এই মুহূর্তে মানসিক স্বাস্থ্যের এক চরম সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ১৫.৫ শতাংশই কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত, এবং এ সংখ্যা ক্রমশই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। যদিও অসংখ্য মানুষের সঠিক সময় সুচিকিৎসার প্রয়োজন, কিন্তু অন্তত ৫০ শতাংশ মানসিক অসুস্থতাই পড়ে থাকছে বিনা চিকিৎসায়।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশেও মানসিক অসুস্থতা একটি ভয়াবহ সমস্যা। সেখানে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজনই এ সমস্যার শিকার। সেখানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে মারা যায়। কিন্তু আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এমন মানুষের সংখ্যা কিন্তু ঢের বেশি। প্রতি একজন মানুষের মৃত্যুর বিপরীতে ২০ জন করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকে!

মানসিক সমস্যায় ভুগছে বিশ্বের ১৫.৫ শতাংশ মানুষ; Image Source: BBC

মানসিক অসুস্থতা ও মৃত্যুর মধ্যে এত গভীর সম্পর্ক কেন? তা জানতে চাইলে আমাদেরকেও গোটা বিষয়টির আরেকটু গভীরে প্রবেশ করতে হবে। বিশ্বব্যাপী যে পরিমাণ মানুষ মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে, তাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে মনোবিদ বা মনোচিকিৎসক রয়েছে কি? নেই। এটিই প্রথম ও সবচেয়ে বড় সমস্যা, যে কারণে সিংহভাগ মানুষই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া দ্বিতীয় কারণ হলো মানসিক অসুস্থতার বিষয়ে আমাদের সমাজের ট্যাবু। মানসিক অসুস্থতা থাকলেই ধরে নেয়া হয় যে মানুষটি বুঝি পাগল বা বদ্ধ উন্মাদ। কেউই যেচে পড়ে নিজের নামে এমন তকমা সাঁটাতে রাজি নয়, যে কারণে অধিকাংশ মানুষই নিজে থেকে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না। ফলে একা একা কষ্ট পেয়ে এক পর্যায় যখন পরিস্থিতি নিজেদের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন তারা এক প্রকার বাধ্য হয় আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্ত গ্রহণে।

কিন্তু কেমন হতো, যদি মানসিক অসুস্থতার কারণে সরাসরি মনোচিকিৎসকের কাছে যাওয়া লাগত না, বরং সার্বক্ষণিকভাবে সেরকম একজন আপনার সাথে সাথে থাকত, এবং যখনই আপনি মানসিকভাবে খারাপ অনুভব করতেন তখনই সে আপনাকে শান্ত করতে কাজে লেগে পড়ত? এমনটি কিন্তু অবাস্তব নয়। স্মার্টফোনগুলোর জন্য এমন শত শত মেডিটেশন অ্যাপ রয়েছে। এসব অ্যাপের মাধ্যমে অনেক মানুষের সুফল পাওয়ার নজিরও কিন্তু রয়েছে।

মেডিটেশনের জন্য রয়েছে বিভিন্ন অ্যাপস; Image Source: Sun Basket

তবে এ ধরনের মেডিটেশন অ্যাপের একটি বড় সমস্যা হলো, এরা একদমই যান্ত্রিক ও স্বয়ংক্রিয়। একজন মনোচিকিৎসক তার মানবীয় অনুভূতি শক্তি এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে যেভাবে আপনার সমস্যা বুঝতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, একটি স্বয়ংক্রিয় অ্যাপের মাধ্যমে তো আর সেটি সম্ভব নয়।

তবে সম্প্রতি এ জাতীয় সমস্যারও সমাধানের চেষ্টা চলছে। আর সেই সমাধানে ব্যবহৃত হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। গবেষকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন খুঁজে বের করতে যে কীভাবে নানা উপায়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে কাজে লাগিয়ে স্ক্রিনিং থেকে শুরু করে মানসিক রোগ নির্ণয় এবং তার সম্ভাব্য চিকিৎসা – সব কিছুই করা সম্ভব হয়।

মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের দৃষ্টান্ত

ওয়ার্ল্ড ওয়েল বিয়িং প্রজেক্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে বিশ্লেষণের চেষ্টা চালিয়েছেন। তারা চেষ্টা করেছেন এটি দেখার যে বিভিন্ন ব্যবহারকারীর প্রয়োগকৃত শব্দ বা বাক্যের মাধ্যমে তাদের ডিপ্রেশন শনাক্ত করা যায় কি না। এবং ফলাফলে দেখা গেছে, যেসব মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগে, তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশের সময় কিছু নির্দিষ্ট শব্দ তুলনামূলক বেশি ব্যবহার করে। এসব শব্দের মধ্যে রয়েছে “অনুভূতি”, “আমি”, “আমাকে”, “একা” ইত্যাদি।

ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তির সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্যাটাসে থাকে এসব শব্দের আধিক্য; Image Source: Fast Company

প্রাথমিকভাবে গবেষক দলটির এ উদ্ভাবন প্রকাশিত হয় প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের জার্নালে। কিন্তু পরবর্তীতে তারা তাদের গবেষণা নিয়ে আরো এগিয়ে যায়। অনুপ্রতি সাপেক্ষে অন্তত অর্ধ মিলিয়ন ফেসবুক পোস্ট তারা বিশ্লেষণ করে, এবং ওইসব পোস্টদাতার মেডিকেল রেকর্ডও তারা খতিয়ে দেখে। এর মাধ্যমে তারা ডিপ্রেশন আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিজেকে প্রকাশের আরো সূক্ষ্ম কিছু শাব্দিক চিহ্ন তারা খুঁজে বের করে। তারা বিশ্লেষণ করে আরো খুঁজে বের করে, প্রাথমিকভাবে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসকের দ্বারস্থ হওয়ার আগে কী ধরনের শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করত।

এসব গবেষণা ফলাফলের মাধ্যমে তারা এখন কাজ করছে এমন একটি উচ্চতর দক্ষতামূলক সিস্টেম বা অ্যাপ তৈরি করার, যার মাধ্যমে সম্ভব হবে একজন ব্যক্তির কথা বলার ধরন, শব্দের ব্যবহার ও নিজেকে প্রকাশের ভঙ্গি থেকেই তার ডিপ্রেশন শনাক্ত করা, এবং সে অনুযায়ী তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া।

এসব গবেষণার বাইরেও, বিভিন্ন কোম্পানি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে সামাল দেয়ার জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে আসছে। যেমন কোয়ার্টেট নামক একটি প্রতিষ্ঠান মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তদের সুস্থ করে তোলার জন্য কম্পিউটারাইজড কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপির ব্যবস্থা করেছে। আবার জিঞ্জারের অবদান হলো একটি চ্যাট অ্যাপ্লিকেশন, যেটি সেখানে কর্মরতরা ব্যবহার করে আসছে। এই অ্যাপ্লিকেশনটি ওইসব কর্মচারীদের সরাসরি কাউন্সেলিং করে।

এই অ্যাপ্লিকেশনে রয়েছে এমন একটি অ্যালগরিদম, যা কোনো ব্যক্তির ব্যবহৃত শব্দসমূহকে বিশ্লেষণ করে, এবং তারপর সেটি নির্ভর করে ২ মিলিয়ন আচরণিক বৈশিষ্ট্য সংবলিত ডাটা স্যাম্পল, ৪৫ মিলিয়ন চ্যাট মেসেজ এবং ২ মিলিয়ন ক্লিনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট। এগুলোর মাধ্যমে অ্যাপ্লিকেশনটি প্রতিটি ব্যক্তিকে তার জন্য উপযুক্ত নানা রিকমেন্ডেশন দিয়ে থাকে।

কম্প্যানিয়ন এমএক্স সিস্টেমের অ্যাপের কাছে নিজে থেকেই খুলে বলা যায় মনের কথা; Image Source: Fast Company

আবার কম্প্যানিয়ন এমএক্স সিস্টেমের রয়েছে এমন একটি অ্যাপ্লিকেশন, যা ডিপ্রেশন, বাইপোলার ডিজঅর্ডারসহ অন্যান্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে তারা প্রতিটি ব্যবহারকারীর জন্য একটি অডিও লগের ব্যবস্থা করে, যেখানে তারা নির্দ্বিধায় নিজেদের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করতে পারে। এরপর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমটি ওই রেকর্ডিংটি বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করে তার ব্যবহারে কী কী পরিবর্তন এসেছে, এবং সেসব পরিবর্তন তার মানসিক স্বাস্থ্যকে কীভাবে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।

এদিকে বার্ক নামে রয়েছে আরেকটি প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ফোন ট্র্যাকার অ্যাপ্লিকেশন। এটি নজর রাখে কোনো শিশুর মেসেজিং ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট ও কমেন্টসমূহের উপর, এবং কয়েকটি বিষয় বোঝার চেষ্টাও করে: সে সাইবারবুলিংয়ের শিকার হচ্ছে কি না, সে ডিপ্রেশনে ভুগছে কি না, তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে কি না, এবং সে কারো সাথে সেক্সটিং করছে কি না, বা অন্য কেউ তাকে কোনো অশ্লীল বার্তা, ছবি বা ভিডিও পাঠাচ্ছে কি না।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে মানসিক সমস্যা সমাধানের চার উপকারিতা

মনোচিকিৎসকদের সাহায্য: অন্যান্য আরো অনেক ক্ষেত্রের মতো, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সাহায্য করতে পারে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা পেশাদারদেরও, তাদের নিজেদের কাজটি ঠিকভাবে করার ক্ষেত্রে। অ্যালগরিদমের পক্ষে সম্ভব মানুষের তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে কোনো ডাটা বিশ্লেষণ করা। আর তাই সে খুব সহজেই কোনো ব্যক্তির সম্ভাব্য রোগ শনাক্ত করা থেকে শুরু করে সেটির চিকিৎসার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া একজন রোগীর উন্নতি মনিটরিংয়েও সাহায্য করতে পারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এভাবে একজন মনোচিকিৎসকের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে।

২৪/৭ সুবিধা: যেমনটি আগেই বলেছি, প্রয়োজনের তুলনায় বিশ্বব্যাপী মনোচিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম। তাই একজন ভালো মনোচিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে অনেক সময় মাসখানেক সময়ও লেফে যেতে পারে। কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে সৃষ্ট অ্যাপ্লিকেশন, সফটওয়্যার বা সিস্টেমগুলো কিন্তু আপনাকে এত সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখবে না। আপনার যখনই প্রয়োজন হবে, আপনি এগুলোকে ব্যবহার করতে পারবেন।

আপনার মন ভালো করতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে পাশে পাবেন সব সময়; Image Source: Columbia University Mailman School of Public Health

সাশ্রয়ী: মনোচিকিৎসকদের কাছে সাধারণ মানুষের যেতে না চাওয়ার আরেকটি কারণ হলো অতিরিক্র ফি, যা গড়পড়তা আয়ের মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। অথচ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাপ্লিকেশনগুলো কিন্তু প্রাথমিকভাবে বিনামূল্যেই পাওয়া যায়। এবং পেইড সংস্করণগুলোও কিন্তু খুব একটা ব্যয়বহুল নয়।

বটের সাথে কথা বলায় স্বাচ্ছন্দ্য: বটের সাথে কথা বলাটা শুরুতে অনেকের কাছেই আজব লাগতে পারে। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখুন। এমন অনেক কথা আছে, যা হয়তো আপনি খুব সহজে একজন মানুষের সামনে বলতে পারবেন না, কিন্তু সেগুলোও খুব সহজেই আপনি উচ্চারণ করতে পারবেন একটি বটের সামনে। এটি কিন্তু খুবই জরুরি। কাউন্সেলরকে নিজের ব্যাপারে সবটা না বলতে পারার কারণে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু বটকে যদি আপনি একবার মন খুলে নিজের ব্যাপারে সবকিছু বলতে পারেন, তাহলে আপনার সমস্যা সমাধানের পথ অনেকটাই প্রশস্ত হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here