আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কথা শুনতে শুনতে অনেকের মনেই হয়তো আফসোস হয়, “ইস, আমার কাছেও যদি এমন কোনো যন্ত্র থাকত!” এরকম যাদের মনে হয়, তাদের জন্যই এই লেখা।

এই মুহূর্তে যিনি এই লেখাটি পড়ছেন, ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা আপনি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন একটি স্মার্টফোনকে। এবং মজার ব্যাপার হলো, আপনার হাতের স্মার্টফোনটিতেই রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপস্থিতি।

চলুন, জেনে নিই আপনার হাতের স্মার্টফোনটিতে কী কী ধরনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

ডেডিকেটেড হার্ডওয়্যার

আজকালকার অনেক নতুন স্মার্টফোনেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সুবিধা সমৃদ্ধ বিশেষ কিছু হার্ডওয়্যার অপটিমাইজ করা হয়েছে। ছোট ছোট এসব চিপকে সাধারণত নিউরাল ইঞ্জিন বা নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট বলা হয়ে থাকে।

আইফোন এক্স-এ রয়েছে অ্যাপলের নিজস্ব নিউরাল ইঞ্জিন; Image Source: TechRadar

এসব চিপের কাজ হলো মোবাইলের স্ক্রিনে দ্রুতবেগে ভাসতে থাকা ইমেজ ডাটাগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করা। ইতিপূর্বে এই প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সাধারণ চিপ ব্যবহৃত হতো, যাতে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি ব্যান্ডউইথ ও শক্তির প্রয়োজন পড়ত। হুয়াওয়ে ও অ্যাপল তাদের নতুন মডেলের স্মার্টফোনে এ ধরনের প্রসেসর ব্যবহার করেছে।

ক্যামেরা সিন ও অবজেক্ট রিকগনিশন

এক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে হুয়াওয়ে। তারাই প্রথম তাদের মেট ১০ মডেলের মোবাইলে এই পরিষেবাগুলো এনেছে। এজন্য তারা ব্যবহার করেছে কিরিন ৯৭০ চিপসেট, যার মাধ্যমে প্রথম হুয়াওয়ের নিজস্ব নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট প্রকাশ্যে আসে।

হুয়াওয়ে মেট ১০-এ কাছে অবজেক্ট রিকগনিশন; Image Source: Gizmodo Australia

ক্যামেরা অ্যাপ্লিকেশনের অন্তর্গত সিন রিকগনিশন ফিচারটি পুরোপুরি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অবদান। মেট ১০ মডেলটি ১৩টি ভিন্ন ভিন্ন সিন টাইপ শনাক্ত করতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে কুকুর বা বিড়ালের ছবি, সূর্যোদয়ের ছবি, কোনো টেক্সট সম্বলিত ছবি, নীল আকাশের ছবি, তুষারপাতের দৃশ্য ইত্যাদি।

নাইট শুটিং

হুয়াওয়ে তাদের পি২০ প্রো মডেলের স্মার্টফোনে বিশেষ এই ফিচারটি এনেছে। এছাড়া অ্যাপলও তাদের স্মার্টফোনের নিউরাল ইঞ্জিনের ভিতর একটি বাড়তি লেয়ারের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির ব্যবস্থা করেছে।

হুয়াওয়ে পি ১০ প্রোতে আছে নাইট শুটিং মোড; Image Source: Vulcan Post

এই নাইট শুটিং মোডের সুবিধা হলো, কোনো ট্রাইপড ব্যবহার না করেও আপনি দীর্ঘসময় মোবাইল হাতে ধরে রেখে শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ইফেক্ট নির্ধারণ করতে পারবেন, এবং নিজের পছন্দসই ছবি তুলতে পারবেন। কোনো কারণে আপনার হাত বা সমগ্র শরীর নড়ে গেলেও, তাতে ছবির গুণগতমানে কোনো প্রভাব পড়বে না।

তবে এ ধরনের ফিচারের সমস্যা হলো, একটি ছবি তোলা সম্পন্ন হতে ৫-৬ সেকেন্ড সময় লাগে। শুনতে সময়টি নেহাতই কম মনে হতে পারে, কিন্তু আপনি যখন একনাগাড়ে অনেকগুলো ছবি তুলতে চাইবেন, তখন প্রতিটি ছবি তোলা শেষ হওয়া ও সেভ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় আপনার ধৈর্যের চরম পরীক্ষা নিতে শুরু করবে।

গুগলের সুপার রেস জুম

গুগলের বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে হরেক রকমের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে কাজ হয়ে থাকে। সবগুলোই যে তারা তাদের উৎপাদিত স্মার্টফোনে প্রয়োগ করে, তা হয়তো নয়। তবে গুগল পিক্সেল ৩ এক্সএল মডেলটিতে ব্যবহৃত হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের উদ্ভাবিত অন্যতম সেরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সটি।

সুপার রেস জুম; Image Source: TNW

এ ফোনের পিছনে কেবল একটি ক্যামেরাই রয়েছে, কিন্তু সেটি এমন একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে, যার মাধ্যমে জুম করে তোলা ছবি থেকেও ২x ক্যামেরায় তোলা ছবির সমমানের গুণাগুণ লাভ করা যায়। এটিরই তারা নাম দিয়েছে সুপার রেস জুম।

স্মার্ট সেলফি ব্লার

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের একটি বড় গুণ হলো, তারা কোনো ব্যক্তির মুখ ও পারিপার্শ্বিক অন্যান্য বস্তুর মধ্যকার পার্থক্য শনাক্ত করতে পারে। আর এই গুণটিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে স্মার্ট সেলফি ব্লার।

ব্লার করে দেয়া যায় ব্যাকগ্রাউন্ড; Image Source: YouTube

খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, আজকাল অনেক মোবাইলের ক্যামেরাতেই এই মোডটি থাকে, যার মাধ্যমে সেলফি তোলার সময় পিছনের দৃশ্যগুলো সব ঝাপসা করে দেয়া হয়, যাতে করে আপনার মুখটিই সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট ও পরিষ্কার দেখায়। ক্যামেরার যাবতীয় ফোকাস শুধু আপনার মুখের উপর থাকায়, আপনার মুখটিকেও অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি সুন্দর মনে হয়।

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট, সিরি ও অ্যালেক্সা

স্মার্টফোনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সেরা দৃষ্টান্ত হলো গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও অ্যামাজন অ্যালেক্সা। এ দুইটি মূলত ভয়েস-ড্রিভেন সার্ভিস, অর্থাৎ আপনি মুখে আপনার স্মার্টফোনটিকে কোনো নির্দেশ দিলে, এই দুইটি ফিচার তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করবে। অ্যাপলেরও রয়েছে অনুরূপ একটি ফিচার, যার নাম তারা দিয়েছে সিরি।

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট; Image Source: Tech Crunch

এই ফিচারগুলোর মাধ্যমে আপনি স্মার্টফোনে বিশেষ কোনো প্রোগ্রাম চালু করা থেকে শুরু করে গান চালানো বা বন্ধ করা, ইন্টারনেটে কোনোকিছু সার্চ দেয়া, মুখে মুখে বলে কোনো মেইল রচনা করা, কোনো মেইল বা সংবাদ পড়ার বদলে অডিও মোডে সেগুলো শোনা, মোটামুটি সম্ভাব্য সবকিছুই করতে পারবেন।

গুগল ডুপ্লেক্স

গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টেরই একটি উচ্চতর ফিচার এটি। অতি চমকপ্রদ এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফিচারটির মাধ্যমে আপনি আপনার স্মার্টফোনটিকে দিয়ে অন্যদেরকে কল করাতে পারবেন। শুধু তা-ই না। এটি আপনার হয়ে অন্যদের সাথে কথাও বলে দেবে।

ব্যবহারকারীর হয়ে নিজেই ফোনে কথা বলে গুগল ডুপ্লেক্স; Image Source: Digital Trends

এই ফিচারটির মাধ্যমে হয়তো কারো সাথে খুব অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা সম্ভব নয়। তবে এর মাধ্যমে কোনো রেস্টুরেন্টে টেবিল বুক করা, কোনো ফুড ডেলিভারি সার্ভিসে খাবার অর্ডার করা, কোনো রাইড শেয়ারিং থেকে রাইড বুক করা ইত্যাদি কাজগুলো খুব সহজেই আপনি আপনার স্মার্টফোনটিকে দিয়েই করিয়ে নিতে পারবেন।

মজার ব্যাপার হলো, ডুপ্লেক্সের কথা বলার ভঙ্গি কিন্তু মোটেই যান্ত্রিক নয়। কথা বলার সময় সে যথানিয়মে বিরতি নেয়, নিঃশ্বাস নেয়ার ভান করে, এমনকি ‘আম’, ‘উম’ জাতীয় শব্দগুলোও করে, যার ফলে অপর প্রান্তের মানুষটির পক্ষে বোঝা দুঃসাধ্য হয়ে যায় যে সে কোনো যন্ত্রের সাথে, নাকি আসল মানুষের সাথেই কথা বলছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here