অটোমেটেড আই স্ক্যান থেকে শুরু করে নবজাতক শিশুর কান্নার বিশ্লেষণ, কিংবা দ্রুততর ঔষধ উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই উন্নতির ছাপ ফেলে চলেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। কিন্তু তারপরও, কিছু চ্যালেঞ্জ কিন্তু রয়েই যায়।

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর গুড নামক একটি বৈশ্বিক সম্মেলন। সেখানে অংশগ্রহণকারী গবেষক ও বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন কীভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে নতুন নতুন সব ঔষুধ তৈরির সাফল্য।

কিন্তু এরপরও, গুরুত্বপূর্ণ দুইটি খামতি থেকেই যাচ্ছে, যার ফলে স্বাস্থ্যসেবা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের থেকে বহুদূরে রয়ে গেছে।

জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এআই ফর গুড সম্মেলন; Image Source: Getty Images

এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োগ খুবই সীমিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গোটা বিশ্বের যাবতীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য-উপাত্তের মাত্র ২০ শতাংশের নাগাল ডিজিটাল ফরম্যাটে পাচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা পরিচালিত মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলো।

বিশ্বের জনসংখ্যা যত বাড়ছে, এবং তাদের বয়সও বৃদ্ধি পাচ্ছে, চিকিৎসকদের কাজের চাপও সমান হারে বেড়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাব। বিশ্বব্যাপী যে হারে রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে, সে হারে চিকিৎসকের পরিমাণ কিন্তু বাড়ছে না। আর এর ফলে, পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তেমন একটা প্রভাবিত না হলেও, উঠতি অর্থনীতির দেশগুলো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বেশির ভাগ সময়ই হচ্ছে বঞ্চিত।

অবশ্য এ সমস্যা সমাধানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনেক কোম্পানিই বর্তমানে স্বাস্থ্য পরামর্শ ও রোগ নির্ণয়ের অ্যাপস তৈরি করছে, যেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। আর এর ফলে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে না গিয়েও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে অনেকেই।

“যুক্তরাজ্যে পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফল বলছে, যেসব মানুষ চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে ২০ শতাংশেরই আসলে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তারা যেসব ছোটখাট অসুখ বা চোট নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বার বা হাসপাতালে গিয়ে হাজির হচ্ছে, অন্য কোনো উপায়েই সেগুলোর সহজ সমাধান তারা খুঁজে বের করতে পারত,” বলেন ইয়োর এমডি নামক একটি হেলথ ইনফর্মেশন ও সিম্পটম চেকার অ্যাপের প্রধান জোনাথন কার ব্রাউন।

ঘরে বসেই পাওয়া যাচ্ছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ; Image Source: Getty Images

কিন্তু এ ধরনের অ্যাপসের বৃদ্ধিও ভাঁজ ফেলেছে স্বাস্থ্য বিষয়ক পেশাজীবীদের কপালে। যেমন বলা যায় বেবিলন বিতর্কের কথা। গত বছর তারা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস অ্যাপ জিপি অ্যাট হ্যান্ডের প্রচারণা চালাতে গিয়ে দাবি করেছিল, তাদের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পরিচালিত চ্যাটবটটি নাকি প্রকৃত চিকিৎসকদের সমতুল্য। আর এর ফলে মারাত্মক ক্ষুব্ধ হয়েছিল বিশ্বব্যাপী চিকিৎসকরা।

সম্ভবত এ কারণেই মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য তাদের নিজস্ব চ্যাটবট বা ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরি করার পরও, সেটির সক্ষমতার বিষয়ে জোর গলায় কিছু বলার সাহস করে উঠতে পারছে না।

মাইক্রোসফট ইসরায়েলের প্রধান হাদাস বিত্রান এ ব্যাপারে বলেন, “এটি অবশ্যই আপনাদের চিকিৎসকের বিকল্প বা বদলি কিছু নয়। এটি কেবলই একটি অতিরিক্ত সহযোগিতার অপশন। আমরা চাই চিকিৎসকদের এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করতে যে তাদের উচিৎ কোন রোগীদের আগে সেবা দান করা।”

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যদি তার সম্ভাবনার পুরোটা অর্জন করতে চায়, তাহলে রোগীদের প্রথমে প্রয়োজন তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ক সকল উপাত্ত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাথে ভাগ করে নেয়া।

বিত্রানের মতে, তারা যে চ্যাটবটটি তৈরি করেছে, সেটিকে মেডিকেল সহযোগিতা প্রদান করছে নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষ। আর এর মাধ্যমে তারা কোনো রোগের উপসর্গ নির্ণয় যেমন করতে পারছে, তেমনই প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এটিও বুঝতে পারছে যে কোনো রোগী হতাশ কি না। যদি দেখা যায় কোনো রোগী মানসিকভাবে অনেক বেশি বিপর্যস্ত, তখন চ্যাটবটটি তার দায়িত্ব কোনো মানব চিকিৎসকের হাতে তুলে দেয়।

দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: Getty Images

ইয়োর এমডি’র কার ব্রাউনও বলেন, তার ফার্মের অ্যাপটি কখনোই চিকিৎসকের জায়গা দখল করবে না।

“আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রোগ নির্ণয় করতে পারে বলেই যে সে-ই সবসময় এ কাজটি করবে, তা হতে পারে না। রোগ নির্ণয়ের উপর এত গুরুত্ব না দিয়ে, আমাদের উচিৎ পরবর্তী ধাপের উপর ফোকাস করা, যাতে করে আমরা স্বাস্থ্য সেবায় আরো ভালো পরামর্শক বা সঙ্গী হয়ে উঠতে পারি।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী ড. সৌম্য স্বামীনাথন বিশ্বাস করেন, স্বাস্থ্য সেবায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রয়োগের ব্যাপারে বৈশ্বিক তত্ত্বাবধায়নের প্রয়োজন রয়েছে। আর তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মিলিত হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশনস ইউনিয়নের সাথে, যাতে করে তারা মিলিতভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করে দিতে পারে।

তিনি সম্মেলনে সবাইকে সাবধান করে দিয়ে বলেন, “এমন একটি ঝুঁকি কিন্তু থেকেই যায় যে অমূল্যায়িত অ্যাপগুলো মানুষের ভালো করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি করে দিল।”

তবে এর জবাবে আবার বিত্রান বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিকসমূহ মাথায় রাখার পরও, এ কথাও অবশ্যই মানতে হবে যে উঠতি অর্থনীতিগুলোতে, যেখানে এখনো পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, সেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাপগুলোর পক্ষেই সম্ভব অনেক দূর থেকেও ভিডিও লিংক ও প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে রোগীর সাথে চিকিৎসকদের সংযোগ স্থাপন করা।

স্বাস্থ্য সেবাকে নতুন উচ্চুতায় নিয়ে যেতে পারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স; Image Source: Getty Images

আলোচনায় যোগ দেন কগনিটিভ এআই টেক লিমিটেডের মেশিন লার্নিং প্রধান অ্যালভিন কাবওয়ামাও। তিনি বলেন, “গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানজনিত সমস্যার কারণে সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলে প্রতিদিন ৮৩০ জন নারী জীবন হারান। এর কারণ, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের নারীদের মতো তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় ইউরিন টেস্টের সুযোগ পান না।”

অনেক সময় নিকটবর্তী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁছাতে নারীদেরকে ২৭ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়, যেটি প্রায় পাঁচ ঘন্টার একটি যাত্রা। “যদি এমন হয় যে তারা দেরিতে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পৌঁছেছেন এবং চিকিৎসক চলে গেছেন, তখন তাদেরকে বিনা চিকিৎসায়ই আবার সমান দূরত্ব হেঁটে বাড়ি ফিরতে হয়।”

এ কারণেই এ ধরনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ে আজকাল স্মার্টফোনের ব্যবহার বেড়ে চলেছে। এসব স্মার্টফোনে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে চোখ-কান-নাক-ত্বক সহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো সম্ভব। পাশাপাশি এগুলোর মাধ্যমে মূত্র ও রক্ত পরীক্ষাও করা যায়।

নারীদের স্বাস্থ্য সেবায় অনেক পিছিয়ে আছে সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলো; Image Source: Nutrition International

তবে এ কাজগুলো করতে চাইলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে উপাত্ত ও ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে প্রাক্তন উপাত্ত পাওয়া খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার, যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষণের কাজটিকে আরো কঠিন করে দেয়।

সেনেগালে কর্মরত ইব্রাহিমা খলিউল্লাহ নামের এক চিকিৎসক বলেন, “সেনেগালে এখনো কাগুজে নথির উপরই এখনো অনেক নির্ভর করা হয়, যেগুলো প্রায় সময়ই পুরনো, অসমাপ্ত ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে থাকে। সেনেগাল যদি ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য সেবায় উন্নতি করতে চায়, তাহলে সামগ্রিক ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড সম্পন্ন করার কোনো বিকল্প নেই।”

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এমনকি অনেক উন্নত দেশেও ডিজিটাল ফরম্যাটে স্বাস্থ্য বিষয়ক উপাত্তের চরম ঘাটতি রয়েছে।

“স্বাস্থ্য উপাত্ত একটি জনসম্পদ। সাধারণ মানুষের উচিৎ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং নিজ নিজ সরকারের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা যে তাদের অনুমতি ছাড়া তাদের গোপনীয় তথ্যগুলো বাণিজ্যিক স্বার্থে কিংবা মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টিতে কখনো ব্যবহৃত হবে না,” বলেন সৌম্য স্বামীনাথন।

এবং এখানেই সৃষ্টি হয়েছে সবচেয়ে বড় দ্বিধা। অনেক মানুষই তাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য-উপাত্ত জানানোর ব্যাপারে অনেক বেশি সংবেদনশীল, এমনকি সেটি নাম-পরিচয় গোপন রেখে হলেও। তারা বুঝতে চায় না বা পারে না যে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে সফল করতে গেলে তাদের তথ্য-উপাত্তগুলোই কী ভীষণ জরুরি।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উন্নতিকল্পে মানুষের স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য-উপাত্ত খুবই জরুরি; Image Source: Getty Images

একই ধরনের সমস্যা রয়েছে ঔষধ শিল্পের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স খুবই দক্ষ এমন সব মলিকিউল খুঁজে বের করতে, যেগুলোকে রোগ প্রতিষেধক ঔষধে রুপান্তরিত করা সম্ভব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব ঔষধের কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য মানুষের উপর সেগুলো প্রয়োগ করতে হয়। অথচ প্রয়োজনের সময় সেই মানুষই খুঁজে পাওয়া ভার।

“প্রায় ৮০ শতাংশ প্রচেষ্টাই প্রথমবারে ব্যর্থ হয় এ কারণে যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমরা উপযুক্ত রোগী খুঁজে পাই না, যারা আমাদেরকে সহায়তা করতে ইচ্ছুক। এবং শেষ পর্যন্ত অর্ধেক প্রচেষ্টাই পুরোপুরি মাঠে মারা যায়।”

সুতরাং এ সম্মেলনের বক্তাদের কথা থেকে সুপষ্টভাবে প্রমাণিত যে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে তখনই মানুষের কল্যাণে সর্বোৎকৃষ্টভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে, যখন মানুষেরা এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারবে। মানুষেরা নিজেরাই যদি সন্দিহান হয় এবং ভয় পেয়ে দূরে সরে থাকে, বা নিজেদের তথ্য-উপাত্ত গোপন করতে থাকে, তাহলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের একার পক্ষে কখনোই স্বাস্থ্য সেবার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here