এই মুহূর্তে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জগতের সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যের নাম আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহণ থেকে শুরু করে উৎপাদন, বাজার, অর্থনীতি – দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে এটি। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর প্রয়োগে সহজে চোখে পড়ে না, আর পড়লেও তা বোঝার মতো মানুষ থাকে খুবই কম।

যেমন ধরুন, কেউ একজন গুগলে কোনো কিছু সার্চ করতে গিয়ে একটি শব্দ লেখা মাত্রই গুগল স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে সম্ভাব্য পুরো লাইনটি দেখিয়ে দিল, কিংবা নেটফ্লিক্সে ঢোকামাত্রই নেটফ্লিক্স তাকে তার পছন্দের ঘরানার সিনেমা ও টিভি শোর তালিকা দেখিয়ে দিল, এগুলো সবই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সেরই অবদান। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো, এগুলোর পেছনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভূমিকার ব্যাপারটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রকাশ্য থেকে যায়।

মোবাইলের জন্য রয়েছে বিভিন্ন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাপ; Image Source: IQVIS

তবে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের ক্ষেত্রে এমনটি কখনোই ঘটে না। বরং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনই হলো এই মুহূর্তে একমাত্র মাধ্যম, যেখানে আপামর সর্বসাধারণ সকলে জেনে বুঝেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের অভিজ্ঞতা লাভ করে থাকে। আর সেজন্য, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সমৃদ্ধ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা ডেভেলপারদের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ। সেই চ্যালেঞ্জের জবাবে তারা দারুণ কিছু অ্যাপ্লিকেশন আমাদেরকে দিতে সমর্থ হয়েছেন, যার মাধ্যমে আমাদের নিত্যকার জীবনযাত্রা যেমন আরো সহজ হয়ে গিয়েছে, তেমনই আমাদের এক সময়কার বোকাসোকা মোবাইল ফোনটিও এখন শুধু নামেই নয়, কাজেও প্রচন্ড রকমের স্মার্ট হয়ে উঠেছে।

চলুন পাঠক, আপনাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেয়া যাক এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা কিছু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাপ্লিকেশনের সাথে।

সিরি

সিরি; Image Source: Apple

মোবাইল ফোনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রয়োগের সর্বপ্রথম দৃষ্টান্ত বলা যেতে পারে সিরিকে। ২০১১ সালে স্টিভ জবসের আইফোনের হাত ধরে আবির্ভাব এর। এখন অ্যাপলের যাবতীয় ডিভাইস, অর্থাৎ আইফোন, আইপড, আইপ্যাড, অ্যাপল ওয়াচ ও অ্যাপল টিভির পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছে সিরি। একজন সার্বক্ষণিক সহচর হিসেবে কাজ করে ব্যবহারকারীর সকল প্রশ্নের উত্তর প্রদান, এবং ওয়েব সার্ভিসের সাথে যুক্ত থেকে তার সকল নির্দেশ মেনে চলাই সিরির কাজ। সিরি নিয়ন্ত্রিত হয় কন্ঠস্বরের মাধ্যমে, আর তাই এটি একজন ব্যবহারকারীর ভাষা ও নিজস্ব বাচনভঙ্গি আয়ত্ত করে নিয়ে সম্ভাব্য সেরা ফলাফল প্রকাশের চেষ্টা করে থাকে।

গুগল নাউ

গুগল নাউ; Image Source: Google

এই মুহূর্তে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের শ্রেষ্ঠ পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হলো গুগল নাউ, যা কিনা সিরির চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। বরং এটি সিরিকে কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন করে, এবং অনেকক্ষেত্রেই সিরিকে পেছনে ফেলেও দেয়। গুগল নাউও সিরির মতো ভয়েস কমান্ড অনুসারেই কাজ করে থাকে। এর মাধ্যমে সে আপনাকে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রদান, কোনো একটি অ্যাপ্লিকেশন খোলা, অ্যাপ্লিকেশনের আভ্যন্তরীণ কোনো কাজ করা, গান চালানো ইত্যাদি বিবিধ কাজ করে দিতে সক্ষম। এবং প্রয়োজন হলে এটিকেও আপনি সিরির মতোই পারসোনালাইজ করে ফেলতে পারেন। অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলে গুগল ব্যবহারের অভিজ্ঞতাকে আরো উপভোগ্য করে তুলতে গুগল নাউয়ের অবদান অনস্বীকার্য।

সক্রেটিক

সক্রেটিক; Image Source: Digital Trends

এটি হলো এমন একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নির্ভর অ্যাপ্লিকেশন, যা একজন শিক্ষার্থীর হোমওয়ার্ককে অনেক সহজ করে তুলতে পারে। এজন্য স্রেফ প্রশ্নের একটি ছবি তুলতে হবে মোবাইলে, এবং তার পরিপ্রেক্ষিতেই ধাপে ধাপে বিভিন্ন সমাধান পাওয়া যাবে। বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য এই অ্যাপ্লিকেশনটির কোনো তুলনাই হয় না। এটি কেবল প্রশ্নের সঠিক উত্তরই দেয় না, পাশাপাশি সেই উত্তরের পেছনের ব্যাখ্যাও সে দেয়। এভাবে নিচু শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য এটি অনেকটা সার্বক্ষণিক শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে থাকে। আর সবচেয়ে ভালো ব্যাপারটি হলো, এই অ্যাপ্লিকেশনটি একদম বিনামূল্যেই ব্যবহার করা যায়, এতে কোনো বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয় না, এবং কোনো ফিচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধাও দেয়া হয় না।

মাইক্রোসফট পিক্স

পিক্স; Image Source: Microsoft

এটি মাইক্রোসফটের তৈরি করা অসাধারণ একটি ক্যামেরা অ্যাপ, যা মোবাইল ফটোগ্রাফিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভিত্তিতে সৃষ্ট এই অ্যাপটি ছবির গভীরতা বৃদ্ধির জন্য মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে থাকে। এই অ্যাপটি নিশ্চিত করে যেন কোনো ছবিকে পরিষ্কার, বাস্তবসম্মত এবং দেখতে অনেক সুন্দর মনে হয়।

হাউন্ড

হাউন্ড; Image Source: Google Play

এটি হলো আরেকটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাপ, যা আপনার কন্ঠস্বরকে কাজে লাগিয়ে কোনো কিছু খুঁজে বের করতে সক্ষম। এটি শুধু দ্রুতগতিরই নয়, এটি আপনার প্রাকৃতিক বা সাধারণ কন্ঠস্বরকেও গ্রহণ করতে সক্ষম। তাই এই অ্যাপটি ব্যবহারের সময় আপনার কোনো বিশেষ কি-ওয়ার্ড ফ্রেজ শেখার প্রয়োজন পড়বে না। এটি আপনাকে আবহাওয়া, তাপমাত্রা, নেভিগেশন, কোনো স্থানের নির্দেশনা, উবারের সম্ভাব্য ভাড়া, যাত্রার সময়, শেয়ারবাজারের দর ইত্যাদি জানাতে পারবে। এছাড়া এটির মাধ্যমে আপনি কাউকে কল দেয়া, কোনো সংবাদ বা ভিডিও অনুসন্ধানের কাজও করতে পারবেন।

কর্টানা

কর্টানা; Image Source: Microsoft

এটি দারুণ বুদ্ধিমান একটি পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাপ, যা মাইক্রোসফট প্রথমে কেবল উইন্ডোজ ফোনের জন্য তৈরি করেছিল। তবের সুখের সংবাদ হলো, এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাপ্লিকেশনটি এখন অ্যান্ড্রয়েড, এক্সবক্স ওয়ান, উইন্ডোজ ১০, এমনকি আইওএস অপারেটিং সিস্টেমেও চালানো সম্ভব। এটিও ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমেই কাজ করে, এবং ইনস্টলকৃত ব্রাইজারে অনুসন্ধানের মাধ্যমে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে।

অ্যালেক্সা

অ্যালেক্সা; Image Source: Amazon

শুরুতে অ্যামাজন একো স্পিকারের অন্তর্ভুক্ত একটি ভয়েস রিকগনিশন ইঞ্জিন হিসেবে অ্যালেক্সার পথচলার সূচনা ঘটে। তবে এখন অ্যামাজন প্রণীত সকল স্মার্ট ডিভাইসেই অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে অ্যালেক্সার পরিষেবা পাওয়া যায়। এটিও অন্যান্য পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো ব্যবহারকারীর সকল প্রশ্নের উত্তর ও চাহিদার যোগান দিতে সক্ষম। তাছাড়া এটি ক্লাউডের সাথেও যুক্ত। ফলে একজন ব্যবহারকারী যতই এটি ব্যবহার করে, অ্যালেক্সা তার ব্যাপারে আরো বেশি করে জানতে পারে, এবং পরবর্তীতে আরো কার্যকরভাবে তাকে সেবা প্রদান করতে পারে।

কিনেক্ট

কিনেক্ট; Image Source: Microsoft

এটি মূলত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি মুভমেন্ট কন্ট্রোলার এবং মুভমেন্ট ডিটেক্টর। মাইক্রোসফট কর্তৃক নির্মিত এই অ্যাপ্লিকেশনটি ব্যবহার করা যায় এক্সবক্স ওয়ান এবং এক্সবক্স ৩৬০-এ। প্রধানত গেমস খেলার জন্য এটির সর্বাধিক ব্যবহার হয়ে থাকলেও, এখন এটি বিভিন্ন নন-গেমিং কাজ যেমন সোশ্যাল ইনস্যুরেন্স, রিটেইল ইন্ডাস্ট্রি, সেনাবাহিনী এবং মেকানিক্যাল প্রযুক্তিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

ব্রেইনা

ব্রেইনা; Image Source: Microsoft

ব্রেইনা একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ফ্রি অ্যাপ, যা উইন্ডোজ কম্পিউটারে একটি পারসোনাল প্রোডাক্টিভিটি সফটওয়্যার এবং ভার্চুয়াল অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে দারুণ কাজ করে থাকে। ব্যবহারকারীর কণ্ঠে প্রাপ্ত নির্দেশে ব্রেইনা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং কম্পিউটারে বিভিন্ন কাজ করে থাকে। এর বিল্ট-ইন স্পিচ রিকগনিশন প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যবহারকারী পায় অ্যান্ড্রয়েডের জন্য ব্যবহৃত ব্রেইনা অ্যাপটির সাথে ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ। তবে এই মুহূর্তে কেবল ইংরেজি ভাষাতেই পাওয়া যাচ্ছে অ্যাপটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here