নিউরালিংক; এলন মাস্কের হাত ধরে পথচলা শুরু হয়েছে এমন একটি কোম্পানি, যাদের মূল উদ্দেশ্য কীভাবে মানব মস্তিষ্কের সাথে কম্পিউটার ইন্টারফেসের সংযোগ স্থাপন করা যায় সে রাস্তা খুঁজে বের করা। সম্প্রতি তারা তাদের প্রকল্পকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আবেদন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের কাছে, যেন তারা তাদের সৃষ্ট ডিভাইসগুলো দিয়ে মানুষের উপর পরীক্ষা চালানোর অনুমতি পায়।

এলন মাস্কের দাবি অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই তাদের সিস্টেমটি দিয়ে একটি বানরের উপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে, এবং বানরটি বেশ ভালোভাবেই তার মস্তিষ্কের সাহায্যে একটি কম্পিউটারকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ হয়েছে।

এই সাফল্যের উপর ভিত্তি করেই টেক ফার্মটির আশা, তারা এখন মনোনিবেশ করবে মারাত্মক নিউরোলজিক্যাল কন্ডিশনে আক্রান্ত রোগীদের সাথে। তবে মাস্কের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য আরো অনেক বড় ও বিস্তৃত: “সুপারহিউম্যান কগনিশন” সমৃদ্ধ একটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্ম দেয়া।

এ প্রকল্প সফল হলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীরাও তাদের মস্তিষ্কের সাহায্যে কম্পিউটার চালনা করতে পারবে; Image Source: Getty Images

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাথে একীভূত হওয়া

নিউরালিংক যে ডিভাইসটি তৈরি করেছে, সেটিতে রয়েছে ৩০০০ এর বেশি ইলেকট্রোড সমৃদ্ধ একটি ছোট প্রোব। একটি নমনীয় সূতার (মানুষের চুলের চেয়েও পাতলা) সাথে প্রোবটিকে সংযুক্ত করা হয়েছে, যা একসাথে সহস্রাধিক নিউরনের কর্মকাণ্ড মনিটর করতে সক্ষম।

ফার্মটির মতে, এ সিস্টেমের প্রধান সুবিধা হলো, এটি মস্তিষ্কের খুবই নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিতে পারবে, যা সিস্টেমটিকে সার্জিকালি অনেক বেশ নিরাপদ করে তুলবে। এছাড়া মেশিন লার্নিং ব্যবহারের মাধ্যমে এটি বিভিন্ন রেকর্ডিং বিশ্লেষণ করতেও পারবে, যার ফলে সহজেই নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে যে একজন রোগীকে কোন ধরনের স্টিমুলেশন (উত্তেজক) প্রদান করা প্রয়োজন।

অবশ্য নিউরালিংক এখনো ব্যাখ্যা করেনি তাদের সিস্টেমটি কীভাবে মস্তিষ্কের কার্যাবলিকে অনুবাদ করবে, কিংবা কীভাবে ডিভাইসটি মস্তিষ্কের কোষগুলোয় উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারবে।

সাম্প্রতিক এক প্রেজেন্টেশনে মাস্ক বলেন, “বিষয়টি এমন নয় যে একদম আকস্মিকভাবেই আমরা এ নিউরাল লেসটি পেয়ে যাব, এবং এর মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্কের দখল নিতে নেব। এটি করার জন্য আমাদের আরো অনেক সময়ের প্রয়োজন।”

কম্পিউটারের সাথে মানব মস্তিষ্কের যোগসূত্র স্থাপনে কাজ করছে নিউরালিংক; Image Source: Getty Images

তবে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, যারা এ সিস্টেমটিকে বেছে নেবে, তাদের মস্তিষ্ক একটা পর্যায়ে গিয়ে অবশ্যই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাথে একীভূত হয়ে যাবে।

এর আগে অবশ্য মাস্ক সাবধান করে দিয়েছিলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এক সময় মানবসভ্যতার বৃদ্ধিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

“এমনকি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সবচেয়ে ফলপ্রদ দৃশ্যপটেও, আমরা (মানুষ) পিছিয়ে পড়ব। কিন্তু ব্রেইন মেশিন ইন্টারফেসের খুবই উচ্চমাত্রার একটি ব্যান্ডউইথের সমন্বয়ে আমরা খুব ভালো একটি সুযোগ পাব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাথে মিথোজীবিত্ব অর্জন করার।”

তিনি আরো যোগ করেন, মস্তিষ্ককে একটি ইন্টারফেসের সাথে সংযুক্ত করার ফলে মানব মস্তিষ্কে “সুপার ইন্টেলিজেন্স” এর একটি নতুন মাত্রা তৈরি হবে, যেটির মালিকানা ইতিমধ্যেই মানুষের কাছে আছে। তবে সেটি তাদের নিজেদের মস্তিষ্কে নেই, আছে তাদের হাতের স্মার্টফোনটিতে। অর্থাৎ তার ভাষ্যমতে, বর্তমানে আমরা স্মার্টফোনের সাহায্যে যেসব বুদ্ধিদীপ্ত কাজ করতে পারি, এক সময় সেগুলোর দক্ষতা অর্জন করবে স্বয়ং আমাদের মস্তিষ্কই।

মানুষই প্রথম নয়

এরপর প্রশ্নোত্তর পর্বের এক পর্যায়ে মাস্ক খোলাসা করেন যে নিউরালিংক যে ডিভাইসটি নিয়ে কাজ করছে সেটি সরাসরি মানুষের উপর প্রয়োগ করা হবে না, বরং ইতিমধ্যেই তারা সফলতার সাথে একটি বানরের মস্তিষ্কে সেটি প্রয়োগ করতে পেরেছে।

সম্প্রতি এক প্রেজেন্টেশনে নিজের লক্ষ্যের কথা জানান এলন মাস্ক; Image Source: Getty Images

এখন ফার্মটি প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছে তাদের সিস্টেমটিকে মানুষের উপর পরীক্ষা করে দেখার। কিন্তু শুধু তাদের চাওয়া দিয়েই তো আর হবে না। কাজটি বৈধভাবে করার জন্য অবশ্যই তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদন পেতে হবে।

বলাই বাহুল্য, বানরের মস্তিষ্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর জন্য যে জনশক্তির প্রয়োজন হয়েছিল, মানুষের উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোয় তার চেয়ে অনেক বেশি জনশক্তির প্রয়োজন হবে। তাই এ মুহূর্তে ১০০ জন ব্যক্তি এ ফার্মের সাথে কর্মরত থাকলেও, তারা নতুন কিছু দক্ষ কর্মীর সন্ধানে রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, নিউরাল ইন্টারফেস নির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে এমন ফার্মের ক্ষেত্রে নিউরালিংক কিন্তু অদ্বিতীয় নয়। এ প্রতিযোগিতায় রয়েছে কার্নেল নামের একটি স্টার্টআপও। প্রযুক্তি বিষয়ক উদ্যোক্তা ব্রায়ান জনসনের হাতে গড়ে ওঠা স্টার্টআপটিও কাজ করে চলেছে অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে রেখে, “মানব চেতনার আমূল উন্নয়ন ও বিস্তার ঘটানো।”

মাস্কের আরো একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প হলো হাইপারলুপ; Image Source: NBC News

উচ্চাকাঙ্ক্ষী মাস্ক

তবে যেহেতু এলন মাস্কের নাম জড়িত আছে নিউরালিংকের সাথে, তাই এটির ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করার মতো লোকেরও নেহাত অভাব নেই। এর কারণ, সাম্প্রতিক অতীতে মাস্ক অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পেরই আশ্বাস দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী কাজও শুরু করেছেন, এখন পর্যন্ত যেগুলোর খুব বেশি অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি।

কিন্তু সাফল্যের দেখা মিলুক বা না মিলুক, মাস্ক যে প্রযুক্তি দুনিয়াকে অচিন্ত্যনীয় সব স্বপ্নের সম্মুখীন করে চলেছেন, সে কথাও স্বীকার না করে উপায় নেই। তার স্পেস এক্স কাজ করছে মঙ্গল অভিযান নিয়ে, বোরিং কোম্পানি কাজ করছে লস অ্যাঞ্জেলেসের নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণের লক্ষ্যে, এবং হাইপারলুপ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি চেষ্টা করছেন মানুষের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে খোলনলচে পাল্টে দিতে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, তার এসব প্রকল্প যেদিন আলোর মুখ দেখবে, মানবসভ্যতা এক লাফে অনেকখানি এগিয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here