রোবটিক অ্যাসিস্ট্যান্টের ধারণাটি নেহাত নতুন কিছু নয়। এ ধারণাটির প্রচলন শুরু হয়েছে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী যুগের শুরু থেকেই। প্রায় সকল ঘরানার বিজ্ঞানভিত্তিক কাল্পনিক কাহিনীতে দেখানো হয়েছে এমন সব রোবটকে, যারা প্রত্যক্ষভাবে মানুষের সহযোগী, কিংবা এমনকি ভৃত্য হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

সুতরাং বলাই বাহুল্য, এমন একটা কিছুর আকাঙ্ক্ষা মানুষের মনের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে যুগ যুগ ধরে। আর এ আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার জন্য তারা চেষ্টা-চরিত্রও কম করেনি। বিশেষ করে প্রযুক্তি ফার্মগুলো তো এ ব্যাপারে খুবই আগ্রহী।

রোবটিক্স ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে পারদর্শীদের প্রতিষ্ঠিত স্টার্ট-আপ থেকে শুরু করে প্রযুক্তি জগতের দানব হিসেবে স্বীকৃত এলজি কিংবা স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান, সকলেই চেষ্টা করেছে এমন কিছু একটা সৃষ্টির। কিন্তু এত চেষ্টার পরও, আজো এমন রোবোটিক বাটলারের চিন্তা আকাশ-কুসুম কল্পনাই রয়ে গেছে, যা লাইট অন-অফ করা কিংবা আবহাওয়া বার্তা প্রদানের চেয়ে খুব বেশি কিছু করতে সক্ষম।

তবে এবার দৃশ্যপটে এসেছে এক নতুন দৈত্য। এ খাতে পূর্বের সকল ব্যর্থতাকে ঝেড়ে ফেলে, অ্যামাজন নিয়ে আসতে চাইছে বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য, এমনটিই বলা হয়েছে ব্লুমবার্গের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে।

অ্যামাজনের ভেস্তা; Image Source: Notebook Check

প্রতিবেদনে বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটি “ভেস্তা” কোডনেম বিশিষ্ট একটি রোবট তৈরির কাজ করে চলেছে। আপনার ঘরের কাজে সেটি হতে পারে অ্যামাজন অ্যালেক্সার মোবাইল বা চলমান সংস্করণ। জানা গেছে, এ রোবটের প্রোটোটাইপটি নাকি মানুষের কোমর সমান উঁচু, এবং এটি এর চারপাশে নেভিগেট করবে কম্পিউটার ভিশন কাজে লাগিয়ে। এখনো যদিও অ্যামাজনের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত বা বিবৃতি পাওয়া যায়নি যে ঠিক কবে নাগাদ তারা নতুন এ রোবটের ঘোষণা দেবে বা বাজারে আনবে, তবে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনটি বলছে এ বছরের শেষ নাগাদই নাকি অ্যামাজনের পরিকল্পনা রয়েছে রোবটটিকে সাধারণ মানুষের সামনে নিয়ে আসার।

যেমনটি আগেই বলেছি, যদি সত্যিই অ্যামাজন তাদের হোম রোবটের অভিষেক ঘটায়, তাহলে সেটি হতে চলেছে বেশ কিছু স্টার্ট-আপ কর্তৃক ব্যর্থ প্রয়াসের পর অবশেষে একটি সফলতা

এর মধ্যে একটি ব্যর্থ স্টার্ট-আপের নাম হলো আঙ্কি। কার্নেগি মেলন রোবটিক্স ইনস্টিটিউটের তিনজন অ্যালামনাইয়ের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এ স্টার্ট-আপটি শুরুর দিকে বেশ ভালো জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তাদের স্মার্টফোন নিয়ন্ত্রিত রেস কারের মাধ্যমে। কিন্তু এর বেশিদূর আর এগোতে পারেনি তারা, এবং এ বছরের এপ্রিল মাসে তারা জানিয়েছে পাততাড়ি গোটানোর খবর।

কজমো রোবট; Image Source: Endgadget

একদা সাড়া জাগানো এ স্টার্ট-আপটি এর আগে দুইটি রোবট বিক্রি করেছে, কজমো এবং ভেক্টর। দুইটিকেই দেখে মনে হতো তারা বুঝি কোনো পিক্সার ফিল্ম থেকে উঠে এসেছে। রোবট দুইটির বাস্তবসম্মত মৌখিক অভিব্যক্তি এবং নিজে থেকে পড়া ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশে নেভিগেট করার ক্ষমতা তাদেরকে অন্যান্য সম্ভাব্য বিকল্পের থেকে এগিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে তাদেরকে হার মানতে হয়।

এছাড়াও জিবো ও কুরি নামে দুইটি হোম রোবট নির্মাণ করেছিল মেফিল্ড রোবটিক্স নামক প্রতিষ্ঠানটি, তারাও নিজেদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে গত বছর। অথচ নিজেদের প্রায় মানবসদৃশ আচরণ ও ব্যক্তিত্বের কল্যাণে এ দুইটি রোবটও অনেক মানুষেরই ভালোবাসা অর্জন করেছিল।

রোবটকে মূলধারায় আনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সম্মুখীন কেবল ছোটখাট স্টার্ট-আপই নয়, স্যামসাং, এলজি কিংবা আসুসের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানও হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা সকলেই ঘোষণা দিয়েছিল হোম রোবট বাজারে আনার। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স শো-র মাধ্যমে তারা প্রাথমিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সাদরে গ্রহণ করেনি তাদের নির্মিত হোম রোবটগুলোকে।

ব্যর্থ হয়েছে স্যামসাংয়ের হোম রোবটও; Image Source: TechCrunch

অ্যামাজনে ইতিমধ্যেই ই-কমার্স (অ্যামাজন ডট কম), প্রকাশনা শিল্প (কিন্ডল) এবং স্মার্ট হোম শিল্পে (একো) নিজেদের শক্তিশালী ও অদ্বিতীয় অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তারপরও, হোম রোবট তৈরির মতো একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প তাদের কাছেও প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জ হয়েই ধরা দেবে। আর তার প্রধান কারণ: সাধারণ মানুষ এখনো হোম রোবট ব্যবহারের সেরকম কোনো প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেনি।

হোম রোবটের ইতিপূর্বের ব্যর্থতার পেছনে অন্যতম কারণ হলো, কুরি কিংবা জিবোর মতো রোবটগুলোতে এমন নতুন কোনো ফাংশনালিটি ছিল না, যা ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের বাড়িতে ব্যবহৃত অ্যামাজন একো, গুগল হোম, সিকিউরিটি ক্যামেরা বা স্মার্টফোনে নেই। যেহেতু কম দামেই অন্যান্য সকল পরিষেবাই সাধারণ মানুষ লাভ করতে পারছে, তাই শুধু শুধু শখের বশে মূল্যবান একটি হোম রোবট কিনতে কজনই বা আগ্রহী হবে!

কতটা দামি ছিল আগের হোম রোবটগুলো? একটি সাধারণ উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। আপনি যদি ডট মডেলের একো কিনতে চান, সেজন্য আপনার খরচ হবে মাত্র ৫০ ডলার। অথচ মেফিল্ড রোবটিক্স তাদের কুরির জন্য কত দাম হাঁকাত, জানেন? ৭০০ ডলার! জিবোর দাম তো ছিল আরো বেশি। পুরো ৯০০ ডলার!

ইতিমধ্যেই অ্যামাজনের রয়েছে দারুণ সব স্মার্ট হোম ডিভাইস ও গ্যাজেট; Image Source: Mashable

তাই অ্যামাজনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এটিই সাধারণ মানুষের কাছে প্রমাণ করা যে, আসলেই তাদের প্রয়োজন একটি হোম রোবটের মালিক হওয়া। এবং সেজন্য তারা অন্যান্য স্মার্ট হোম ডিভাইসের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতেও পারে। কিংবা অ্যামাজন তাদের হোম রোবটগুলোর মূল্য নির্ধারণ করতে পারে। তবে তখন আবার নতুন চিন্তার বিষয় হবে এই যে, কম মূল্যে বিক্রি করে অ্যামাজন দিনশেষে লাভের মুখ দেখতে পারবে তো?

অবশ্য ইতিপূর্বে ব্যর্থ হওয়া যেকোনো স্টার্ট-আপ বা বৃহৎ কোম্পানির চেয়ে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানেই রয়েছে অ্যামাজন। তার কারণ, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সকল প্রাযুক্তিক উপাদানই রয়েছে যা হোম রোবট নির্মাণের জন্য আবশ্যক। তাছাড়া তহবিল সংকটও তাদের জন্য একটি অবাস্তব সমস্যা। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, ক্রেতা সাধারণের সাথে তাদের ইতিমধ্যেই শক্ত একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অন্যান্য বিভিন্ন স্মার্ট হোম ডিভাইসের জন্য বেশিরভাগ ক্রেতা তাদের ব্র্যান্ডকেই যেহেতু বেছে নিয়েছে, তাই হোম রোবটের ক্ষেত্রেও তারা অ্যামাজনের ব্র্যান্ড ভ্যালুর উপর আস্থা রাখতেই পারে। আর তা-ই যদি হয়, তাহলে ভেস্তা হোম রোবটের ভাগ্যে হয়তো সাফল্যের গল্পই অপেক্ষা করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here