আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানে হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে কোনো যন্ত্র, বিশেষত কম্পিউটার যখন মানুষের ন্যায় বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে, তখন সেটিকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বলা হয়।

অনেকেরই হয়তো বিশ্বাস, এটি একদমই আধুনিক কিন্তু ধারণা। কিন্তু না। জড় বস্তুর মধ্যে মানবিক বুদ্ধিবৃত্তি সংস্থাপনের ধারণাটি কিন্তু শত বছরের পুরনো। সেই প্রাচীন আমল থেকেই গ্রিকদের উপকথায় রোবট সদৃশ কৃত্রিম বস্তুর উল্লেখ ছিল। তাছাড়া চীনা ও মিশরীয়রা তো বহু বছর আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত যন্ত্রপাতি তৈরির সূচনা করে গিয়েছিল। তাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে হাল আমলের উদ্ভাবন ভাবাটা হবে নিছকই বোকামি।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ধারণার সূচনা প্রাচীনকালে; Image Source: Singularity Hub

তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আধুনিক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সূচনা ঘটেছে কবে। সেক্ষেত্রে কিন্তু প্রাথমিক অবদান কিন্তু রয়েছে বিজ্ঞানীদের নয়, বরং চিরায়ত দার্শনিকদের। তারাই প্রথম মানব চিন্তাশক্তিকে প্রতীকের সাহায্যে বর্ণনার চেষ্টা চালিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেছিল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স/

কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আবির্ভাব ঘটতে একটু বেশিই সময় লেগেছিল বোধহয়। ১৯৫৬ সালে হ্যানোভারের ডার্টমাউথ কলেজে একটি সম্মেলনে জন ম্যাকার্থির মুখে প্রথম ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শব্দদ্বয় উচ্চারিত হয়।

সেই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন এমআইটির অবধারণ বিজ্ঞানী মারভিন মিনস্কিসহ স্বনামধন্য অনেকেই, যারা প্রত্যেকেই খুব আশাবাদী ছিলেন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক মারভিন মিনস্কি; Image Source: The McGill Tribune

“AI: The Tumultuous Search for Artificial Intelligence” বইটি থেকে জানা যায়, ওই সম্মেলনে মিনস্কি বলেছিলেন, “আর মাত্র একটি প্রজন্মের ভিতরই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সৃষ্টির সমস্যা দূর হয়ে যাবে।”

কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পন্ন একটি যন্ত্র তৈরি করা মোটেই সহজ ব্যাপার ছিল না। শুরুর দিকে সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতে বেশ ভালো অনুদানই পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু বেশ কয়েকবার যখন সামগ্রিক প্রতিবেদনে অগ্রগতির সমালোচনা করা হয়, তখন সরকারি অনুদানের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। সেজন্য ১৯৭৪ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সময়কালকে অভিহিত করা হয় “এআই উইন্টার” হিসেবে।

১৯৮০’র দশকে ফের এই খাত পুনরুজ্জীবিত হয়, যখন ব্রিটিশ সরকার আবারো এ খাতে অর্থ বিনিয়োগ করা শুরু করে। এর পেছনে অবশ্য তাদের নিজস্ব স্বার্থও জড়িত ছিল। তারা চাচ্ছিল প্রযুক্তিগত দিক থেকে জাপানিদেরকে পেছনে ফেলতে। আর সেই প্রয়াসেরই অন্যতম অংশ ছিল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খাতকে চাঙ্গা করে তোলা।

১৯৭৪-৮০ সাল ছিল এআই উইন্টার; Image Source: TechTalks

কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স গবেষণার খাত কখনোই ধারাবাহিক থাকেনি। বারবার তাকে উঁচু-নিচু চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে। পরবর্তী প্রতিবন্ধকতাটির আগমন ঘটে ১৯৮৭ সালে, এবং সেটি স্থায়ী হয় ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত। সেবারের শীতনিদ্রার কারণ ছিল জেনারাল-পারপাস কম্পিউটারের বাজারে ধস নামা এবং সরকারি অনুদান হ্রাস পাওয়া।

এরপর থেকে গবেষণা আবার পুরোদমে এগিয়ে চলতে শুরু করে, এবং ১৯৯৭ সালে এক চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন আইবিএমের ডিপ ব্লু প্রথম কোনো কম্পিউটার হিসেবে একজন দাবার চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে দেয়। ডিপ ব্লুর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন রাশিয়ান গ্র্যান্ডমাস্টার গ্যারি ক্যাসপারভ।

ডিপ ব্লুর কাছে হার মেনেছিলেন গ্যারি ক্যাসপারভ; Image Source: Mashable

এছাড়া ২০১১ সাল ছিল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আরো একটি উজ্জ্বল বছর। তখন কম্পিউটার জায়ান্টের প্রশ্ন-উত্তর সংক্রান্ত সিস্টেম ওয়াটসন “জিওপার্ডি!” নামক একটি কুইজ শো জিতে নেয়, এবং সেজন্য সে হারাতে সক্ষম হয় সাবেক চ্যাম্পিয়ন ব্র্যাড রাটার ও কেন জেনিংসকে।

২০১৪ সালে আবারো টকিং কম্পিউটার “চ্যাটবট” ইউজিন গুটসম্যান পত্রিকার শিরোনাম হয় একটি টুরিং টেস্টে বিচারকদেরকে ধোঁকা দিয়ে ভাবতে বাধ্য করতে যে সে আসলে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। ১৯৫০ সালে এই প্রতিযোগিতাটি গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ গণিতবিদ ও কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিংয়ের হাত ধরে। এই প্রতিযোগিতার মূল লক্ষ্য হলো যন্ত্র কতটা বুদ্ধিমান তা নির্ধারণ করা।

কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এই অর্জনটি বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ অভিযোগ তুলেছিলেন যে, চ্যাটবট মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বিচারককে ধোঁকা দিতে পেরেছিল। তাছাড়া নিজেকে একজন কিশোর এবং ইংরেজি তার দ্বিতীয় ভাষা দাবি করে সে কয়েকটি প্রশ্ন এড়িয়েও গিয়েছিল।

টুরিং টেস্টের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে; Image Source: Medium

অনেক বিশেষজ্ঞই এখন বিশ্বাস করেন যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের জন্য টুরিং টেস্ট মোটেই কোনো গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হ্যে পারে না।

“আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ করে এবং এই বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন এমন অধিকাংশ মানুষই মনে করেন যে এই টেস্টটি খুবই দুর্বল, কেননা এটি কেবল বাহ্যিক আচরণকেই আমলে নেয়,” বলছিলেন বিশেষজ্ঞ অ্যালান পারলিস। এবং এ কারণে এখন বিজ্ঞানীরা এই টেস্টের হালনাগাদ কোনো সংস্করণ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে এই টেস্টের প্রয়োজনীয়তাই সম্ভবত অদূর ভবিষ্যতে বিলীন হয়ে যাবে। কেননা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আলাদা করে পরিমাপের কী-ই বা প্রয়োজন, যখন দৈনন্দিন জীবনের সকল ক্ষেত্রেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহৃত হচ্ছে!

হ্যাঁ, এই মুহূর্তে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে মনে করা হচ্ছে প্রযুক্তির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উপাদান। ইন্টারনেট অফ থিংসের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক সকল ডিভাইসকে ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত করা হচ্ছে, আর সেসব ডিভাইসে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংযোজনের মাধ্যমে যেকোনো পরিস্থিতিতে সেগুলোকে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজ করায় পারদর্শী করে তোলা হচ্ছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমেই আসতে পারে অমরত্ব; Image Source: Live Science

যে গতিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অগ্রগতি হচ্ছে, তাতে করে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই হয়তো মানবিক শ্রমশক্তির জায়গা দখল করে নেবে কম্পিউটার ও রোবট।

কিন্তু তারপরও, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের যতটা না ক্ষতি করবে, তারচেয়ে অনেক বেশি উপকারই করবে। এর মাধ্যমে চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রচুর উন্নতি হবে ও মানুষ অমরত্ব লাভের দিকে এগিয়ে যাবে, কলকারখানায় উৎপাদনের গতি ত্বরান্বিত হবে, আসন্ন জলবায়ু ও বৈশ্বিক উষ্ণতার সংকট থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা যাবে, সাইবারনেটিক ইমপ্ল্যান্টের মাধ্যমে অগমেন্টেড হিউম্যানও গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here