বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মুখপাত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। তাই স্বভাবতই ধরে নেয়া যায়, সবচেয়ে দক্ষ ও মেধাবী মানুষেরাই সুযোগ পাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের স্বপ্নযাত্রায় সামিল হওয়ার। কিন্তু চমকপ্রদ বিষয় হলো, এমন বিশেষ এক শ্রেণীর মানুষ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলোয় প্রাধান্য পাচ্ছে, যা হয়তো অনেকের কল্পনারও বাইরে। কারা তারা? তারা হলো অটিজম আক্রান্ত মানুষ

আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং এলএলপি, ক্রেডিট সুইস গ্রুপ এজি, ডেল টেকনোলজিস, মাইক্রোসফট কর্পোরেশন, ডিএক্সসি টেকনোলজি কর্পোরেশন এবং আরো অনেক শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোই তাদের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রামে চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিচ্ছে অটিজমের শিকার আবেদনকারীদেরকেই। এছাড়া ইওয়াই নামের একটি পেশাদার সার্ভিস ফার্মও ফরচুন ৫০০ তালিকার ডজনখানেক কোম্পানিকে দিয়েছে এমন প্রোগ্রাম চালুর পরামর্শ।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খাতে চাকরিতে দারুণ চাহিদা অটিজম আক্রান্তদের; Image Source: Autism Resource Centre

কিন্তু কেন? আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংশ্লিষ্ট চাকরির ক্ষেত্রে অটিজম আক্রান্তদের এত চাহিদা কেন? এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো: অটিজম আক্রান্ত কর্মীরা সাধারণত তাদের কাজের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ফোকাসড, তারা গভীর বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাশক্তির অধিকারী, এবং আধুনিক প্রযুক্তির নানা উপকরণের উপর রয়েছে তাদের বিশেষ দখল

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে ধৈর্য একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক সময় কর্মীদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই কাজ করে চলতে হয়; যেমন: কম্পিউটার ভিশন সিস্টেমের জন্য ছবি ও ভিডিওতে লেবেলিং। কাজগুলো খুবই সংবেদনশীল, একটু ভুলচুক হলেই বড় ধরনের সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে।

সাধারণ কোনো কর্মীর পক্ষে পুরোটা সময় আগ্রহ জিইয়ে রেখে কাজ করে চলা খুবই দুরূহ হয়ে ওঠে। এদিক থেকে অটিজমের শিকার ব্যক্তিরা ব্যতিক্রম। একটি কাজ শুরুর সময় তাদের মধ্যে যে মনোযোগ ও আগ্রহ দেখা যায়, অনেকক্ষণ একটানা কাজ করার পরও সেই সমান মনোযোগ ও আগ্রহই বিদ্যমান থাকে তাদের মনে। ফলে সংবেদনশীল কাজগুলো নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মুনশিয়ানা দেখাতে পারে তারাই।

আবার অনেক অটিজমের শিকার ব্যক্তির মধ্যেই রয়েছে উচ্চমাত্রার লজিকাল রিজনিং এবং প্যাটার্ন রিকগনিশনের দক্ষতা। তাই তারা অন্যদের চেয়ে অনায়াসেই, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মডেল গঠন ও পরীক্ষা করতে পারে।

যোগ্যতা ও দক্ষতায় অনেকের থেকেই এগিয়ে অটিজম আক্রান্তরা; Image Source: CBS News

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ডাটা সায়েন্স এবং অনুরূপ খাতগুলোতে যোগ্য কর্মীর চাহিদা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কম্পটিয়া নামের একটি টেক ট্রেড গ্রুপ গত জুন মাসে জানিয়েছিল, মে মাসে নাকি তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে চাকরিহীনতার পরিমাণ ১.৩ শতাংশ ছুঁয়েছিল। ২০ বছরের মধ্যে এটিই ছিল এ খাতে সবচেয়ে দৈন্যদশা, যা খুব সহজেই বুঝিয়ে দেয় এসব কাজে দক্ষ কর্মীর ঠিক কতটা অভাব রয়েছে বর্তমান বিশ্বে।

এদিকে, অনেক অটিজমের শিকার প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। ২০১৫ সালে ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের করা এক সমীক্ষায় জানা গিয়েছিল, ৪২ শতাংশ অটিস্টিক শিক্ষার্থী, যারা হাই স্কুলে বিশেষ শিক্ষা লাভ করেছে, তারা হাইস্কুল ত্যাগের ছয় বছরের মধ্যে কোনো বেতনভুক্ত চাকরি লাভ করতে পারেনি।

মার্সিয়া শিনার নিউ ইয়র্কের ইন্টিগ্রেট অটিজম এমপ্লয়মেন্ট অ্যাডভাইজর নামের একটি অলাভজনক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। কোম্পানিটির কাজ হলো অটিজমের শিকার ব্যক্তিদের চাকরির জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রামের আয়োজন করা।

“নির্দিষ্ট কিছু কাজে যেসব চাকরিদাতা খুব দক্ষ, বিশ্লেষণে পটু কর্মীর খোজে রয়েছেন, তাদের জন্য সমাধান হয়ে আসতে পারে অটিস্টিক ব্যক্তিরা,” বলেন শিনার। তিনি আরো হিসাব করে দেখান, বর্তমানে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই অটিজমের শিকার ব্যক্তিদের চাকরি প্রদানের জন্য বিশেষ প্রোগ্রাম চালু করেছে ৪০ থেকে ৫০টি কোম্পানি।

যুক্তরাষ্ট্রে অটিজম আক্রান্তদের চাকরির জন্য রয়েছে বিভিন্ন বিশেষ প্রোগ্রাম; Image Source: Wall Street Journal

শিনার জানান, কোম্পানিগুলো মূলত এ ধরনের প্রোগ্রামের মাধ্যমেই অটিজমের শিকার কর্মীদের বেছে নেয় ও নিয়োগ প্রদান করে। তবে অটিজমের শিকার ব্যক্তিরা যেহেতু সামাজিকভাবে কিছুটা অস্বাভাবিক এবং বিচ্ছিন্ন, তাই তারা যেন কর্মস্থলে মানিয়ে-গুছিয়ে নিতে পারে তা নিশ্চিত করতে কোম্পানিগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

ইওয়াই এবং ডিএক্সসি, একটি তথ্য-প্রযুক্তি বিষয় সার্ভিস ফার্ম, এ ধরনের অটিজমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ইন্টারভিউয়ের আয়োজন করে না, যেহেতু অলিখিত সামাজিক পরিস্থিতিতে তারা খুব একটা ভালো করতে পারে না। তাই এ ধরনের ব্যক্তিদের নিয়োগের প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা ভিন্নতরই হয়। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন, এবং সেখানে যাদের পারফরম্যান্স সবচেয়ে বেশি সন্তোষজনক হিসেবে হয়, তারাই চূড়ান্তভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। এই মূল্যায়নের সময়টুকুতে কাজ করার জন্য ডিএক্সসি প্রার্থীদের আলাদা সম্মানী প্রদান করে, যদিও ইওয়াইয়ের নীতিমালায় এমন কিছুর ব্যবস্থা নেই।

ইওয়াইতে বর্তমানে কাজ করছে প্রায় ৮০ জন অটিজমের শিকার ব্যক্তি, যা এক বছর আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এই ব্যক্তিদের ইতিপূর্বে বিবিধ কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কেউ কাজ করেছে দ্বাররক্ষী হিসেবে, কেউ পিৎজা ডেলিভারার হিসেবে, আবার কেউ কেউ তো আবার উবার ড্রাইভারও ছিল। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতায়ও আবার ব্যাপক ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। কেউ যেখানে হাই স্কুল থেকে ডিপ্লোমা করেই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে, সেখানে কেউ কেউ আবার ডক্টরেটও করেছে।

বর্তমানে এই অটিজমের শিকার কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি নিউরো-ডাইভারসিটি সেন্টার অভ এক্সেলেন্সে কাজ করছে। সেগুলো অবস্থিত শিকাগো, ডালাস, ফিলাডেলফিয়া, স্যান হোসে এবং ন্যাশভিলে।

অটিজম আক্রান্তদের প্রধান দুইটি গুণ তাদের মনোযোগ ও ধৈর্যশক্তি; Image Source: CBS News

ডালাসে রয়েছে ১৪ সদস্যের একটি দল, যাদের মধ্যে আটজনই অটিজমের শিকার। তারা সবাই মিলে গত বছর তৈরি করেছে এমন একটি অ্যালগরিদম, যা ইওয়াই কনসাল্টিং কন্ট্রাক্টের জেনারেশন অটোমেট করতে সক্ষম। ফার্মটির নিউরো-ডাইভারসিটি ইনোভেশন লিডার হিরেন শুকলা জানিয়েছে, উক্ত দলের তৈরি অ্যালগরিদমটি মাসে ২,০০০টি কন্ট্রাক্ট উৎপাদনের মাধ্যমে বছরে ফার্মের ৫ লক্ষ কর্মঘণ্টা বাঁচিয়ে দিয়েছে।

এছাড়া দলটি একটি নিউরাল নেটওয়ার্কও তৈরি করছে, যা ক্লায়েন্টদের সম্ভাব্য কর কর্তনের পরিমাণ নিরূপন করতে পারে। এই আর্টিফিশিয়াল সিস্টেমটি পাঁচ বছরের মেমো, ইমেইল এবং অন্যান্য দলিলের প্রক্রিয়া করে ফেলে মাত্র ১২ মিনিটে।

শুকলা জানান, অটিজমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া “ইওয়াইয়ের ব্যবসায়িক কাঠামোর জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিষয়টিকে দানশীলতা বা সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখি না।” অর্থাৎ তিনি বলতে চান, অটিজমের শিকার ব্যক্তিদের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো জটিল ও কঠিন খাতে কাজ পাওয়া কারো করুণার ফল নয়, বরং তারা নিয়োগ লাভ করছে নিজেদের যোগ্যতার বলেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here