যখন এনরিকো ফের্মি সিদ্ধান্ত নিলেন বেনিতো মুসোলিনির ইটালি ছেড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসার, তিনি বদলে দিলেন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য। যুক্তরাষ্টে আসার পর, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে বসে তিনি নেতৃত্ব দিলেন বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিভাজনে, এবং এর মাধ্যমে বিশাল বড় ভূমিকা রাখলেন ম্যানহাটন প্রজেক্টে। শেষ পর্যন্ত এই ম্যানহাটন প্রজেক্টই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির কারণ হলো, আর যুক্তরাষ্ট্র অধিষ্ঠিত হলো সমগ্র বিশ্ব পরিচালনার অদৃশ্য সিংহাসনে।

এনরিকো ফের্মি; Image Source: Interesting Engineering

তাই এটি মোটেই অবাক হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয় যে কিছু আমেরিকান মনে করে এমনটা ঘটবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রেও। বাইরের দেশ থেকে একে একে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন জিওফ হিন্টন, ইয়ান লেকান, ইয়োশুয়া বেঞ্জিও, অ্যান্ড্রু এনজি, ফি ফি লি-রা, যাদেরকে বলা চলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ক্ষেত্রের একেকজন এনরিকো ফের্মি।

সব মিলিয়ে, বিশ্বের সেরা ১০ জন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সকলেই এই মুহূর্তে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। তাছাড়া বিশ্বের প্রথম ১,০০০ জন গবেষকের মধ্যেও ৬৮ শতাংশেরই বাস এই দুই দেশেই। তাই আমেরিকানরা যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের লড়াইয়ে অন্য সব দেশের চেয়ে নিজেদেরকে এগিয়ে রাখছে, তা খুবই স্বাভাবিক।

বিশ্বসেরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স গবেষকদের বাস যুক্তরাষ্ট্রে; Image Source: Wikipedia

কিন্তু প্রযুক্তিগত জাগরণ কি কেবল বড় বড় আবিষ্কারের উপরই নির্ভর করে? মোটেই না। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি বিদ্যুতের কথা। টমাস আলভা এডিসন বিদ্যুৎ আবিষ্কার করেছিলেন বটে, কিন্ত এ খাতের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটেছিল মূলত এর বিবিধ প্রয়োগ প্রণালী উদ্ভাবনের মাধ্যমে। বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার প্রকৌশলী চেষ্টা শুরু করলেন কীভাবে নতুন নতুন এমন সব ডিভাইস তৈরি করা যায়, যেগুলো বিদ্যুতের মাধ্যমে চালনা সম্ভব। এই প্রকৌশলীরা কেউই কিন্তু এডিসনের মতো যুগান্তকারী কোনো আবিষ্কার করেননি। কিন্তু এডিসনের আবিষ্কারের প্রায়োগিক দিকগুলো তারা খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়েছিলেন, যে কারণে বিদ্যুতের পক্ষে সম্ভব হয়েছে গোটা বিশ্বকে দখল করে নেয়া।

একই কথা বলা যেতে পারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রেও। এটি জরুরি নয় যে সবাইকেই নতুন নতুন ধরনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আবিষ্কার করতে হবে। বরং যেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো ইতিমধ্যেই আবিষ্কৃত কৌশলগুলোর মাধ্যমে নতুন কী কী তৈরি করা যায় কিংবা সেগুলো আর কোথায় কোথায় ব্যবহার করা যায়, তা খুঁজে বের করা।

প্রাথমিক ব্যর্থতাকে ভয় পায় না অধিকাংশ চীনা স্টার্ট-আপ; Image Source: Bitcoin Magazine

আর এখানটাতেই বড় ধরনের দাঁও মেরে দিতে পারে চীনারা। তাদের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তাদের দেশের জনশক্তি। আর এই বিপুল জনশক্তির মধ্যে এমন অসংখ্য তরুণ উদ্যোক্তা আছে, যারা ‘লিন স্টার্ট আপ’-এ ভয় পায় না। লিন স্টার্ট আপের মূল কথা হলো, “ফেইল ফাস্ট, ফেইল আর্লি, অ্যান্ড ফেইল অফেন।” অর্থাৎ যখনই তারা নতুন কোনো ধারণার সন্ধান পায়, সম্ভাব্য সকল ক্ষেত্রেই তারা সেগুলো প্রয়োগ করে দেখতে থাকে। হয়তো ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই তারা ব্যর্থ হবে। কিন্তু ৯০ শতাংশ ব্যর্থতায় তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের কাছে প্রাধান্য পাবে কেবল ওই ১০ শতাংশ ক্ষেত্র, যেখানে তারা সাফল্যের দেখা পাবে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে উবার রাইড শেয়ারিংয়ের কথা। এর মাধ্যমে যে একটি নতুন ধারণার আবির্ভাব ঘটেছিল, তাতে কোনো সন্দেহই নেই। এবং যখন চীনারা দেখতে পেল এটি সাফল্যও বয়ে আনতে পারে, তখন পুরো চীন জুড়ে উদ্যোক্তাদের মাথায় যেন শেয়ারিংয়ের ভূত চেপে বসল। সব ধরনের জিনিস নিয়েই তারা শেয়ারিংয়ের ব্যবসা ফাঁদতে লাগল – শেয়ারড বাইসাইকেল, শেয়ারড মোপেড, শেয়ারড কংক্রিট মিক্সার, এমনকি শেয়ার্ড মোবাইল ফোনের চার্জারও। বলাই বাহুল্য, অধিকাংশ ব্যবসাই মুখ থুবড়ে পড়ল। কিন্তু তাতে চীনারা থোড়াই কেয়ার করে। অন্তত একটি খাতে তো তারা সাফল্য পেল। সেটি হলো মোবাইক। এত জনপ্রিয়তা পেল ধারণাটি যে সেটি দৈনিক ২০ মিলিয়ন রাইডও পেয়ে গেল, আর মাত্র তিন বছরের মধ্যেই সেটিকে ২.৭ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করে দেয়া সম্ভব হলো।

তিন বছরের মাথায় মোবাইক বিক্রি হয়েছে ২.৭ বিলিয়ন ডলারে; Image Source: Verdict

অন্যের ধারণার আদলে কিছু একটা করে সাফল্য লাভের এমন প্রচেষ্টা এখন চীনা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোম্পানিগুলোর মাঝেও দৃশ্যমান। সেরকম একটি কোম্পানি হল মেগভাই (ফেস++)। শুরুতে তারা ফাঁস মরফিং গেমস এবং ফোনের ফেস আনলক নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জয়ের দেখা পেল কিসে, জানেন? ফিন্যান্স ফ্রড অ্যাভয়েডেন্সের অ্যাপ্লিকেশনে। চীনের মোবাইল পেমেন্ট খাতের মূল্যমান যেহেতু ফুলেফেঁপে ১৮.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে (যা দেশটির জিডিপির চেয়েও বেশি), তাই এটির মাধ্যমেই বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করতে শুরু করল তারা।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে সাফল্যের মূলমন্ত্র হলো ডাটা মাইনিং। কেবল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপর ভিত্তি করে কোনো অত্যাধুনিক যন্ত্র আবিষ্কার করে বসে থাকলেই হবে না, সেটিকে প্রচুর পরিমাণ ডাটাও সরবরাহ করতে হবে, যেগুলোকে বিশ্লেষনের মাধ্যমে, মেশিন লার্নিং ও ডিপ লার্নিংকে কাজে লাগিয়ে সেই যন্ত্রটি ক্রমশ বুদ্ধিমান হয়ে উঠতে পারবে।

চীনে মোবাইল পেমেন্ট খাতের মূল্যমান ১৮.৮ ট্রিলিয়ন ডলার; Image Source: Medium

আর এক্ষেত্রেও অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও, সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে চীন। মোবাইল খাত থেকে চীনারা বছরে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে তিনগুণ বেশি ডাটা সংগ্রহ করতে পারে। এছাড়া ফুড ডেলিভারি থেকে ১০ গুণ, মোবাইল পেমেন্ট থেকে ৫০ গুণ, এবং শেয়ারড বাইসাইকেল রাইড থেকে পুরো ৩০০ গুণ। এভাবেই চীনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোম্পানিগুলো যেন অফুরন্ত তথ্যের খনির সন্ধান পেয়েছে। আর এজন্য তাদেরকে বাড়তি কোনো কষ্টও করতে হচ্ছে না। বিভিন্ন খাতে সে দেশের মানুষরা নিজেরাই তাদের ডাটা শেয়ারের মাধ্যমে তুলে দিচ্ছে কোম্পানিগুলোর হাতে, আর তা নিয়ে বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে এক নতুন উচ্চতায়।

এসব ডাটাকে কাজে লাগিয়ে চীন প্রতি বছর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংক্রান্ত যে পরিমাণ গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি করছে, তা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো। সম্প্রতি এআই২ নামক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর চীন থেকে প্রকাশিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ ও সেগুলোর গুণগতমান যাচাই করে জানিয়েছে, সর্বাধিক উদাহৃত ৫০ শতাংশ গবেষণা প্রবন্ধে এ বছরই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যাবে চীন। এছাড়াও তারা সর্বাধিক উদাহৃত ১০ শতাংশকেও ২০২০ সালের মধ্যে, এবং ১ শতাংশকে ২০২৫ সালের মধ্যে পেছনে ফেলবে।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি দেশের মোট কত শতাংশ কোম্পানি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খাতে সক্রিয় আছে। এক্ষেত্রেও চীন পরিসংখ্যানগত দিক থেকে তালিকার অন্য ছয় দেশের চেয়ে যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের এক প্রতিবেদন বলছে, চীনের ৮৫ শতাংশ কোম্পানিই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খাতের সক্রিয় খেলোয়াড়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১ শতাংশ, ফ্রান্সের ৪৯ শতাংশ, জার্মানির ৪৯ শতাংশ, সুইজারল্যান্ডের ৪৬ শতাংশ, অস্ট্রিয়ার ৪২ শতাংশ এবং জাপানের ৩৯ শতাংশ কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে এই খাতে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের লড়াইয়ে চীনের জয়ের সম্ভাবনাই সর্বাধিক; Image Source: Getty Images

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, সকল পরিসংখ্যানেই যুক্তরাষ্ট্রের থেকে বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে চীন। সে কারণেই, যদিও এখনো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শিল্পটি মাত্র বাচ্চা অবস্থায় রয়েছে, কিন্তু যখন সেটি বিকাশ লাভ করবে, ডালপালা মেলতে শুরু করবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীনেরই সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here