নবজাতক শিশুর বাবা-মায়ের কপালে বড়সড় চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিতে পারে যে জিনিসটি, তা হলো শিশুর কান্না। কখনো কখনো শিশুর কান্না বিরক্তির কারণ হয় বটে, কিন্তু অধিকাংশ সময়েই বিরক্তিকে ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় চিন্তা (পড়ুন দুশ্চিন্তা)।

কেন কাঁদছে শিশু? ওর কি কোনো সমস্যা হচ্ছে? কোথাও ব্যথা পেয়েছে? অস্বস্তি লাগছে? খিদে লেগেছে? ডায়পার ভেজা ভেজা ঠেকছে? বেশি গরম বা শীত লাগছে?

এরকম হাজারটা প্রশ্ন এসে ভর করে নবজাতক শিশুর বাবা-মায়ের মনে। অনেক সময়ই এমন হয় যে, শিশুর সমস্যা হয়েছে একটা অথচ তার বাবা-মা বুঝেছে আরেকটা, এবং সে অনুযায়ী তারা যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তাতেও শিশুর কান্না থামছে না।

বাবা-মায়ের অন্যতম চিন্তার কারণ নবজাতক শিশুর কান্না; Image Source: Firstpost

এতদিন এই সমস্যাটি আক্ষরিক অর্থেই অসমাধানযোগ্য ছিল। কেননা শিশুরা তো আর নিজে থেকে কথা বলতে পারে না। বাবা-মা যদি না চিকিৎসক যদি তার আচরণ বা বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে না পারে তার আসলেই কী হয়েছে, তাহলে বিষয়টি ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে।

তবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন এই আপাত অসম্ভব ব্যাপারটিকেও সম্ভব করে তুলছে। অন্তত তেমনটাই দাবি করছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক। তারা একটি নতুন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যেটি শিশুর স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক কান্না শনাক্ত করতে সক্ষম।

গবেষণা প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে IEEE/CAA Journal of Automatica Sinica (JAS)-এ। সেখানে বলা হয়েছে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পদ্ধতিটি নাকি সার্থকভাবে শনাক্ত ও চিহ্নিত করতে পারে শিশুর কান্নার প্রকৃত কারণ কী। অর্থাৎ শিশুর কি ক্ষুধা পেয়েছে, অসুস্থ বোধ করছে, নাকি তার অন্য কিছু হয়েছে।

নবজাতকের কান্নার অর্থ খুঁজে বের করবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: Parents

এখন অনেকেই দাবি করতে পারেন, এটি আবার কীভাবে সম্ভব! প্রতিটি শিশুই তো আলাদা, এবং তাদের কান্নার ধরন ও কারণেরও রয়েছে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় অবশ্যই তবে। তবে গবেষকদের অভিমত হলো, এসবের পরও প্রতিটি শিশুর কান্নার মাঝেই কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, যেগুলো অভিন্ন কারণ হতে উদ্ভূত হয়। আর সে কারণেই ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও শিশুর কান্না ও তার কারণকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত সাধারণীকরণ করা সম্ভব।

কাজটি সম্ভব করার জন্য গবেষকরা নির্দিষ্ট একটি অ্যালগরিদম ব্যবহার করেছেন, যার মূল ভিত্তি হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অন্যতম প্রধান অবদান হিসেবে স্বীকৃত অটোমেটিক স্পিচ রিকগনিশন। এই অ্যালগরিদমটি নবজাতক শিশুদের বিভিন্ন ধরনের কান্নাকে শনাক্ত করতে পারে, এবং কান্নার পেছনের কারণও চিহ্নিত করতে পারে।

কান্নার ধরন ও কারণ তাদের কাছে এক ধরনের সংকেত। এই সংকেতগুলোকে বিশ্লেষণ ও শ্রেণীবিভাগের জন্য আবার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আরেকটি অবদানকে কাজে লাগানো হয়। সেটই হলো কমপ্রেসড সেন্সিং, যা বিগ ডাটাকে আরো কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণে সাহায্য করে।

কান্নার সংকেত বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হবে কমপ্রেসড সেন্সিং; Image Source: The Bump

এখন অনেকের মনের প্রশ্ন জাগতে পারে, কমপ্রেসড সেন্সিং কী জিনিস। এটি প্রধানত একটি পদ্ধতি, যা কোনো সংকেতকে (এক্ষেত্রে নবজাতকের কান্নার আওয়াজ) স্পার্স ডাটার মাধ্যমে পুনর্গঠন করতে পারে। এই পদ্ধতিটি বিশেষভাবে সহায়ক কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে, যেখানে মূল আওয়াজের প্রেক্ষাপটে আরো নানাবিধ আওয়াজ শোনা যায়।

কমপ্রেসড সেন্সিং ব্যবহারের কারণ হলো, শিশুরা তো আর গবেষণাগারের নীরব পরিবেশে কাঁদবে না। তারা কাঁদবে বাস্তব-জীবনের পরিস্থিতিতে, যেখানে আপনি না চাইলেও প্রেক্ষাপটে অজস্র শব্দ শুনতে পাওয়া যাবে। সুতরাং কান্নার শব্দকে বিশ্লেষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলে কী হবে, সেই কান্নার শব্দকে আর সব শব্দের থেকে পৃথকীকরণের গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়।

এছাড়া গবেষণার জন্য গবেষকরা একটি নতুন ধরনের ক্রাই ল্যাঙ্গুয়েজ রিকগনিশন অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন, যেটি কোলাহলপূর্ণ পরিবেশেও নবজাতকদের স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক উভয় প্রকার কান্নার সংকেতই প্রভেদ করতে, অর্থাৎ তাদের মধ্যকার পার্থক্য শনাক্ত করতে পারে।

তবে অ্যালগরিদমটির বিশেষত্ব হলো, এটি কেবল পূর্ব-নির্ধারিত প্রোগ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং কোনো নির্দিষ্ট নবজাতকের উপর এটি যত বেশি প্রয়োগ করা হয়, ওই নবজাতকের স্বাতন্ত্র্য কান্নার ধরন সে আরো বেশি করে আয়ত্ত করতে পারে। এক পর্যায়ে ওই নবজাতকের কান্নার প্রায় পুরোটাই তার রপ্ত হয়ে যায়, এবং ওই নবজাতকের কান্নায় যত বিশেষত্বই থাকুক না কেন, অ্যালগরিদমটি প্রায় নির্ভুলভাবে তার কান্নার অর্থ বের করতে পারে।

খুব শীঘ্রই হয়তো শুরু হবে নব উদ্ভাবিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সটির বাণিজ্যিক ব্যবহার; Image Source: Mama Natural

এ ব্যাপারে গবেষণা প্রবন্ধটির অন্যতম রচয়িতা লিচাউন লিউ বলেন, “একটি বিশেষ ভাষার মতো, বিভিন্ন ধরনের কান্নার শব্দের সাথেও নানাবিধ স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট তথ্য মিশে থাকে। বিভিন্ন ধরনের কান্নার শব্দের পার্থক্য মূলত ওইসব স্বাস্থ্যগত তথ্যই বহন করে।”

“বিভিন্ন ধরনের কান্নার সংকেত এই পার্থক্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। তথ্যগুলো শনাক্ত ও চিহ্নিত করার জন্য, আমাদেরকে বিশেষ বিশেষ ফিচারগুলোর নির্যাস বের করে আনতে হবে, এবং সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। আমাদের এই উদ্ভাবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, এবং তাদের বাবা-মা কিংবা কেয়ারগিভারদের উপর থেকে চাপ কমিয়ে আনা।”

বলাই বাহুল্য, উদ্ভাবনটি গবেষণার পর্যায়েই রয়েছে, এবং এর প্রায়োগিক ক্ষেত্রসমূহ বের করা এখনো বাকি। তবে আমরা আশা করতেই পারি, খুব শীঘ্রই হয়তো এই গবেষণার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কৃত হবে, পাশাপাশি স্মার্টফোনের উপযোগী অ্যাপ্লিকেশনও তৈরি করা হবে। আর এভাবেই অদূর ভবিষ্যতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কল্যাণে শিশুর স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়টি কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here