আগের পঞ্চাশ বছরে চাকরির বাজারে যতটুকু পরিবর্তন এসেছে, তার চেয়ে বহুগুণে বেশি পরিবর্তন এসেছে সর্বশেষ দশ বছরে। এর কারণ মূলত আধুনিক প্রযুক্তির ক্রমোন্নয়ন ও উদ্ভাবন, এবং সেই সাথে অটোমেশন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বদৌলতে ভবিষ্যৎ চাকরির বাজারে পরিবর্তনের হাওয়া আরো জোর বেগে বইতে শুরু করবে।

এমন সব নতুন নতুন চাকরির আগমন ঘটবে, যেগুলোর কথা আপনি কোনোদিন শোনা তো দূরে থাক, হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি। এখন আমরা আলোচনা করব তেমনই পাঁচটি নতুন চাকরির ব্যাপারে, এখন যেগুলোর অস্তিত্ব খুব বেশি প্রকট না হলেও, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হুমড়ি খেয়ে পড়বে সেগুলোকেই নিজেদের ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেয়ার জন্য।

পেশাদার ই-স্পোর্টস অ্যাথলেট / পেশাদার গেমার

পেশাদার গেমার; Image Source: Getty Images

ই-স্পোর্টস একটি সম্ভাবনাময় ইন্ডাস্ট্রি, যা থেকে প্রতি বছর আয়ের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। নিউজু প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালেই এ ইন্ডাস্ট্রি থেকে আয়ের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। গেমিংয়ের এই বিকাশের ছোঁয়া লাগছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। টুইচ নামের গেমিং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটি প্রতিদিন গড়ে ব্যবহার করছে ১৫ মিলিয়ন মানুষ।

এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মটির নাম হলো নিনজা, যার রয়েছে ১৪ মিলিয়ন অনুসারী, এবং একজন গড়পড়তা ব্যবহারকারী দৈনিক ৯৫ মিনিট করে ব্যয় করে।

সব মিলিয়ে এ ইন্ডাস্ট্রি যে হারে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে এবং নতুন নতুন গেমারের পাশাপাশি প্রতি বছর যত বেশি নতুন স্পন্সরেরও আগমন ঘটছে, তাতে এটি ধারণা করে নিতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না যে একটা সময় আসবে যখন অনেক গেমার আর সব বাদ দিয়ে সারাদিন গেম খেলার পেছনেই পড়ে থাকবে, এবং এটিকেই অর্থকরী পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাইবে।

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টর

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: CPL

ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বলতে বোঝায় কারো আবেগিক বিষয়ে সচেতনতা, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও বহিঃপ্রকাশ, এবং আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ককে বিচক্ষণতা ও সহানুভূতিশীলতার সাথে সামলাতে পারার দক্ষতা। এর মূল্যে রয়েছে অবশ্যই আত্মসচেতনতা, যেটি সত্যিকার অর্থেই খুব শক্তিশালী একটি মানবীয় বৈশিষ্ট্য। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও কিছুটা অর্জন করা যায়, যে চেষ্টা করে চলেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স।

কিন্তু একটি যন্ত্র বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যে নিজে থেকেই এ বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারবে? না। এটি যেহেতু একটি মানবীয় বৈশিষ্ট্য, তাই অন্য কোনো প্রজাতিকে এটির প্রশিক্ষণ দিতে গেলেও প্রয়োজন হবে একজন রক্ত-মাংসের মানুষের। এবং তারাই হবে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টর। তাদের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে কোনো যন্ত্রের আবেগিক দক্ষতা।

কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোলজিস্ট

কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোলজি; Image Source: Science

অ্যাকসেঞ্চার সাম্প্রতিক সময়ে ৬,৬৭২ জন নির্বাহীর উপর একটি জরিপ চালিয়েছে। জরিপের বিষয়বস্তু ছিল ভবিষ্যৎ বছরগুলোতে সবচেয়ে বড় প্রাযুক্তিক ধারাগুলো কী হতে পারে। জরিপ থেকে উঠে আসা এমন একটি ধারা হলো DARQ। এটি মূলত চারটি নবীন প্রযুক্তির আদ্যক্ষর:

  • ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার টেকনোলজি
  • আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স
  • রিয়েলিটি (ভার্চুয়াল ও অগমেন্টেড)
  • কোয়ান্টাম কম্পিউটিং

২০১৮ সালের ২১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে পাশ হয়েছে একটি নতুন আইন – জাতীয় কোয়ান্টাম উদ্যোগ বিধি। এখানে দশ বছরের একটি পরিকল্পনা নকশা করা হয়েছে, যা কোয়ান্টাম তথ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আরো উন্নত করার ক্ষেত্রে কাজ করবে। এবং এ উন্নয়ন কাজে প্রয়োজন হবে অনেক দক্ষ কর্মীর, যাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে খুব ভালো দখল রয়েছে।

চিফ মডার্নাইজেশন অফিসার

মডার্নাইজেশন; Image Source: Strategy+Business

ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন এখন আর কোনো পছন্দ বা সিদ্ধান্ত নয়। টিকে থাকার জন্য এটি আবশ্যক। একটি ব্যবসা কতটা প্রতিষ্ঠিত বা স্বনামধন্য, তাতেই কিছুই যাবে আসবে না, যদি না ব্যবসাটি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকতাকে বরণ করে নিতে না পারে। আর এমনটি হলে ব্যর্থতা অবশ্যম্ভাবী।

ইতিমধ্যেই ব্যবসায়ের সকল ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে, যার সাথে তাল মেলাতে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের কোম্পানিগুলো রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো যেসব আধুনিকতার সাথে ক্রেতাদেরকে আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো তা করছে এখন। অথচ মাঝের এই বিশ-পঁচিশ বছরে কিন্তু উন্নত বিশ্ব আরো এগিয়ে গেছে।

এখনকার ব্যবধানটা অন্তত পঞ্চাশ বছরের, এবং আগামীতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যত প্রয়োগ হতে থাকবে, সে ব্যবধান বাড়তে বাড়তে ১০০ বছরে গিয়ে দাঁড়াবে। তাই বাংলাদেশের, কিংবা বিশ্বের অন্যান্য দেশেরও পিছিয়ে পড়া কোম্পানিগুলোর প্রয়োজন মডার্নাইজেশন অফিসার, যারা বাজার ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য কোম্পানির সাথে নিজের কোম্পানির তুলনা করে, সেটির আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

স্মার্ট হোম আর্কিটেক্ট, বিল্ডার বা ডিজাইনার

স্মার্ট হোম; Image Source: Maker Advisor

২০১৮ সালে পার্কস অ্যাসোসিয়েটসের পক্ষ থেকে একটি জরিপ চালানো হয়েছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮ শতাংশ ভোক্তাই বলেছিল তারা তাদের বাড়িতে অন্তত একটি স্মার্ট হোম ডিভাইস রাখতে চায়। শুধু এটুকুই নয়, প্রতি বছর এই আগ্রহীর পরিমাণ ৬৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ থেকেই বোঝা যায়, স্মার্ট হোম ডিভাইসের ভবিষ্যৎ ঠিক কতটা উজ্জ্বল।

স্মার্ট হোম ডিভাইসের এ জনপ্রিয়তা থেকে আরো একটি ব্যাপার ধারণা করা যায় যে, আর কয়েক দশকের মধ্যেই স্মার্ট হোম ধারণাটিও খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। অর্থাৎ মানুষ আর কেবল দুই-একটি ছোটখাট ডিভাইসকে স্মার্ট আকারে পেয়েই সন্তুষ্ট থাকবে না, তারা চাইবে তাদের গোটা বাড়িই যেন স্মার্ট হয়ে যায়। এ অনুযায়ী পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তিরও উদ্ভাবন ঘটতে থাকবে, এবং বাড়ির নকশা তৈরির ক্ষেত্রেও সাধারণ আর্কিটেক্ট, বিল্ডার বা ডিজাইনারের জায়গায় উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এসব পেশায় আজ যারা কাজ করছেন, তাদেরকেও ওই পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তির ব্যাপারে দক্ষ হয়ে উঠতে হবে, নতুবা একদম নতুন একটি দলের আবির্ভাব ঘটবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here