আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যে আমাদের নিত্যকার কর্মকাণ্ড ও অভ্যাস ট্র্যাক করে, এবং সে অনুযায়ী প্রায় অব্যর্থ সব ফলাফল তৈরি করে, এ আর নতুন কী! কিন্তু কম্পিউটার বা এ জাতীয় কোনো যন্ত্রের মাধ্যমে আমাদের আবেগ-অনুভূতিকে পর্যবেক্ষণ ও বিচার-বিশ্লেষণ করার বিষয়টি এখনো অনেকের কাছেই বেশ অদ্ভূত একটি বিষয়। তাছাড়া অনেকে এটিকে ভালো চোখেও দেখেন না।

কিন্তু প্রযুক্তি যেভাবে প্রতিনিয়ত সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে, তাতে করে সাধারণ মানুষ এক সময় এ বিষয়টির সাথেও নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারবে যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আসলেই তাদের চিন্তা-ভাবনা ও অনুভূতিকে পড়তে পারছে, এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলছে আরো সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।

ইতিমধ্যেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পরিণত হয়েছে আমাদের রোজকার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে। উদাহরণস্বরূপ, স্টারবাকস আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে ব্যবহার করছে তাদের রিওয়ার্ডস প্রোগ্রাম এবং মোবাইল অ্যাপে, যেন তারা ক্রেতাদের অর্ডার, কখনো তারা সেটি প্লেস করছে, তখন কী ধরনের আবহাওয়া ছিল এ জাতীয় বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ট্র্যাক করতে পারে। কারণ এসব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই তারা প্রতিটি ক্রেতার জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র রিকমেন্ডেশন তৈরি করে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করছে স্টারবাকস; Image Source: Starbucks

এদিকে অ্যামাজনও ই-কমার্স জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে ক্রেতাদের ইতিপূর্বের ক্রয়গুলোকে বিশ্লেষণ করে নতুন নতুন প্রায় নিখুঁত সব পণ্যের রিকমেন্ডেশন প্রদর্শন করে।

এ বিষয়গুলো অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সত্যি কথা হলো, এগুলো কেবলই পানির উপর ভাসমান বরফখণ্ডের মতো। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যে আরো কত অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।

খুব শীঘ্রই, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ভিত্তিক কাস্টোমার সার্ভিস তথা গ্রাহক পরিষেবা আর কেবল মানুষকে সহায়তার কাজেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি আমাদের অনুভূতিকেও বুঝতে শুরু করবে। এবং সেই অনুভূতিজাত তথ্য-উপাত্তকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলো তাদের গ্রাহকসেবার মান আরো অনেক বেশি উন্নত করে তুলবে।

স্রেফ একবার কল্পনা করে দেখুন, একবার যদি (কিংবা বলা ভালো, ‘যখন’) আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানবীয় অনুভূতিকে মূল্যায়ন করতে শুরু করে, তারপর থেকে ইন-পারসন সার্ভিসে কীভাবে নবজাগরণের সৃষ্টি হবে। কোনো একটি দোকান খুঁজে পাচ্ছেন না? সেন্সর — যেমন ধরুন মাইক্রোফোন, ক্যামেরা অথবা ফেশিয়াল স্ক্যানার — আপনার মৌখিক অভিব্যক্তি বিশ্লেষণ করেই টের পেয়ে যাবে আপনি কতটা বিরক্ত বা উদ্বিগ্ন, এবং সাথে সাথে তারা কোনো মানুষ বা রোবটকে পাঠিয়ে দেবে আপনার সাহায্যার্থে।

ই-কমার্স জগতে বিপ্লব এনেছে অ্যামাজনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: Raconteur

কিংবা ধরুন আপনি কোনো রেস্টুরেন্টের ধীরগতির সার্ভিস নিয়ে খুবই বিরক্ত। তবে আপনার টেবিলে রাখা থাকবে একটি ছোট আকৃতির, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্বলিত কম্পিউটার। নানা ধরনের সেন্সরের সাহায্যে সেটি আপনার মৌখিক অভিব্যক্তি কিংবা কণ্ঠস্বরকে মূল্যায়ন করে বুঝে যাবে আপনি অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। এ বার্তা সে দ্রুত রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপনা বিভাগকে জানিয়ে দেবে, এবং চটজলদি তারা আপনার কাছে তাদের অন্য কোনো কর্মচারীকে পাঠিয়ে দেবে। কম্পিউটার যদি বুঝতে পারে আপনি শুধু অধৈর্যই নন বরং খুব রেগেও গেছেন, রেস্টুরেন্ট সম্পর্কে আপনার মনে ইতিবাচক ধারণা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তারা আপনাকে একটি ফ্রি ট্রিটও দিতে পারে।

এ ধরনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বদলে দেবে আপনার অনলাইনে কেনাকাটার অভিজ্ঞতাও। আপনি হয়তো কোনো অনলাইন শপের ওয়েবসাইটে স্ক্রল করেই চলবেন পছন্দের পোশাকটি খুঁজে বের করার জন্য। কিন্তু কিছুতেই আপনি পছন্দসই পোশাক পাবেন না। বারবার একই ধরনের পোশাকই ঘুরে ফিরে আসবে। তখন কম্পিউটার তার ফ্রন্ট-ক্যামেরা দিয়ে আপনার মৌখিক অভিব্যক্তির ছবি তুলে পাঠিয়ে দেবে ওই ওয়েবসাইটে। এরপর তারা তাদের নিজস্ব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করবে যে কোন ধরনের পোশাক দেখে আপনি বিরক্ত হচ্ছেন, আর কোনগুলো দেখে আপনার চোখমুখ উজ্জ্বল ও আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এরপর সে অনুযায়ী বিরক্ত হওয়ার মতো পোশাকগুলো তারা আপনার সামনে থেকে সরিয়ে ফেলবে, আর আগ্রহী হওয়ার মতো পোশাকগুলো সব একসাথে করে দেখাতে থাকবে। এভাবেই আপনি অতি সহজে খুঁজে নিতে পারবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত পোশাকটি।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স করবে গ্রাহকের অনুভূতি মূল্যায়ন; Image Source: Aircall

হাউই কাও নিউ ইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক। একজন ডাটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে তিনি কাজ করছেন যন্ত্র কর্তৃক মানবীয় অনুভূতি শনাক্তকরণের বিষয়টি নিয়ে। তিনি বিশ্বাস করেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এ ধরনের চমকপ্রদ যোগ্যতা অর্জন থেকে আর খুব বেশি দূরে নেই।

কাও বর্তমানে কাজ করছেন একটি মেশিন লার্নিং মডেল নিয়ে, যেটি সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন জ্ঞানার্জন করছে, এবং এক পর্যায়ে হয়তো এমন দক্ষতা অর্জন করে ফেলবে, যা কোনো প্রতিষ্ঠানের সর্বোৎকৃষ্ট কর্মচারী বা কাস্টোমার কেয়ার অফিসারের মধ্যেও নেই। বিষয়টি শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখুন, মানুষের মধ্যে ক্লান্তি-বিরক্তি-অবসাদ প্রভৃতি অনুভূতি থাকে বলে, নিজ কাজে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিটিও অনেক সময় হিসাবে গড়মিল করে ফেলতে পারেন। ফলে তার পারফরম্যান্স পড়ে যেতে পারে। কিন্তু যন্ত্রের যেহেতু তেমন কোনো পিছুটান নেই, তাই তার পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা সব সময়ই বজায় থাকবে।

গ্রাহক পরিষেবায় ঘটবে অভূতপূর্ব অগ্রগতি; Image Source: TechCrunch

কাওয়ের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মডেলটি একসাথে বিভিন্ন ধরনের ভিজ্যুয়াল, অডিও ও ল্যাঙ্গুয়েজ কিউ নিয়ে কাজ করবে। যেমন সেটি বিশ্লেষণ করবে ক্রেতার কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, অঙ্গভঙ্গি এবং শব্দচয়ন, এবং সেখান থেকে সে গভীর পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রত্যেক ক্রেতার মানসিক অবস্থা সম্পর্কিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।

এ জাতীয় উদ্ভাবনে তথ্য-উপাত্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কাও যত বেশি মানুষের আবেগিক ও আচরণিক বৈশিষ্ট্যের নমুনা সংগ্রহ করতে পারবেন, তিনি তার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মেশিন লার্নিংকে তত বেশি সমৃদ্ধ করে তুলতে পারবেন। এভাবে বিপুল পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত একত্র করে যদি তিনি তার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে “শিক্ষিত” করে তুলতে পারেন, তবে সেটি গ্রাহক পরিষেবায় এক অভূতপূর্ব সাফল্য বয়ে আনবে বলেই তার বিশ্বাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here