বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় একটি খাত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এবং যে গতিতে এটি এগিয়ে চলেছে, তাতে এ কথা বললে একদমই অত্যুক্তি হবে না যে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সই শাসন করবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে। এমনকি বর্তমান সময়েও, এত দ্রুত এর পরিবর্তন ঘটছে যে, তার সাথে তাল মিলিয়ে চলাটা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে অনেক ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার জন্যই। আর তাই তারা হন্যে হয়ে খুঁজছেন এমন কোনো উপায়, যার মাধ্যমে সহজেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রকৃতি ও স্বরূপ সম্পর্কে মোটামুটি বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করা যায়।

হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে বর্তমানে অনলাইনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কিত কনটেন্টের অভাব নেই। এই ওয়েবসাইট ঘাঁটলেই আপনি পেয়ে যাবেন দারুণ সব আর্টিকেল, যার মাধ্যমে আপনি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিষয়ে বেশ ভালো দখল লাভ করবেন। এছাড়া গুগলে সার্চ দিলেও আপনার সামনে উপস্থিত হবে এ বিষয়ের অগণিত ফিচার, ভিডিও, অডিও ইত্যাদি। তবে যে যা-ই বলুক না কেন, বইয়ের সাথে কিন্তু অন্য কোনো কিছুরই তুলনা চলে না। মলাটবদ্ধ বইয়ে একটি বিষয়কে পাঠকের সামনে যতটা বিশদে তুলে ধরা হয়, অন্য আর কোনো মাধ্যমই তা পারে না। তাই কোনো বিষয়ে পরিপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করতে চাইলে ব্যবহারিক জ্ঞানের পাশাপাশি আর যে জিনিসটির উপর নির্দ্বিধায় নির্ভর করা যায়, তা হলো বই।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কে জানতেও বইয়ের চেয়ে শ্রেয় বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলো, কোন বইটি পড়লে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কে আপনি সবচেয়ে ভালো জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন? অর্থাৎ এ বিষয়ের শ্রেষ্ঠ বই কোনটি? কিন্তু সমস্যাটা হলো, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্বের নামজাঁদা বিশেষজ্ঞ লেখকরা এত এত বই রচনা করে ফেলেছেন যে, সেগুলোর মধ্য থেকে একক শ্রেষ্ঠ কোনো বইকে আলাদা করা অসম্ভব। তাই সে অসম্ভব চেষ্টা না করে, চলুন আপনাদের সামনে তুলে ধরা যাক এ বিষয়ের সম্ভাব্য সেরা পাঁচটি বইয়ের বৃত্তান্ত।

The Fourth Age: Smart Robots, Conscious Computers, and the Future of Humanity
লেখক: বাইরন রিস
প্রথম প্রকাশ: মে, ২০১৮

দ্য ফোর্থ এজ; Image Source: Amazon

এ বইয়ের মাধ্যমে লেখক মূল যে যুক্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন তা হলো, মানবসভ্যতার উপর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কতটা ব্যাপক প্রভাব থাকবে। তার মতে, এ প্রভাব এক পর্যায়ে এমন মাত্রা লাভ করবে যে, তা মানবসভ্যতার সংজ্ঞাই পাল্টে দেবে।

পটভূমি হিসেবে লেখক এখানে পূর্বের তিনটি যুগের কথা টেনে এনেছেন, যখন প্রযুক্তি মানবসভ্যতাকে নতুন আকৃতি ও প্রকৃতি প্রদান করেছে। তার মতে, মানবসভ্যতার রূপান্তরের চতুর্থ ধাপে থাকবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও রোবটিক্স।

সহজ কথায় বলতে গেলে, এ বই আপনার সামনে তুলে ধরবে কীভাবে মানুষ হিসেবে আমরা আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছি, এবং ভবিষ্যতে মানুষ হিসেবে আমাদের পরিণতি ঠিক কেমন হতে পারে, আর তা মোকাবেলার জন্য আমাদের কী ধরনের পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ আবশ্যক।

Life 3.0: Being Human in the Age of Artificial Intelligence
লেখক: ম্যাক্স টেগমার্ক
প্রথম প্রকাশ: জুলাই, ২০১৮

লাইফ ৩.০; Image Source: Amazon

বারাক ওবামার ২০১৮ সালের সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি। পাশাপাশি এটি বর্ষসেরা বই হিসেবে জায়গা পেয়েছে দ্য টাইমস ও দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, দুইটির তালিকাতেই। এবং বাস্তবিকই, দারুণ প্রশংসিত এ বইটি আসলেই সক্ষম হবে আপনার প্রত্যাশা পূরণে।

এ বইয়ের লেখক পেশায় একজন পদার্থবিদ ও কসমোলজিস্ট। তিনি প্রাণবন্ত ও সাবলীল ভঙ্গিমায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংক্রান্ত কিংবদন্তী ও বাস্তবতার মাঝে শ্রেণীভেদ করেছেন।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লেখক এ বইয়ের মাধ্যমে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জিং বিষয় ও প্রশ্ন উত্থাপন করতে পেরেছেন। যেমন ধরুন, অটোমেশনের মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে কীভাবে আরো সমৃদ্ধ করে তুলতে পারব? আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে কীভাবে আমরা হ্যাকিং বা অন্যান্য ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারব? এ প্রশ্নের উত্তরও তিনি দেয়ার চেষ্টা করেছেন, অথচ একবারও মনে হয়নি পাঠকের সামনে তিনি জ্ঞান জাহিরের চেষ্টা করছেন।

Homo Deus: A Brief History of Tomorrow
লেখক: ইউভাল নোয়াহ হারারি
প্রথম প্রকাশ: মার্চ, ২০১৭

হোমো ডিউস; Image Source: Amazon

এটিকে বলা যেতে পারে লেখকের দুর্দান্ত জনপ্রিয় বই সেপিয়েন্সের সিক্যুয়েল, যেখানে তিনি আলোচনা করেছিলেন ক্রমবিকাশ সম্পর্কে। আর এ বইতে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন, অদূর ভবিষ্যতে মানুষের অবস্থা কী রকম হতে পারে। এক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স হলো ভবিষ্যৎ পৃথিবীর অনেকগুলো দিকের মধ্যে একটি। এছাড়াও তিনি মানুষের আরো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে অমরত্ব লাভের বিষয়টিও।

আপনি যদি সেপিয়েন্স উপভোগ করে থাকেন (কে না করেছে!), তাহলে এ বইটিও আপনার জন্য অবশ্যপাঠ্য, এবং এ বইটিও আপনাকে সমান আনন্দ দিতে সক্ষম। কাঠখোট্টা বিজ্ঞানের সাথে ভাবময় দর্শনের এমন অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ আপনার ভালো লাগতে বাধ্য।

AI Superpowers: China, Silicon Valley And The New World Order
লেখক: কাই ফু লি
প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি, ২০১৯

এআই সুপারপাওয়ার্স; Image Source: Amazon

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আঙ্গিনায় যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাবার মতো সামর্থ্য যে চীন অর্জন করে ফেলেছে, তা এখন একটি ওপেন সিক্রেট। এ বইতেও লেখক সে দাবিটিই আবারো করেছেন, এবং দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তির চমকপ্রদ উন্নয়নের মাধ্যেম এ দুই দানবীয় শক্তি কীভাবে আমাদের কল্পনার চেয়েও দ্রুত গতিতে বিশ্ব, সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে বদলে দিতে চলেছে।

বৈশ্বিক রাজনীতি যদি আপনার পছন্দের বিষয়বস্তু না-ও হয়, তবু হতাশ হবার কোনো কারণ নেই। এ বইয়ে লেখক এতটাই সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গোটা বিষয়টিকে চিত্রায়িত করেছেন যে, আপনি টেরই পাবেন না কখন মূল বিষয়বস্তুর সাথে একীভূত হয়ে গিয়ে আপনিও ভাবতে আরম্ভ করেছেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আসলেই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে না তো!

Human + Machine: Reimagining Work in the Age of AI
লেখক: পল ডফার্টি এবং এইচ জেমস উইলসন
প্রথম প্রকাশ: মার্চ, ২০১৮

হিউম্যান+মেশিন; Image Source: Amazon

এ বইয়ের লেখকদ্বয় তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন, কীভাবে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োগ ঘটে, কিংবা আরো সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে, আধুনিক কোম্পানিগুলো কীভাবে নিজেদের বৃদ্ধি ও নতুন নতুন উদ্ভাবনের জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে কাজে লাগিয়ে চলেছে।

এ বইয়ের মূল চাবিকাঠি হলো এমন ধারণা যে, বাণিজ্যিক কোনো প্রক্রিয়াই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স থেকে অস্পৃশ্য থাকবে না। বাণিজ্যিক সকল ক্ষেত্রেই মানুষ ও বুদ্ধিদীপ্ত যন্ত্রপাতি এখন পূর্বের যেকোনো সময়ের থেকে অধিক ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, এবং কোম্পানিগুলোর কর্মপদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করছে।

সব মিলিয়ে লেখকযুগল এ বইয়ে ছয়টি হাইব্রিড “মানুষ+যন্ত্র” ভূমিকার অবতারণা করেছেন, যেগুলো তারা মনে করেন সব ধরনের বাণিজ্যেই সংস্থাপন আবশ্যক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here