উদ্যোক্তাদের কাছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কবে থেকে একটি আগ্রহোদ্দীপক বিষয়? তা-ও প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তারপরও, এখনো প্রায় সময়ই মনে হয় আমরা যেন প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিকস ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে ব্যবসায়িক উন্নতির একদম প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছি।

এ কথা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য মার্কেটিং ও সেলস খাতের জন্য। ফরেস্টারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পেছনে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা ৫০ শতাংশের বেশি মার্কেটিং ও সেলসে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু আমরা যদি আরেকটু গভীরভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করি তবে দেখতে পাব, যেসব বিনিয়োগকারীরা বেশ বড় ধরনের অঙ্ক ঢেলেছেন বিভিন্ন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রকল্পের পেছনে, তাদের মাত্র ৪৫ শতাংশ কোনো ফলাফলের দেখা পেয়েছেন।

আর যারা ফলাফলের দেখা পেয়েছেন, তাদের মধ্যেও মাত্র ২৫ শতাংশ মনে করেন যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় তাদেরকে আগের চেয়ে প্রভাবশালী বা কার্যকরী করে তুলতে পেরেছে।

মার্কেটিংয়ে কীভাবে অবদান রাখছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স? Image Source: Firebrand Talent

এসব পরিসংখ্যান আমাদের মনে মোটেই আশা সঞ্চার করে না। বরং যে চিত্রটি আমাদের সামনে তুলে ধরে তা বড্ড হতাশা জাগানিয়া: অধিকাংশ মার্কেটিং ও সেলস টিমই এখনো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের উপযোগী করে নিজেদের গড়ে তুলতে পারেনি। সহজ কথায়, তারা এখনো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার ও তা থেকে লাভ বের করে আনার জন্য প্রস্তুতই নয়।

কিন্তু আসলেই কি মার্কেটিং ও সেলসে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না? ঢালাওভাবে সে দাবি করাটা হবে খুবই ভুল। কেননা ২১ শতকে অন্তত কিছু কোম্পানি অবশ্যই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে।

চলুন দেখা যাক, কোন তিন উপায়ে সেসব কোম্পানি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছে।

ফলাফল অনুমানের মাধ্যমে সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধি

মার্কেটিং প্রকৃতিগতভাবেই খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও ডাটা নির্ভর একটি খাত, বিশেষ করে এন্টারপ্রাইজ লেভেলে। যেকোনো বৈশ্বিক, ক্রস চ্যানেল মার্কেটিং অতি বেশি মাত্রায় নির্ভর করে বিশ্বাসযোগ্য ডাটা ইনপুটের মাধ্যমে, যেগুলো তৈরি করা হয় মোট চাহিদা, উৎপাদন ও বিক্রির পরিমাণের সমন্বয়ে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পরিচালিত প্রভাবশালী একটি মার্কেটিং ইঞ্জিনের দৃষ্টান্ত হলো সেঞ্চুরি লিঙ্ক, যারা বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবসায়ে ক্লাউড ও সিকিউরিটি সলিউশন সরবরাহ করে থাকে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার শুরুর আগে সেঞ্চুরি লিঙ্কের সব সময়ই থাকত ১,৬০০ মানুষের একটি সেলস টিম, যারা যাবতীয় হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ করত, অথচ এর পরও তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতো।

অ্যাঞ্জি; Image Source: Hospitality Net

এদিকে অ্যাঞ্জি হলো একটি কনভার্সিকা ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট। একে নিয়ে আসা হয়েছিল খুবই সাধারণ একটি কাজ করার জন্য: হাজার হাজার “লিড” খুঁজে বের করা, তাদেরকে ইমেইল পাঠানো, এবং খুঁজে বের করা যে কোন লিডগুলো সম্ভাবনাময়, আর কোনগুলো নয়। তার কাজ ছিল কোনো সম্ভাবনাময় লিড খুঁজে বের করতে পারলে, সেটির ব্যাপারে কোনো মানুষ সেলসপার্সনকে অবগত করা।

শেষ পর্যন্ত যা দেখা গেছে তা হলো, অ্যাঞ্জি তার কাজটি খুবই সুনিপুণভাবে করতে সক্ষম হয়েছে। সে কেবল প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৪০টি করে নতুন লিডের সন্ধানই দেয়নি, পাশাপাশি সে ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া মোট ইমেইলের ৯৯ শতাংশ বুঝতেও পেরেছে। যে ১ শতাংশ ইমেইলের অর্থ সে উদ্ঘাটন করতে পারেনি, সেগুলো সে কোনো মানুষ ম্যানেজারের কাছে ফরওয়ার্ড করে দিয়েছে।

এভাবে সেঞ্চুরি লিঙ্ক অ্যাঞ্জির পেছনে ব্যয়কৃত প্রতি ১ ডলারের বিনিময়ে আয় করতে পেরেছে ২০ ডলার করে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে তার রিটার্ন অব ইনভেস্টমেন্ট পুরো ১৯০০ শতাংশ!

পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান ও সমস্যার সমাধান

আরেকটি বৃহৎ খাতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এন্টারপ্রাইজ মার্কেটিং ও সেলস টিমগুলোকে সাহায্য করে চলেছে, আর সেটি হলো কাস্টোমার জার্নি ও কাস্টোমার সাপোর্টের মাধ্যমে, যেটি মার্কেটিং ও সেলসের জীবনচক্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় প্রিন্টিং জগতের মুকুটবিহীন সম্রাট এপসন আমেরিকার কথা। একটা পর্যায়ে তারা লিড নিয়ে বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। তারা বুঝতে পারছিল না কীভাবে বিষয়টিকে আর সামলাতে পারবে। সেঞ্চুরি লিঙ্ক যেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে লিড খোঁজার কাজ চালাচ্ছে, এপসনের কিন্তু তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। কেননা বছরে তারা গড়ে ৫০,০০০ লিড তো পায়ই।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্য নিচ্ছে এপসনও; Image Source: Epson

সেলসফোর্সের মতে, ছয় থেকে আটবারের প্রচেষ্টায় একটি লিডকে একজন ক্রেতায় পরিণত করা যায়। সাধারণত এই প্রচেষ্টার দায়িত্ব প্রদান করা হয় কোনো মানুষ সেলস প্রতিনিধিকে। কিন্তু একজন সেলস প্রতিনিধির পক্ষে তো এত লিডের সাথে মিথস্ক্রিয়া সম্ভব নয়। তাই এপসন যেটি করেছিল তা হলো, লিডদের সাথে মিথস্ক্রিয়ার জন্য একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে এসেছে, যার ফলে চাপ কমে গিয়েছে মানুষ সেলস প্রতিনিধির উপর থেকে।

তাছাড়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে এপসনের সাফল্যের হারও কিন্তু বেড়ে গিয়েছে। আগে যেখানে প্রতি ১০০টি লিড থেকে মাত্র ২০টি প্রত্যুত্তর পেত তারা, সেখানে কনভার্সিকাকে নিয়োগের পর থেকে তারা প্রতি ১০০টি লিড থেকে প্রত্যুত্তর পাচ্ছে ৫১টি করে, অর্থাৎ পুরো ২৪০ শতাংশ বৃদ্ধি। তাছাড়া কোয়ালিফাইড লিডের পরিমাণও বেড়েছে ৭৫ শতাংশ।

এভাবে শুধু প্রথম ৯০ দিনেই এপসনের অতিরিক্ত লাভ হয়েছে ২ মিলিয়ন ডলার।

নিষ্পত্তিযোগ্য কনটেন্ট নির্মাণ, এমনকি বিজ্ঞাপন

সম্ভবত এটিই এন্টারপ্রাইজ লেভেলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের সবচেয়ে বিস্ময়কর সুবিধা। আজকাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে মানবসদৃশ লেখনী ও কনটেন্ট উদ্ভাবনও সম্ভব হচ্ছে! গবেষকরা বেশ কয়েক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন কম্পিউটারকে মানুষের মতো করে লেখা শেখাতে, এবং মাত্র কয়েক বছর হলো তারা এ কাজে সাফল্যের দেখা পেয়েছেন। ইতিমধ্যেই কনটেন্ট সৃষ্টি ও উদ্ভাবনে কিছু কিছু কম্পিউটার নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে ফেলেছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন লেখার মতো সৃষ্টিশীল কাজও করছে; Image Source: Medium

প্রকাশনা জগতে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য হারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স লেখকের আগমন ঘটছে। যেমন ফোর্বসের মতো প্রতিষ্ঠানও এখন পরিকল্পনা করছে কোনো লেখা ড্রাফট করার জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্য নেয়ার। এছাড়া নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং রয়টার্সও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে রিয়েল টাইম বাণিজ্য সংবাদ ও খেলাধুলার ধারাবিবরণী দিচ্ছে। এসব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের নাম তারা দিয়েছে “রোবট রিপোর্টার্স”। এদিকে ওপেন এআই নামের একটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা নাকি এমন একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স লেখক সৃষ্টি করেছে, যা প্রকাশ্যে মুক্তি দিলে ঘোর বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে।

ওয়াটসন অ্যাড; Image Source: Media Village

এছাড়া বিজ্ঞাপনী জগতেও দেখা মিলছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের। টয়োটা সম্প্রতি আইবিএম ওয়াটসনের মেশিন লার্নিংকে কাজে লাগিয়ে তাদের আরএভভি ৪ মডেলের জন্য একটি বিজ্ঞাপনী প্রচারণার নকশা তৈরি করেছে। অ্যাড এজের মতে, টয়োটা নাকি আইবিএম ওয়াটসনকে ১,০০০টি বিজ্ঞাপনী ধারণার একটি তালিকা দিয়েছে, যেটি বিশ্লেষণের মাধ্যমে আইবিএম ওয়াটসন একদম নতুন ও স্বতন্ত্র বিজ্ঞাপনী স্ক্রিপ্ট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here