আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যাদের মোটামুটি ধারণা আছে, তাদের কাছে অ্যালান টুরিং খুবই পরিচিত একটি নাম। কারণ আধুনিক কম্পিউটারের এই অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও গণিতজ্ঞের উদ্ভাবিত টুরিং টেস্টের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স।

যারা জানেন না টুরিং টেস্ট কী, তাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে দিচ্ছি, এটি হলো একটি পরীক্ষা পদ্ধতি, যার সাহায্যে কোনো যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা, চিন্তা করার দক্ষতা প্রভৃতি পরিমাপের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় যে যন্ত্রটি আসলেই মানুষের সমতুল্য বুদ্ধিমান কি না।

অ্যালান টুরিংয়ের ভাস্কর্য; Image Source: Manchester Evening News

১৯৫০ সালে টুরিংয়ের হাত ধরে উদ্ভব ঘটে টুরিং টেস্টের। এ কথা বলাই বাহুল্য যে, নিজের সময়ের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন টুরিং। কম্পিউটিং প্রযুক্তি যখন সবে হাঁটি হাঁটি পা পা করে যাত্রা শুরু করেছে, ঠিক তখনই টুরিংয়ের মাথায় আসে এমন এক প্রশ্ন, যা আগে আর কেউওই চিন্তা করেনি: যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?

সেটি ছিল এমন একটি সময়, যখন কেবল সাধারণ কম্পিউটার তৈরি শুরু হয়েছে। তাছাড়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দযুগলও তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। টুরিংয়ের অকস্মাৎ মৃত্যুর দুই বছর বাদে, ১৯৫৬ সালে জন ম্যাকার্থি প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন শব্দ দুইটি।

কিন্তু তারপরও, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা যাচাই, এবং এর মাধ্যমে যন্ত্রকে আরো বুদ্ধিমান ও কার্যকর করে তুলতে টুরিংয়ের মতো এত বেশি অবদান রাখেননি আর কেউই।

টুরিং ছিলেন একজন দার্শনিকও; Image Source: Twitter

১৯৫০ সালে টুরিং তার “Computing Machinery and Intelligence” গবেষণা প্রবন্ধে টুরিং টেস্টের কথা উল্লেখ করেন। সে সময় উইনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টারে কাজ করছিলেন তিনি। এই টেস্টটি ছিল মূলত ভিক্টোরিয়ান যুগের প্রতিযোগিতা “ইমিটেশন গেম”-এর একটি আধুনিক সংস্করণ।

ইমিটেশন গেমে মোট তিনজন অংশ নিয়ে থাকে। একজন নারী, একজন পুরুষ, এবং একজন প্রশ্নকর্তা। প্রশ্নকর্তার কাজ হলো কে নারী আর কে পুরুষ তা চিহ্নিত করা। সেটি করতে গিয়ে সে বিভিন্ন প্রশ্ন করে, এবং প্রাপ্ত উত্তরগুলোকে বিশ্লেষণ করে। বিষয়টি আরো বেশি রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে এ কারণে যে, পুরুষটি চেষ্টা করে প্রশ্নকর্তাকে বোকা বানানোর, আর নারীটি চেষ্টা করে তাকে সাহায্য করার।

অন্যদিকে টুরিং টেস্টে পুরুষটির জায়গা দখল করে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম। অর্থাৎ পুরুষের মতো সে-ও চেষ্টা করে প্রশ্নকর্তাকে বিভ্রান্ত করার। টুরিংয়ের প্রশ্ন ছিল: একজন নারী ও পুরুষের সাথে খেলাটির সময় প্রশ্নকর্তা যেমন প্রায়ই ভুল করে থাকে, একজন নারী ও কম্পিউটারের সাথে খেলাটির সময়ও কি সে তেমন ভুল করবে?”

টুরিং টেস্ট; Image Source: GeeksforGeeks

সহজ কথায় বলতে গেলে, যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে টুরিং বেছে নিয়েছিলেন অন্যকে বোকা বানানোর দক্ষতাকে। সাধারণভাবে মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য হলো, মানুষ চাইলেই যে কাউকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী বোকা বানাতে পারে, কিন্তু যন্ত্রকে যেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়, সে সেভাবেই আচরণ করে। তাই যন্ত্র যদি পূর্ব-নির্ধারিত প্রোগ্রামের বাইরে গিয়ে, মানুষের মতোই অন্যকে বোকা বানাতে পারে, তাহলে ধরে নেয়া যাবে যে যন্ত্রটি মানুষের সমতুল্য বুদ্ধিমত্তা অর্জন করতে পেরেছে।

এখানে অন্য আরেকটি কথাও জানিয়ে রাখা প্রয়োজন যে, টুরিং টেস্টের আগে টুরিং প্রশ্নকর্তাকে জানতে দিতেন না যে বাকি দুই অংশগ্রহণকারীর একজন কম্পিউটার। কারণ তিনি চাইতেন প্রশ্নকর্তা যেন কোনোভাবেই সচেতন হয়ে না যায়। সাধারণ নারী-পুরুষের সাথে খেলায় সে যেভাবে চিন্তা করে থাকে, এখানেও যেন তার চিন্তার গতি-প্রকৃতি সেরকমই হয়। ধারণাটি ছিল এমন যে, প্রশ্নকর্তা মানুষ ও কম্পিউটারের মধ্যে ফারাক বের করতে না পারা মানে হলো কম্পিউটারটির নিজস্ব চিন্তাশক্তি থাকা।

টুরিং অবশ্য তার এই টেস্টের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেছিলেন। তিনি অনুমান করেছিলেন, ২০০০ সালের মধ্যে গড়ে ৭০ শতাংশেরও কম প্রশ্নকর্তা মিনিট পাঁচেকের প্রশ্নের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশ্নকর্তার জয় হয়েছে।

মানুষের সমান বুদ্ধিমত্তা অর্জনই কম্পিউটারের চূড়ান্ত লক্ষ্য; Image Source: UX Collective

টুরিং টেস্টে যন্ত্রের হার এতটাই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছিল যে, ১৯৯০ সালে নিউ ইয়র্কের ব্যবসায়ী হিউ লোবনার ঘোষণা করেন, কোনো যন্ত্র যদি টুরিং টেস্টে জিততে পারে, তবে তার নির্মাতাকে ১,০০,০০০ ডলার অর্থ পুরস্কার দেয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ এই পুরস্কার জিততে পারেনি।

তবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের টুরিং টেস্ট হারে খুব একটা আশাহত হওয়ার কিছু নেই। কেননা এই একটি টেস্টে হার মানলেও, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে অন্যান্য বিভিন্ন অঙ্গনে। যেমন সেই ১৯৯৭ সালেই ডিপ ব্লু দাবা খেলায় হারিয়ে দিয়েছিল গ্র্যান্ডমাস্টার গ্যারি ক্যাসপারভকে। এছাড়া কুইজ শো জিওপার্ডিতে আইবিএম প্রোগ্রাম ওয়াটসন হারিয়ে দিয়েছে ইতিহাসের সেরা দুই মানব প্রতিদ্বন্দ্বীকে।

সেরা দুই মানব প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে জিওপার্ডি জিতেছে ওয়াটসন; Image Source: CBS News

সবচেয়ে বড় কথা হলো, এখন পর্যন্ত টুরিং টেস্টে পরিষ্কারভাবে জিততে পারার মতো কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রাম আবিষ্কার না হলেও, এই টেস্টের সার্থকতা এখানেই যে এই টেস্টে জেতার উদ্দেশ্যে অনেক প্রোগ্রামারই দিনের পর দিন চেষ্টা চালিয়ে এসেছে উন্নততর প্রোগ্রাম তৈরি করার, আর তা করতে গিয়ে তারা সামগ্রিকভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অঙ্গনকে। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ যতই মুখর হোক না কেন টুরিং টেস্টের সমালোচনায় কিংবা দাবি তুলুক এই টেস্টকে বাতিল ঘোষণা করার, তাতে টুরিং টেস্টের সম্মান এতটুকু ম্লান হবে না।

আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের সবচেয়ে বিশেষায়িত শাখা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স চিরদিন ঋণী হয়ে থাকবে অ্যালান টুরিং ও তার উদ্ভাবিত টেস্টের প্রতি।

টুরিংয়ের ভূমিকায় কাম্বারব্যাচ; Image Source: Netflix

২০১৪ সালে মুক্তি পেয়েছে টুরিংয়ের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত ছবি দ্য ইমিটেশন গেম। সেখানে টুরিংয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here