানগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌছাতে সক্ষম হয়।

কেবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পক্ষেই সক্ষম এভাবে অগণিত সেন্সর, যান এবং অন্যান্য বিভিন্ন জিনিসের পরিমাপক ডাটাকে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করার মাধ্যমে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে যেকোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আরো নির্ভুল আবহাওয়া পূর্বাভাস

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে চলছে আবহাওউয়ার পূর্বাভাস নির্ণয়; Image Source: Memphis Daily News

শুনতে বিষয়টিকে নেহাতই মামুলি লাগতে পারে, কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, বিপুল পরিমাণ ডাটাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রযুক্তিকে একদম ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এবং এই আবহাওয়া পূর্বাভাস কেবল আজ আপনি ছাতা নিয়ে রাস্তায় বের হবেন কিংবা সানস্ক্রিন মেখে নেবেন কি না, সে সম্পর্কিত নয়। এ ধরনের পূর্বাভাস অনেক বেশি অবদান রাখছে কৃষিক্ষেত্রেও। সামনে খরা মৌসুম আসছে নাকি আবহাওয়া আর্দ্র ও ফলনের উপযোগী থাকবে, কৃষকরা এখন অনেক আগে থেকেই সে ব্যাপারে জেনে নিতে পারছে।

এছাড়া ভবিষ্যতের বৃষ্টিপাত, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতির সম্পর্কে আগেভাগে জেনে নেয়া যাচ্ছে বলে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যাচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির সংখ্যাও আশ্চর্যজনক পরিমাণে হ্রাস করা সম্ভব হচ্ছে।

বিশেষত ভবিষ্যতে যেহেতু পৃথিবীতে বড় ধরনের জলবায়ু পরিবর্তন সংঘটিত হতে চলেছে, এবং এর ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরো ঘন ঘন আঘাত হানবে, তাই এরকম কঠিন একটি পরিস্থিতি মোকাবেলায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের চেয়ে বেশি ভরসা আর কেউই দিতে পারছে না।

দ্রুততম সময়ে নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয়

চিকিৎসাক্ষেত্রে অবদান রাখছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: Leaps Mag

একটা সময় ছিল যখন চিকিৎসা শুরু করা তো দূরে থাক, চিকিৎসকদের পক্ষে অনেক রোগীর প্রকৃত রোগ নির্ণয়ই সম্ভব হতো না। সেসব রোগীর মাঝে জটিলতার পরিমাণ এত বেশি থাকত যে, সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণের পরও অনেকক্ষেত্রে কেবল অনুমানের ভিত্তিতেই তার চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হতো।

তবে এখন এই সমস্যার কার্যকরী সমাধান নিয়ে এসেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। একে কাজে লাগিয়ে চিকিৎসকরা আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে যেকোনো জটিল ও কঠিন রোগনির্ণয় করতে সমর্থ হচ্ছেন। বিশেষত ক্যান্সার নির্ণয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিস্ময়ের জন্ম দিচ্ছে।

একটি বিষয় খুবই সহজ – যত দ্রুত কোনো রোগ নির্ণয় করা যাবে, চিকিৎসকেরা তত দ্রুত সেটি সারিয়ে তোলার কাজে হাত দিতে পারবেন। ফলে রোগের প্রকোপ আরো বেড়ে যাবে না, এবং রোগটি পুরোপুরি সারিয়ে তোলার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এভাবে অদূর ভবিষ্যতেই মানবজাতির গড় আয়ুষ্কাল আরো অন্তত দশ থেকে পনেরো বছর বাড়িয়ে তোলা সম্ভব হবে। এমনকি অনেক বিশেষজ্ঞ তো গড় আয়ুষ্কাল ১০০ বছর ছাড়িয়ে যাওয়ারও ভবিষ্যদ্বাণী করছেন।

প্রযুক্তিকে আরো বেশি মানুষের নাগালে নিয়ে যাওয়া

বর্তমানে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ভয়েস কমান্ড প্রযুক্তি; Image Source: YouTube

সব মানুষের পক্ষেই তো কিবোর্ড, মাউস ব্যবহার করা কিংবা টাচস্ক্রিনে টাইপ করা সম্ভব নয়। এটি কেবল শিক্ষার অভাবের কারণে হয় ভাবলে ভুল হবে। এর পেছনে আরো অনেক কারণ থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধের পক্ষে হয়তো এখন হাত নাড়িয়ে এগুলো করা সম্ভব নয়। তাহলে তিনি কি প্রযুক্তি ব্যবহারের নিত্য-নতুন অভিজ্ঞতা থেকে বন্দিত হবেন?

না। এই সমস্যারও সমাধান করেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। সিরি, অ্যালেক্সা, গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট, কর্টানা প্রভৃতি তো আছেই, এছাড়া গড়ে উঠেছে আরো অসংখ্যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নির্ভর চ্যাটবট। তারা সকলেই নিশ্চিত করছে যেন প্রযুক্তির ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত না থাকে, বরং তা সবার মাঝেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এখন এমন অনেক মানুষই প্রযুক্তিকে নিজেদের হাতের নাগালে পাচ্ছে, যা মাত্র এক দশক আগেও সর্বসাধারণের কল্পনাতীত ছিল। যেমন গুগলের প্রজেক্ট ইউফোনিয়ার মাধ্যমে এখন প্রতিবন্ধীরাও সাহায্য পাচ্ছে, এবং তা সম্ভব হচ্ছে কেবলই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কারণে।

বস্তুনিষ্ঠতা

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পক্ষপাতদুষ্ট নয়; Image Source: Vivid Comm

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখনো অনেক মানবিক গুণাবলিই লাভ করতে সক্ষম হয়নি, যার মধ্যে রয়েছে আবেগ ও অনুভূতি। অনেক সময় এর কারণে ব্যবহারকারীকে ভোগান্তিতে পড়তে হয় বটে, কিন্তু কখনো কখনো এর মাধ্যমে বিশেষ সুবিধাও পাওয়া যায়।

কারণ, একটি কম্পিউটার সবসময়ই তার নীতিতে অটল থাকে। কোনো অবস্থাতেই সে তার বস্তুনিষ্ঠতা থেকে সরে যায় না। তাকে যেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে, সে সেভাবেই প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন ও নিজের কাজ অব্যহত রাখে।

আজকের দিনে এই জিনিসটির খুবই প্রয়োজন। একজন রক্তমাংসের মানুষের মনে সবসময়ই বিচিত্র সব আবেগ-অনুভূতি খেলা করতে থাকে, তাই তার পক্ষে কখনোই শতভাগ নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব হয় না। কাজ করতে করতে যেকোনো একজনের প্রতি তার দুর্বলতা জন্মেই, এবং তার পক্ষপাতিত্বও সেই নির্দিষ্ট জনের প্রতি প্রকাশিত হতে থাকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কম্পিউটারকে কারো প্রতিই পক্ষপাত প্রদর্শন করতে দেখা যায় না, যদি না তাকে আগে থেকেই সেভাবে প্রোগ্রাম করে রাখা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here