বলা হয়ে থাকে, অসম্ভবকে সম্ভব করাই নাকি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাজ। যন্ত্র হয়েও সে কী না পারে! সে কথা বলতে পারে। সে কোনো ছবি থেকে অতি সূক্ষ্ম চিহ্ন বা লিপি খুঁজে বের করতে পারে। এমনকি সাবওয়েতে পথ হারিয়ে ফেলা মানুষকে সঠিক রাস্তাও সে বাতলে দিতে পারে।

কিন্তু সে কি আমাদের হাসাতে পারে? আসলে না, অন্তত এখন পর্যন্ত। এবং তার এই হাসাতে না পারার অক্ষমতাই আমাদেরকে নীরবে অনেক কিছু জানিয়ে দেয়: কেন যন্ত্রের সাথে মানুষের এত তফাৎ, কেন যন্ত্র প্রভূত উন্নতি সাধনের পরও এখনো মানুষের সমপর্যায়ের বুদ্ধিমত্তা লাভ করতে পারেনি।

আজকের দিনের অধিকাংশ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সেরই মূল ভিত্তি হলো মেশিন লার্নিং, যেখানে সফটওয়্যার বিশাল কোনো ডাটা সেট থেকে এক বা একাধিক সাধারণ প্যাটার্ন খুঁজে বের করে, নিজেকে সেটির সাথে অভ্যস্ত করে তোলে, এবং সে অনুযায়ী ফলাফল তৈরি করে।

এখন পর্যন্ত হাস্যরসে যন্ত্র বেশ কাঁচা; Image Source: CISCO

যেহেতু সফটওয়্যার খুবই দ্রুতগতির এবং সে কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ে না, তাই ছোটখাট কাজের ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খুব সহজেই তার মানব প্রতিদ্বন্দ্বীদের হার মানিয়ে দিতে পারে। যেমন ধরুন বিশাল কোনো ফটো আর্কাইভ, যেখানে রয়েছে লক্ষাধিক ছবি, অথচ খুঁজে বের করা প্রয়োজন কেবল নির্দিষ্ট একটি ছবি। কাজটি অনেকটা খড়ের গাদায় শুচ খোঁজার মতো। যেকোনো রক্তমাংসের মানুষেরই এ কাজ করতে গিয়ে গলদ্ঘর্ম অবস্থা হবে। কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সেই কাজটিই করে দেবে চোখের পলকে, হয়তো এক সেকেন্ডেরও ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে।

কিন্তু ওই যে কথায় আছে না, মানুষের মন বড় জটিল, তাই মানুষের মন বোঝার চেয়ে কঠিন কাজ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। ঠিক এ জায়গাটিতে এসেই ধরা খেয়ে যায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এই সবচেয়ে কঠিন কাজটিই সে করতে পারে না। আর বলাই বাহুল্য, কৌতুক বা হাস্যরসের মূল প্রাণকেন্দ্রই হলো মন। সেই মনের হদিস যদি কেউ না পায়, তার পক্ষে কখনোই অন্যকে হাসাতে পারা বা নিজে হাসা সম্ভব হয় না।

মানুষের মন বোঝা বড্ড দুরূহ কাজ; Image Source: Getty Images

আর যন্ত্রের এ ব্যর্থতার পেছনে মানুষের ব্যর্থতাও কিছু কম নয়। কেউ একটি বিষয় নিজে খুব ভালো করে জানলেই না অন্য কাউকেও সেটি শেখাতে পারবে। কিন্তু মানুষের মনের নিগূঢ় রহস্যের সমাধান তো এখনো মানুষ নিজের করতে পারেনি। তাহলে যন্ত্রকেই বা কীভাবে সে এর দীক্ষা দেবে?

এ প্রসঙ্গে কথা বলেন একটি নামকরা ডিজাইন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের সহযোগী ভাইস প্রেসিডেন্ট অভিজিৎ থাট্টে। তিনি বলেন, “হাস্যরসের সংবিধানকে সংজ্ঞায়িত করার ব্যাপারে মানুষ কিছু সফলতা অর্জন করেছে বটে, কিন্তু এখনো বিষয়টিকে তারা পুরোপুরি কোড করতে পারেনি।” আর বলাই বাহুল্য, যন্ত্র মানুষের ভাষা বুঝবে না। তাকে কিছু বোঝাতে গেলে কোডকৃত কৃত্রিম ভাষাতেই বোঝাতে হবে।

পেশাদার স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানরাও মানেন হাস্যরসের কোনো ফর্মুলা নেই; Image Source: Netflix

এমনকি পুরোদস্তুর পেশাদার স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানরাও কিন্তু স্বীকার করেন, একটি যথাযথ কৌতুক নির্মাণের পেছনে কোনো ম্যাজিক ফর্মুলা নেই। আমরা যেসব কথায় হাসি, তার বেশিরভাগই নির্ভর করে নেপথ্য সূত্র কিংবা শরীরী ভাষার কারণে। থাট্টের মতে, “কখনো কখনো এমনকি আমরা মানুষরাও জানি না কেন একটি কৌতুক আসলে মজাদার।”

তিনি আরো বলেন, “যে কথাটি একজন মানুষের কাছে মজার মনে হচ্ছে, অন্য আরেকজনের কাছে তা মজার না-ও লাগতে পারে। একই কৌতুক আপনি দুইজন মানুষের কাছে বলে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া লাভ করতে পারেন। কৌতুক হলো মজাদার, আবার পান (কথার মারপ্যাঁচ) হলো বৈষয়িক। তাহলে, আমরা কীভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে কৌতুক সৃষ্টি করা শেখাব, যখন আমরা নিজেরাই জানি না কেন একটি কৌতুক মজাদার?”

গবেষণাগারে চলছে রোবটকে কৌতুক শেখানোর প্রচেষ্টা; Image Source: Nautilus

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অনেকটা গার্মেন্টস কর্মীদের মতো। গার্মেন্টসে কর্মরত প্রত্যেকের যেমন একেকটি ভিন্ন ভিন্ন সেক্টর থাকে, যেমন কারো বোতাম লাগানো বা কারো স্টিকার লাগানো, এবং সে কেবল ওই একটি কাজেই পারদর্শী, ঠিক তেমনই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কাজের ক্ষেত্রও অনেক সংকুচিত। সে কেবল একটি কাজই খুব ভালোভাবে করতে পারে। অনেক বিস্তৃত বা অনেকগুলো কাজ তাকে একসাথে করতে বলা হলে, তখন সে আর তা পারে না। অথচ একটি কৌতুক বুঝতে গেলে আপনাকে সেটির নেপথ্য সূত্র জানতে হবে, বক্তার বাচনভঙ্গি ও শরীরী ভাষা দেখতে হবে, তার শব্দচয়ন খেয়াল করতে হবে, সে আক্ষরিকতার বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না সেটিও পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।

আর এসব কারণেই, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পক্ষে কৌতুক বোঝা বা তৈরি করা দুঃসাধ্য একটি কাজ। কারণ গবেষকদের পক্ষে এখন পর্যন্ত এসব খুঁটিনাটি মানবীয় বুদ্ধিমত্তা ও অনুভূতির অ্যালগরিদম তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

অবশ্য তাই বলে প্রচেষ্টা যে চলছে না, এমনটিও নয়। যান্ত্রিক হাস্যরস সৃষ্টির পেছনে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রকৌশলী। তবে এখন পর্যন্ত তাদের প্রাপ্ত ফলাফল মিশ্র, এমনটিই অভিমত ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার গবেষকদের। তবে একটি জোক-টেলিং সিস্টেম নাকি মাঝারি মানের ওয়ান-লাইনার তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। যেমন, “আমি আমার কফিকেও আমার যুদ্ধের মতোই পছন্দ করি: ঠাণ্ডা।”

এলি কিউ কি আসলেই প্রবীণদের মুখে হাসি ফোটাতে সক্ষম? Image Source: Elli Q

এছাড়া হিউম্যানয়েড রোবটের মতো কমেডিয়ান রোবট উৎপাদনের প্রচেষ্টাও কিন্তু চলছে। তবে সেখানেও এখন অবধি সাফল্যের হার খুবই কম। কেননা সেগুলোতে হাস্যরস আসলে যন্ত্র তৈরি করছে না, করছে সেগুলোর নেপথ্যে থাকা মানব নিয়ন্ত্রকরাই।

যেমন লন্ডনে অবস্থিত কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির কগনিটিভ সায়েন্স রিসার্চ গ্রুপের তৈরি করা একটি কমিক রোবট বলে, “তোমরা কি জানো কে আমার বোতাম টিপে দেয়? ওই যে, যে মানুষটি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।”

তবে সে যাই হোক, হাসাতে পারার ক্ষমতা ছাড়াও মানুষ আরো অনেক কারণেই যন্ত্রকে হাস্যরস সম্পর্কে শেখানোর ব্যাপারে আগ্রহী। কেননা দিন দিন মানুষের সাথে রোবটের সম্পর্ক গভীর হচ্ছে, এবং বিভিন্ন কাজে রোবট মানুষের অনেক কাছাকাছি চলে আসছে। এমন দিনও খুব দূরে নেই, যখন একই কাজ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে করবে মানুষ ও রোবট। কিন্তু দুজন মানুষ একসাথে কোনো কাজ করার সময় যেভাবে সেটি উপভোগ করে, একে অন্যের ছোট ছোট কৌতুকে হেসে গড়িয়ে পড়ে, রোবটের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা কি তেমন সুখকর হবে? তা সম্ভব নয়, যদি রোবট হাস্যরস না বোঝে, যদি সে তার মানবসঙ্গীর প্রতিটি কথার আক্ষরিক অর্থই বের করে।

কিংবা শুধু কর্মস্থলে কেন, দৈনন্দিন জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই রোবটের সঙ্গ উপভোগ্য হবে না, যদি না তারা মানুষের মতো করে চিন্তা করতে পারে, এবং মানুষের হাসি-মজার সঙ্গী হতে পারে। যেমন এলি কিউ নামে খুবই মিষ্টি একটি রোবট আছে, যা বয়স্ক ব্যক্তিদের একাকীত্ব দূরীকরণে ব্যবহৃত হয়। সে ব্যবহারকারীদের সাথে কথা বলে, বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দেয়। এ পর্যন্ত সব ঠিকই আছে। কিন্তু একজন বয়স্ক ব্যক্তি তার শেষ বয়সে এসে কী চায়? সে চায় নাতি-নাতনিদের সাথে খেলতে, হাসিঠাট্টা করতে। এলি কিউ যত মিষ্টিই হোক, তার সাথে কি তারা এগুলো করতে পারবে? পারবে না। কারণ এলি কিউর আচরণ যে খুবই যান্ত্রিক। সে তার ব্যবহারকারীদের কোনো হাস্যকৌতুকেরই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারবে না। তাই এলি কিউ-র নির্মাতারা এর কার্যকারিতা নিয়ে যত আত্মবিশ্বাসীই হোন না কেন, কিছু খামতি রয়েই যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here