মানবসভ্যতার ইতিহাস রচনা করতে গেলে, সেখানে একটা আলাদা মর্যাদার আসনে আসীন থাকে প্রাচীন গ্রিকরা। কেননা সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে অন্যান্য অধিকাংশ প্রাচীন সভ্যতার চেয়েই যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তারা। দর্শন ও প্রকৌশলে তাদের অবদান সম্পর্কে আমরা সকলেই কমবেশি জানি। কিন্তু হাল আমলের প্রযুক্তি বিষয়ক চাঞ্চল্য যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে কেন্দ্র করে, সেটির পিছনেও যে প্রাচীন গ্রিকদেরই প্রাথমিক অবদান সবচেয়ে বেশি, এবং তারাই হাজার হাজার বছর আগে বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপারে অব্যর্থ ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছে, তা কি জানতেন?

জানলে তো ভালোই, আর যারা জানতেন না, তারাও এবার একটু নড়েচড়ে বসতে পারেন। কারণ যিনি এই দাবিটি করেছেন, তিনি কোনো যে-সে ব্যক্তি নন। তিনি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একজন ইতিহাসবিদ, ড. আড্রিয়েন মেয়র। ‘গডস অ্যান্ড রোবটস’ নামক একটি নতুন বইয়ে তিনি লিখেছেন, ২১ শতকে মানুষ যেসব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সেগুলোর উল্লেখ অনেক আগে থেকেই ছিল প্রাচীন গ্রিক উপকথায়। এসব উন্নত প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ছাড়াও চালকবিহীন গাড়ি, রোবট এবং ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট।

চলুন পাঠক, মেয়র রচিত বইটি অবলম্বনে আপনাদের সামনে তুলে ধরি, কীভাবে আজ থেকে আড়াই হাজারেরও বেশি সময় আগেকার প্রাচীন গ্রিক উপকথায় দেয়া হয়েছিল বর্তমান বিভিন্ন প্রযুক্তির ইঙ্গিত।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স

প্রাচীন গ্রিক উপকথা ঘেঁটে আমরা দেখতে পাই একটি বুদ্ধিমান রোবটিক্সের কাহিনী, যেটি তৈরি করেছিলেন স্বয়ং প্রযুক্তির দেবতা হিফিস্টাস। রোবটিক্সটির নাম ছিল টালোস। সে ছিল মূলত একটি অ্যানিমেটেড তাম্র যোদ্ধা, যাকে ‘প্রোগ্রাম’ করা হয়েছিল হিফিস্টাস কর্তৃক নির্মিত ক্রিট দ্বীপটি পাহারা দেয়ার কাজে।

টালোস; Image Source: Wikimedia Commons

প্রাচীনকালের লেখকেরা এমনভাবে টালোসের বর্ণনা দিয়ে গেছেন, যার সাথে মিল রয়েছে বর্তমান সময়ের বৈজ্ঞানিক ‘সাইবারনেটিক অর্গানিজম’ প্রকল্পের, যেটিতে সম্মিলন ঘটে নিউরোলজিক্যাল কম্পিউটার ইন্টারফেসের সাথে বিভিন্ন জীবিত ও মৃত উপাদানের।

টালোস ছাড়াও হিফিস্টাসের আরো অনেক সৃষ্টিই ছিল এমন সব যন্ত্র, যাদের মধ্যে ছিল চিন্তা ও অনুভূতির ক্ষমতা। ধাতব পদার্থ দ্বারা তৈরি হলেও, তারা প্রায়ই এমন ভাব দেখাত যেন তারা আসলে রক্ত-মাংসের জীবিত কেউ।

পান্ডোরা

প্রাচীন গ্রিক উপকথায় রয়েছে ব্লেড রানার স্টাইলের পান্ডোরার কথাও, যাকে হিফিস্টাস ‘প্রোগ্রাম’ করেছিলেন তার কাছে থাকা বাক্সটি খোলার জন্য।

পান্ডোরা; Image Source: Wikimedia Commons

পান্ডোরা ছিল গ্রিক দেবতা কর্তৃক সৃষ্ট প্রথম মানব নারী। সে তার কাছে থাকা বাক্সের ভিতরকার উপাদানগুলো সম্পর্কে ছিল খুবই কৌতূহলী, এবং যখন সে নিজের আগ্রহকে অবদমিত করতে না পেরে বাক্সটি খুলে ফেলে, তখন একে একে লোভ, হিংসা, ঘৃণা, ক্রোধ, যন্ত্রণা, রোগ, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, যুদ্ধ ও মৃত্যুর মতো ভয়ঙ্কর বিষয়গুলো পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, এবং সেজন্য পৃথিবীর অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

পাইলটবিহীন জাহাজ

আজকাল যেমন চালকবিহীন গাড়ির ধারণা উদ্ভাবিত হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই এমন গাড়ি নেমে পড়তে চলেছে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর রাস্তায়, ঠিক তেমনই প্রাচীন গ্রিক উপকথায় উল্লেখ ছিল ওডিসির পাইলটবিহীন ফিয়েশিয়ান জাহাজের কথা। এই জাহাজটি তাকে ইথাকা থেকে নিজের বাড়ি ফিরে আসতে সাহায্য করেছিল। মেয়রের মতে, এই জাহাজের সাথে মিল রয়েছে আধুনিক জিপিএস প্রযুক্তিরও।

ওডিসির জাহাজ; Image Source: Wikimedia Commons

সাহায্যকারী রোবট

মানুষকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করার জন্য এখন তৈরি হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা পরিচালিত সাহায্যকারী রোবট। প্রাচীন গ্রিক উপকথা অনুযায়ী এমন সাহায্যকারী রোবট তৈরি করেছিলেন হিফিস্টাসও।

হিফিস্টাস সেই রোবটগুলোকে, যেগুলোকে তিনি মনে করতেন যান্ত্রিক ভৃত্য, তৈরি করেছিলেন স্বর্ণ দিয়ে, এবং সেগুলোর ভিতর দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন নতুন নতুন সব বিষয় শেখা, বিচার-বিবেচনা করা এবং কাজ করার দক্ষতা।

হিফিস্টাস; Image Source: Wikimedia Commons

মেয়রের মতে, পান্ডোরার মতো এসব রোবটের পক্ষেও সম্ভব এক সময় মানবজাতিকে বিপাকে ফেলে দেয়া। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্রমোন্নতির ফলে রোবটগুলোও ক্রমশ উন্নত থেকে উন্নততর হয়ে উঠছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে তারা মানবিক শ্রমশক্তিকে তো পিছনে ফেলবেই, এমনকি কোনো একসময় যদি তাদের মানুষের ন্যায় পূর্ণাঙ্গ মানসিক বিকাশ ঘটে যায়, তাহলে তারা ফ্রাঙ্কেস্টাইনের মতো নিজেদের সৃষ্টিকর্তা তথা মানবজাতির বিরুদ্ধেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারে।

যেভাবে এলো আজকের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স

একটি বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার, সেই প্রাচীন গ্রিকদের সময় থেকেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ধারণা বিদ্যমান থাকলেও, এই শব্দযুগলের বয়স কিন্তু খুব একটা বেশি নয়।

১৯৫০ সালে অ্যালান টুরিং নামক একজন ব্রিটিশ গণিতবিদ, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোড ব্রেকিং করতেন, প্রস্তাব রাখেন একটি পরিমাপ ব্যবস্থার, যার মাধ্যমে কোনো যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা এবং সেটি ঠিক কতটা মানুষের মতো চিন্তা করতে সক্ষম তা নির্ধারণ করা যাবে।টুরিংয়ের প্রস্তাবটি গৃহীত হয়, এবং সেটির নামই হয়ে যায় টুরিং টেস্ট।  বিচারক বা প্রশ্নকর্তারা বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে বুদ্ধিমান যন্ত্রগুলোর পরীক্ষা নিত, এবং সে অনুযায়ী তাদের বুদ্ধির পরিমাপ করত। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে টুরিং নিজস্ব গবেষণা প্রবন্ধও প্রকাশ করতেন। কিন্তু তিনিও কখনো তার লেখায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কথাটি আনেননি।

অ্যালান টুরিং; Image Source: British Library

মাত্র ১৯৫৬ সালে, হ্যানোভারের ডার্টমাউথ কলেজে একটি সম্মেলনে জন ম্যাককার্থি কর্তৃক প্রথমবারের মতো এই শব্দ দুইটি উচ্চারিত হয়। সেই সম্মেলনটি পরিপূর্ণ ছিল নিজ নিজ অঙ্গনে খ্যাতিমান বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দ্বারা। তারা কেউ ছিলেন প্রকৌশলী, কেউ গণিতবিদ, কেউ কম্পিউটার বিজ্ঞানী, কেউ বা আবার মনোবিদ। তাদের প্রত্যেকের গবেষণার ক্ষেত্র ভিন্ন ভিন্ন হলেও, একটি বিষয়ে তাদের কারোই কোনো দ্বিমত ছিল না যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল, এবং একটা সময় এই প্রযুক্তিই গোটা বিশ্বকে শাসন করার যোগ্যতা অর্জন করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here